কুয়োর ধারে বড় জমিটা মস্ত ভরসা ছিল সংসারের। আনাজপাতি না জুটলে ওই বাগান থেকে যা-হোক কিছু খুঁটে তুলে আনত নয়নতারা। শাকপাতা, কচু-ঘেঁচু, নিদেন একটা লেবু। আজকাল আর তার দরকার হচ্ছে না। অনটন নেই।
তবু বুকে একটু টনটনানি থেকে যায় কেন! কী নেই? আরও কী চায় বিষ্ণুপদ!
আগাছায় ভরা বাগানটায় বিষ্ণুপদ একদিন সকাল থেকে গিয়ে বসে রইল। আজ বাদলা মেঘ নেই। বৃষ্টি একটু থিতু রয়েছে। আতা গাছের ছায়ায় বসে বিষ্ণুপদ ভাবনাচিন্তার ঝাঁপি খুলে বসল। নিরিবিলি এরকম নিজের মোকাবিলা করা মাঝে মাঝে ভাল।
কিন্তু তার ভিতরটা চিরকালই বড় নিস্তব্ধ। সেখানে কথার ভুড়তুড়ি কম, ভাবনা-চিন্তাও যেন খেই-হারা। সুখের কথাই ভাবছে বিষ্ণুপদ। এই যে বাড়ি হল, কতকালের কত অভাবের সঙ্গে লড়াই শেষ হয়ে গেল, এসব হওয়ার পরও সে কেন যেমন ছিল তেমনি রয়ে গেছে? একটা এই হতে পারে যে, তার পুরনো চেনা বাড়িটা লোপাট হয়ে যাওয়ায় কেন যেন নতুন বাড়িতে সে খাপে খাপে বসছে না। খুঁতখুঁতুনি হচ্ছে, নতুন জুতো পরলে যেমন ধারা হয়! তাই কি! আর এক অস্বস্তি বামাচরণ। শোনা যাচ্ছে, তার চিকিৎসা শুরু হয়েছে। মাথার ব্যামো। লোভে, অশান্তিতে, আক্রোশেই কি পাগল হয়ে গেল ছেলেটা?
সব মিলিয়ে বিষ্ণুপদর তেমন সুখ হচ্ছে না। কেমন যেন মনে হচ্ছে, পরের বাড়িতে বাস করছে সে। কেন এরকম হয়!
একখানা দা হাতে বোধ হয় গুলতির কাঠ কাটতে বাগানে ঢুকেছিল পটল। দাদুকে দেখে থমকে দাঁড়াল।
দাদু, কী করছে?
বসে আছি দাদা।
এ সময়টায় সাপ বেরোয় তো।
বিষ্ণুপদ মৃদু হাসল, হেলে ঢোঁড়া সব।
না দাদু, চক্করওলাও আছে।
বিষ্ণুপদ মাথা নাড়ল, নেই। ভিত ঘোড়ার সময় দু দুটা বাঞ্ছসাপ মেরে ফেলল মিস্তিরিরা, দেখিসনি?
আর নেই?
বিষ্ণুপদ বলল, সাপও আজকাল কই? আগে কত দেখা যেত। বসত বাড়ছে, সব নিকেশ হয়ে যাচ্ছে।
পটল বলল, সাপের বিশ্বাস কি! তুমি বারান্দায় গিয়ে বোসো।
বিষ্ণুপদ উদাস গলায় বলে, গায়ের ছেলে হয়ে সাপকে ভয় পাস?
খুব পাই দাদু।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আগে লোকে বাঘ-সিংহী। ভয় পেত, আজকাল দেখ তাদের কী দুৰ্দশা! ফৌত হয়ে হয়ে মাত্র কয়েকটিতে দাঁড়িয়েছে। এখন ভয় দেখা দিয়েছে, একদিন না। এসব জন্তু লোপাট হয়ে যায়। সাপেরও সেই অবস্থা হয়ে এল। আগে বর্ষাকালে হেলে-টোডা কত কিলবিল করত। চার ধারে। উঠোনে, পুকুরে। আজকাল কোথায়?
পটল একটু হাসল, তুমি বুঝি সাপখোপ বাঘ-সিংহ চাও?
বিষ্ণুপদ নাতির দীঘল চেহারা আর কোমল মুখখানার দিকে চেয়ে বলল, তুই চাস না?
না তো!
তোর বড় জ্যাঠা চায়। দুনিয়াটা এক অদ্ভুত জায়গা। প্রকৃতি এমন করে সৃষ্টি করেছিল সব যে পান থেকে চুন খসলেই গণ্ডগোল। প্রকৃতির ভারসাম্য না কী যেন বলে! তোর জ্যাঠা জানে। সে অনেক জানে, বুঝিয়ে বলতে পারবে। আমি তত জানি না। কিন্তু আমারও কেন যেন মনে হয়, সাপখোপ বাঘ-ভালুক না হয় থাকত কিছু, কী ক্ষতি হত তাতে!
সাপের কামড়ে যে কত মানুষ মারা যায় দাদু!
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলে, সাপের কামড়ে যত না মানুষ মরেছে তার চেয়ে লক্ষ গুণ সাপ মরেছে মানুষের লাঠিতে। বাঘা যত না মানুষ মেরেছে তার বহুগুণ বেশি বাঘ মরেছে মানুষের হাতে। সবসময়ে যে না মারলেই চলত না, এমন নয়। তবু মেরেছে। মানুষের দাঁতে নখে জোর না থাক, তবু মানুষের চেয়ে হিংস্র আর কে আছে বল তো!
পটল একটু ভাবল। তারপর দাদুর সামনে উবু হয়ে বসে মুখের দিকে চেয়ে বলল, দাদু, বড় জ্যাঠা এইসব নিয়ে লেখে, না?
ও বাবা! সে পণ্ডিত মানুষ, কী নিয়ে লেখে তার আমি কী বুঝি? তবে এসব কথাও নাকি আছে তার বইতে।
বইটা আমি জ্যাঠার কাছে চেয়েছি। বলেছে দেবে।
সে বই কি তুই বুঝবি?
বুঝব দাদু। জ্যাঠার কথা আমি বুঝতে পারি।
বিষ্ণুপদ একটু আনমনা হয়ে গেল। আপনমনে শুধু বলল, সে বড় ভালবাসে দুনিয়াটাকে।
পটল এখন অনেকটাই বড় হয়েছে। সামনের বছর তার মাধ্যমিক পরীক্ষা। সে আজকাল ক্লাসে ফাস্ট হয়। গোপালকে কলকাতার ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে কৃষ্ণজীবন। হোস্টেলেরও ব্যবস্থা হয়েছে। পটলের একটু ফাঁকা লাগে তাই।
পটল বিষ্ণুপদর দিকে চেয়ে বলল, জ্যাঠা এখন কোথায় আছে দাদু? আমেরিকা না ইউরোপ?
বিষ্ণুপদ এক-গাল হাসল, না রে, কলকাতাতেই আছে এখন। গিয়েছিল কাছেপিঠে কোথায় যেন! ম্যানিলা হবে বোধ হয়। ফিরে এসেছে। যদি ভাল করে লেখাপড়া করিস তাহলে তুইও তার মতো কত দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবি।
কী যে বলো! জ্যাঠার মতো পারব? উরিব্বাস! আগে মাধ্যমিকটা তো ডিঙোই।
পটল চলে গেলে বিষ্ণুপদ ফের ভাবতে বসল। ভাবনাগুলো বড্ড ছাড়া-ছাড়া, মোয়া বঁধছে না। সুখের কথাই ভাবছে বিষ্ণুপদ। কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। একটা খোঁড়া লোকের যদি পা গজায়, একজন অন্ধ যদি চোখ ফিরে পায়, একটা হাভাতের যদি ভাতের ব্যবস্থা হয় তো খুব সুখ হয়। কিন্তু সুখটা বড় গড়ানে জিনিস। চূড়ায় বাস করতে পারে না। নেমে আসে। যার নতুন ঠ্যাঙ হল সে কদিন খুব খটর মটর করে হাঁটবে তারপর একদিন ঠ্যাং-এর কথা ভুলে যাবে। যার চোখ হল তার আনন্দও বেশিদিন নয়। হাভাতের ভাতের সুখও বড় ক্ষণস্থায়ী।
তুমি এইখানে বসে! সারা বাড়ি খুঁজছি।
নয়নতারাকে দেখলেই বিষ্ণুপদর একটা মায়া হয় আজকাল। এই এক মানুষ যার সুখটা বেশ স্থায়ী হচ্ছে। ডগোমগো ভাবটা আর নেই, তবু মুখখানা সবসময়ে আহ্লাদে মাখা। সারাদিন ঘুরে ঘুরে বাড়ি ঝাড়পোঁছ করছে, যারা বহুবার দেখেছে সেইসব পাড়াপ্রতিবেশীদের ফের ডেকে এনে তার আশ্চর্য বাড়ির অন্ধিসন্ধি দেখাচ্ছে। মাজে আছে সব নিয়ে।
