কাতর গলায় ঝুমকি বলল, খুব সুন্দর মাসি। কী বড় বড় দাঁত, কী সুন্দর কেষ্ট ঠাকুরের মতো গায়ের রং… আচ্ছা! মাসি, আর ইয়ার্কি করব না। ছাড়ো না প্লিজ!
ছাড়ব? দাঁড়া দেখাচ্ছি। মজা!
হলঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অতিথিরা বসা। বাচ্চারা হইচই করছে। হেমাঙ্গ ঘরে নেই।
এই, হেমাঙ্গ কোথায় গেল রে?
কেউ বলতে পারল না। চারুশীলা হাত ধরে ঝুমকিকে টানতে টানতে এঘর ওঘর ঘুরে বেড়াল। কোথাও হেমাঙ্গ নেই।
আশ্চর্য! কোথায় গেল বল তো!
ঝুমকি সামান্য হাফ-ধরা গলায় বলল, চলে যাননি তো?
আমাকে না বলে? চল তো দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করি।
বাইরে হেমাঙ্গর গাড়িটা ছিল না। দারোয়ান বলল, হেমাঙ্গবাবু একটু আগেই চলে গেছে।
কাঁদো-কাঁদো হয়ে চারুশীলা বলল, দেখলি! ওরা আজকাল এরকম অদ্ভুত স্বভাব হয়েছে। কখন কী করে তার ঠিক নেই। একটু আগে যখন বলেছিলাম তোকে গিয়ে নিয়ে আসতে খুব রাজি হয়ে চলে গেল। বেশ হাসি-খুশি ছিল। আবার হঠাৎ কী খেয়াল হল কে জানে, দুম করে কাউকে না বলে-কয়ে চলে গেল!
ঝুমকির চোখে বিবৰ্ণ দিনটা হঠাৎ আরও বিবৰ্ণ হয়ে মরে গেল। বুকের ভিতরটা কেমন নিথর। হতাশায় তারও চোখে জল আসার উপক্রম হল।
চল যাই ভিতরে।
স্তিমিত গলায় ঝুমকি বলল, চলো।
যখন দুটি হতাশ রমণী ঘরে ফিরে আসছিল ধীর পায়ে তখন পূর্ণ দাস রোড থেকে গোল পার্ক হয়ে ডান দিকে মুখ ফেরাল হেমাঙ্গর ছোট্ট ফিয়াট। চারদিকে আজ জলপ্রপাতের মতো বৃষ্টি নেমেছে। তার ছোট গাড়ি যে-কোেনও মুহূর্তে ফেসে যাবে।
সাদার্ন অ্যাভেনিউতে লেকের রেলিং ঘেঁষে প্রায় হাঁটু জলের মধ্যে গাড়ি দাঁড় করল হেমাঙ্গ। তারপর চুপ করে বসে
কতবার ভুল করবে। সে! আর কতবার? তার কেন ওকে ভাল লাগছে? কেন এত বেশি ভাল লাগছে। ওকে? এটা কি সঙ্গত? এটা কি হওয়া উচিত?
নিজের সঙ্গে একটা লড়াই দরকার হয়েছে তার। এ লড়াই হেরে গেলে তার চলবে না। গাড়িটা খুব ধীরে, সাবধানে নিজের বাড়ির দিকে ফেরাল হেমাঙ্গ।
জলে গাড়ি বিশ্বাসঘাতকতা করল না। এবারও।
হেমাঙ্গ ঘরে ঢুকে চুপচাপ শুয়ে রইল বিছানায়। টেলিফোন টানা বেজে যেতে লাগল। হেমাঙ্গ ধরল না। টেলিফোন থেমে গেল ধৈর্যহারা হয়ে।
ও মেয়েটিকে এবার থেকে অ্যাভয়েড করতে হবে হেমাঙ্গ, বুঝেছো?
বুঝেছি।
শি ইজ টেকিং ইউ ওভার। বি কেয়ারফুল।
হ্যাঁ।
কিন্তু কী করবে। হেমাঙ্গ!
দেখা যেন না হয়। আর।
কিন্তু চিন্তায় হানা দেবে। সেটাও খারাপ।
খুব খারাপ।
ওর ডিফেক্টগুলো খুঁজে বের করো হেমাঙ্গ। ট্রাই টু হেট হার।
শক্ত কাজ। কারও প্রতি দুর্বলতা এলে ডিফেক্টগুলো নজরে পড়তে চায় না।
খুব সত্যি কথা, তা হলো!
চেষ্টা করতে হবে। এখনই এটা অন্ধুরে বিনাশ না করলে পরে কষ্ট পেতে হবে।
খুব ঠিক কথা।
তুমি আর কিছুদিন এখন চারুশীলার বাড়িতে যেও না।
হুঁ। কিন্তু চারুদি কি ছাড়বো! খোঁজ নেবে।
আজ নিশিপুরে চলে গেলে ভাল করতে তুমি।
এবার থেকে কোনও উইক এন্ড বাদ দেবো না।
পালাতেই হবে।
খুব ধীরে ধীরে ঘুম চলে এল। কিন্তু ঘুমটাও নিপাট হল না। কত হিজিবিজি স্বপ্ন এল।
ঘুম ভাঙল হঠাৎ টেলিফোনের শব্দে। সতর্ক ছিল না হেমাঙ্গ, ঘুম-চোখে উঠেই টেলিফোন ধরল, হ্যালো!
ওপাশে কিছুক্ষণ চাপচাপ।
হ্যাল্লো! হ্যাল্লো!
খুব চাপা একটা নারীকণ্ঠ বলল, ওভাবে চলে এলেন যে!
হেমাঙ্গ বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ড একটা বিট মিস করল। তারপর হঠাৎ রেলগাড়ির মতো চলতে শুরু করে দিল। হেমাঙ্গর একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তার ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ঘৃণা করো ওকে।
আমার জন্যই চলে এলেন?
কে বলল?
আমি জানি। যদি আমাকে অ্যাভয়েডই করার ইচ্ছে তা হলো নিয়ে এলেন কেন?
অ্যাভয়েড করতে চাইনি বলেই।
মোটেই না। বলতে বলতে একটা কান্নার সম্ভাবনায় গলাটা স্থলিত হয়ে গেল একটু।
আপনি কেন ইনসাল্টেড ফিল করছেন? আমি তো এমনিতেই একটু খেয়ালি।
শুধু খেয়ালি?
আরও কিছু?
জানি না। মাঝে মাঝে আপনি এমন করেন যে—
আমি খুব শান্তিতে নেই। আপনাকে যদি বলতে পারতাম!
জানি। আপনি রশ্মির কথা ভেবে—
কিছু জানেন না। রশ্মির কথা আমি কদাচিৎ ভাবি। ভাববই বা কেন? কোনও কারণ ছিল না।
তাহলে?
কথাটা আপনাকেই বলা যায় না।
কেন যায় না?
আমি সত্যিই আপনার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই।
তাই তো আছেন। আমি কী এমন করলাম?
জানেন না?
না তো?
নাকি জানেন, স্বীকার করতে পারেন না!
কি করে জানব?
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
১০৫. চারদিকে সুখ
চারদিকে সুখ একেবারে উছলে পড়ছে। পাকা দোতলা বাড়ি, চরদিকে বুক-সমান ঘোর-দেয়াল উঠেছে। যে বাড়িটা রামজীবন তুলতে গিয়ে পেরে ওঠেনি। সেটার ছাদ-ঢালাই করে দিয়েছে কৃষ্ণজীবন। পলেস্তারা পড়ে গেছে, জানালা-দরজাও বসে গেছে। রং হলেই সে বাড়িও হেসে উঠবে। পুরনো ঘরগুলো ভেঙে জায়গা চৌরস করে বাগান হচ্ছে। ময়দানবের কাণ্ড যেন, রামজীবনের আধখ্যাচড়া ঘর আর মুখ ভ্যাংচায় না বিষ্ণুপদকে। বিষ্ণুপদ এখন দোতলার চওড়া বারান্দায় বসে দুনিয়াটা দেখে। কিন্তু নতুন রকম লাগে কি? তা তো লাগে না!
সুখের যে একটা বান ডেকেছে সেটা বুঝতে পারে বিষ্ণুপদ। কিন্তু এত সুখে যখন নয়নতারা উথলে ওঠে তখনও বিষ্ণুপদ কেন ঠাণ্ডা মেরে থাকে! কোনও সুখই কেন ভিতর অবধি গিয়ে সেঁধোয় না। তার!
সুখের চিহ্নগুলো সারাদিন ধরে ঘরে-বাইরে খুঁজে বেড়ায় সে। বাড়ি হল, সাহেবি সব আসবাব হল, আজকাল পাতে রোজ মাছ তো বটেই, তার সঙ্গে আরও দুই-তিন পদ। রামজীবনকে দোকান করে দিয়েছে কৃষ্ণজীবন। সে দোকানও চলছে। রামজীবন আজকাল মদটদ খাচ্ছে না কিছুদিন! সবই সুখের বৃত্তান্ত।
