ভিতরের ঘরে হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে কাবার্ড থেকে একটা নতুন স্প্রে সেন্ট বের করে তাকে দিয়ে বলল, নে।
আবার সেন্ট!
এটা এলেবেলে সেন্ট নয়। যাকে চাইবি এই সেন্ট মেখে তার কাছে গেলেই সে তোকে ভালবেসে ফেলবে।
ঝুমকি একটু হেসে বলল, তাই নাকি? তাহলে এটা আমার আর দরকার নেই মাসি। আমি কাউকে হিপনোটাইজ করতে চাই না।
ইগোতে লাগল বুঝি? সেভাবে বলিনি রে বোকা! ঠাট্টা করছিলাম। এটা একটা এক্সকুসিভ পারফিউম। এক বুড়ো ফরাসি নাকি নিজের হাতে বানায়। কিরকম জিনিস তা আমিও জানি না। মাখিনি কখনও। তোর ওপর দিয়ে একটু এক্সপেরিমিন্টে করছি।
আমি বুঝি তোমার গিনিপিগ?
নে না। বাবা, যাই দিতে চাই তাইতেই সবসময়ে আপত্তি করিস কেন?
ঝুমকি মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, সবসময়ে এত দিও না তো। এত দিলে ভাল লাগে বলো? তোমাকে আমি কী দিই?
চারুশীলা চোখ পাকিয়ে বলে, আমাকে দিবি! সাহস তো কম নয়! আমি তোর বড় না? আর দেখ তো ভাই, জিনিসে জিনিসে বাড়িটাকে আমি কিরকম ওয়্যারহাউজ করে ফেলেছি! আমাকে জিনিস দিতে কি লোকের মায়া হয় না? কোথায় রাখব। বল তো!
ঝুমকি হেসে ফেলে বলে, ঠিকই বলেছে। মাঝে মাঝে তোমাকে কিছু দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ভাবি, চারুমাসিকে দিয়ে লাভ কি? সবসময়েই তো কেনাকাটা করছে।
ওইটেই তো আমার রোগ। এই রোগটা হেমাঙ্গরও আছে। কী জিনিস কেনে ভাবতে পারবি না। আমাদের দুজনের ওই একটা ব্যাপারে খুব মিল।
জানি মাসি।
তবে আজকাল আর ওর কেনাকাটার বোকাটা নেই।
বলতে বলতে চারুশীলা একটু আনমনা হয়ে গেল।
কী হল মাসি?
চারুশীলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কি যে হল হেমাঙ্গর! ও কি সাধু হয়ে যাবে রে?
ঝুমকি ফের একটু লাল হল। বলল, যাক না।
সাধু হবে? তাতে ভালোটা কি হবে?
সাধু হওয়া কি খারাপ?
খারাপই তো। সাধুরা যে ভিক্ষে করে খায়!
ঝুমকি হেসে ফেলে। বলে, তাতেই বুঝি তোমার ভয়?
হেমাঙ্গ ভিক্ষে করে খাবে! বলিস কি!
দেখ মাসি, তোমার ভাইটি অত সহজে সাধু হবেন না।
কি করে জানলি?
জানবো কি করে আবার! মনে হল তাই বললাম।
না রে, তুই জানিস না। ওর কুষ্ঠিতে আছে কত বছর বয়সে যেন সন্ন্যাস-যোগ।
বুঝি কুষ্ঠি মানো? মানি কিনা জানি না। কিসে কি হয় কে জানে বাবা! আমি যখন সুব্রতকে বিয়ে করি তখন তো ও ভেরেন্ডা ভাজে আর বিপ্লব করে বেড়ায়। এক জ্যোতিষী ওরে মাকে বলেছিল, একদিন নৃপতুল্য টাকা হবে। কে বিশ্বাস করেছিল সে কথা? অথচ দেখি ফলে তো গেল!
আমার ওসব বিশ্বাস হয় না।
অনেকেরই হয় না। আসলে কি জানিস, ভালটা না ফললেও খারাপটা ঠিকই ফলে যায়।
ঝুমকি ফের হাসল। বলল, সেটা নিজের জন সম্পর্কে সবসময়েই মনে হয়।
চারুশীলা খুব বিষণ্ণ মুখ করে বলল, কে জানে হেমাঙ্গর জীবনটা আমিই নষ্ট করে দিলাম কিনা!
কেন মাসি, তুমি নষ্ট করবে কেন!
সুব্রত বলেছে, রশ্মির সঙ্গে হেমাঙ্গর সম্পর্কটা ধীরে ধীরে আপনা থেকেই গাঢ় হত। আমি বিয়ের জন্য নানারকম প্ৰেশার ক্রিয়েট করাতেই নাকি ব্যাপারটা কেচে গেল।
ঝুমকি সবেগে মাথা বেড়ে বলল, তুমি কিছু বোঝো না।
বুঝি না?
একটুও না। তুমি বড্ড সরল। তোমাকে আগেই বলেছি। রশ্মি একদম অন্য ধরনের মেয়ে। হেমাঙ্গীবাবুর সঙ্গে ওকে ঠিক মানায় না।
আমাকে এরকম কথা আরও কেউ কেউ বলেছে। কিন্তু কেন বল তো? আমার তো রশ্মি আর হেমাঙ্গকে মনে হত মেড যকর হচ আদার।
তুমি তোমার ভাইকে সংসারী করার জন্য এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলে যে, তখন তোমার আত খুঁটিয়ে বোঝার মতো মনই ছিল না। সুন্দর দেখেই ঢলে পড়েছিলে।
অসহায় মুখ করে চারুশীলা বলল, তাহলে হেমাঙ্গর এখন কী হবে বল তো!
আর হবে! সাধু হয়ে যাবে।
চারুশীলা হাসল না। বিষণ্ণ গলায় বলল, রশ্মির বিয়ের খবরটা পাওয়ার পর থেকেই কেমন যেন হয়ে গেছে। একদম উদাস, বৈরাগী। ওর কথা ভাবলেই এত ভয় করে! ভয়ে আমি আর বিয়ের কথাও তুলি না। ওর বাড়ির লোকও হয়রান হয়ে যাচ্ছে।
তুমি ওঁকে নিয়ে এত ভাবছো কেন? কিছু তো করতে পারবে না। কিছু ভেবো না, ওঁকে ওঁর মতো থাকতে দাও।
তাই তো দিচ্ছি। কিন্তু কি হচ্ছে বল তো! বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে ওর মা দুশ্চিন্তায় শুকিয়ে যাচ্ছে! রোজ আমাকে ফোন করে। কত মেয়ে দেখেছে তার ঠিক নেই। গাদা গাদা ফটো জমে গেছে। কী সুন্দর সুন্দর সব মেয়ের ছবি এসেছে দেখলে মাথা ঘুরে যায়!
কেমন যেন হঠাৎ স্নান হয়েগেল ঝুমকির মুখখানা। বলল, বেশ তো। চেষ্টা করতে করতে একদিন ঠিক রাজি হয়ে যাবে। ছেলেরা তো আসলে হ্যাংলা।
যাঃ। হেমাঙ্গ আর পাঁচজনের মতো নয়। হ্যাংলা একদম নয়। অত সুন্দর চেহারা, কিন্তু কখনও মেয়েদের দিকে ফিরেও চাইত না। ওকে তুই চিনিস না।
ঝুমকি হেসে বলল, র ভাইকে সবাই একটু বেশি সুন্দর দেখে।
চারুশীলা চোখ পাকিয়ে বলল, এই পাজি! হেমাঙ্গ কি দেখতে খারাপ?
তাই কি বললাম?
সুন্দর নয়?
তেমন কিছু নয়।
হেমাঙ্গ ম্যাসকুলিন, ছমছমে শরীর। মুখটার কাট দেখেছিস? ফটোজেনিক নয়, লালটুও নয়। কিন্তু ওর হল পুরুষালি চেহারা।
একটু বুনো-বুনো, তাই না? বলেই ঝুমকি হেসে ফেলল।
ইয়ার্কি হচ্ছে? হেমাঙ্গর নিন্দে করবি তো ফাটাফাটি হয়ে যাবে। আয়, ভাল করে দেখে যা।
ভয় খেয়ে ঝুমকি চাপা আর্তনাদ করতে লাগল, ছাড়ো! ছাড়ো! আচ্ছা, ভুল বলেছি মাসি, কান মলছি। আর করব না।
না। আয়, দেখ ভাল করে। তুই কি অন্ধ যে হেমাঙ্গকে সুন্দর দেখিস না!
