তাহলে সুকান্তর কবিতাটা তোমাকে শুনিয়ে লাভ নেই, ও কবিতা তুমি বুঝবে না।
তার মানে?
সুকান্তর আমলে আঠারো বছরের ছেলেরা এত হিসেবী ছিল না। পকেটে টাকা নেই, ভবিষ্যতের আশা নেই, অথচ দুনিয়াটা তার নিজের বলে মনে হয়। তুমি সেরকম যুবক বোধ হয়। কখনও হবে না।
না না, কবিতাটা আমি তবু শুনতে চাই আপা। কি কারণে আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর, আমাকে জানতে হবে।
ভয়ংকর শব্দটা এবং আপা দুপুর থেকে বিকেল অবধি তার সঙ্গে রইল। তারপর আপা চলে গেল, কিন্তু ভয়ংকর শব্দটা গেল না।
ভিজিটিং আওয়ারে অপর্ণা এসে ছেলের দিকে চেয়ে বলল, তুই ভেবেছিস কি বল তো! এভাবে কি নিজেকে শেষ করতে চাস? দুপুরে কিছু খাসনি। বাবার অসুখ কি আর কারও করে না?
কাতর গলায় অনীশ বলে, অ্যাপেটাইট নেই মা। গা বমি-বমি করছিল।
খালি পেট বলেই ওরকম করেছে। সকালে শুধু দুখানা বিস্কুট আর চা ছাড়া তার পেটে কিছুই যায়নি।
গেছে মা। আপা এসেছিল। আমরা ফুট জুস খেয়েছি।
অত ভাবছিস কেন বল তো! আজ সকাল থেকে তোর বাবার অবস্থা স্টেবল। আমরা তো ফোনে খবর নিচ্ছিই। এখন বাড়ি যা। আমি খাবার সাজিয়ে রেখে এসেছি টেবিলে, খেয়ে নিস। তারপর একটু রেস্ট নে।
আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর… আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর বিড়বিড় করতে করতে তার বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হল। কোন এক ঘোরের মধ্যে কোন বাসে চড়ে যেন— বসে বা দাঁড়িয়ে-7 – ঠিক মনে নেই, সে বাড়ি ফিরে এল। তার বাবা ইদানীং তাকে একটা স্কুটার কিনে দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেছিল। বাসে ভিড়। কিন্তু অপর্ণা এই প্রস্তাব ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করেছে, পাগল নাকি! স্কুটার ভীষণ বিপজ্জনক জিনিস। আমি যতদিন বেঁচে আছি ওসব হবে না।
একটা স্কুটার বা মোটরবাইক থাকলে তার অনেক সুবিধে হত। তার অনেক বন্ধুর আছে অ্যাকসিডেন্ট জিনিসটাই তো অ্যাকসিডেন্ট। রাস্তায় হাঁটছিল একটা লোক, পাঁচতলার ছাদে কাপড় রোদে শুকোতে দিয়ে ইট-চাপা দিয়েছিল। কেউ, বাতাসের তোড়ে কাপড় উড়ে ইট খসে পড়ল সোজা মাথার চাঁদিতে, লোকে তো এ ভাবেও মরে! খবরের কাগজে এ খবর পড়েছে অনীশ। মৃত্যু-ভয় আছে জেনেও মানুষ উঁচু পাহাড়ে চড়ে, রেসিং কার চালায়, প্লেন ওড়ায়, আরও কত কী করে!
ভেবে লাভ নেই। মা ওসব যুক্তির ধার ধারে না। কিন্তু তার বিবেচক বাবা কথাটা যে ভেবেছিল, তাতেই সে আজ যথেষ্ট কৃতজ্ঞ বোধ করে। বাবার অন্তত আপত্তি ছিল না।
রাত সাড়ে আটটার সময় দাবার এক চাল খেলা শেষ করল ঝুমকি আর অনীশ। জমল না। তারা কেউ মন দিয়ে চাল দেয়নি, কেউ জিততে চায়নি, ভুল চাল ফেরত নেয়নি। মাত্র পনেরো মিনিটে খেলাটা শেষ হয়েছে। ঘুটিগুলো নাড়াঘাটা করতে করতে অনীশ বলে, বাবা তোকেই সবচেয়ে বেশী ভালবাসে রে দিদি!
তোকে।
না, তোকে।
আগে আমাকেই বাসতো। এখন তোকে।
মোটেই নয়।
তোর চেয়ে বেশী। কিন্তু আমি ভালবাসি বাবাকে।
চ্যালেঞ্জ।
জানিস তো, ছেলেরা বিয়ে করলেই কাতি! কিন্তু মেয়েরা মোটেই সেরকম নয়।
বিয়েই করব না।
ওরকম সবাই বলে, আবার করেও। তারপর বউ-পাগলা ন্ত্রৈণ হয়ে সবাইকে ভুলে যায়। মা বাবা ভাই বোন কাউকে আর পাত্তা দেয় না। ছেলেগুলো ভীষণ ট্রেচারাস।
তুই মেয়েদের খুব সাপোর্টার, না?
তা কেন, যা সত্যি তাই বলছি।
শোন দিদি, আজ আমার ঝগড়া করতে ইচ্ছে নেই। মনটা বিগড়ে আছে। তুই একটা কবিতা পড়েছিস, যাতে এই লাইনটা আছে, আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর?
ঝুমকি একটু ভ্রূ কুঁচকে বলে, পড়েছি। সুকান্ত। কেন বল তো?
আমার একটুও বাংলা নলেজ নেই। এমন কি আপাও কত কী জানে। আমি কবিতাটা জানিই না!
কবিতাটা হঠাৎ তোর মনে পড়ল কেন?
আজকাল বাবা আমাকে প্রায়ই লাইনটা বলে। কেন বলে তা বুঝতে পারছি না। বাংলা আমি কিছু জানি না।
জানবি কি করে! ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে পড়ে ট্যাশ গরু তৈরি হয়েছিস যে। আমি তো তোর মতো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িনি। বাবা পড়ায়নি। তুই হচ্ছি। ড্যাডিজ র আইড বয়।
ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লে ট্যাশ গরু হয়? ট্যাশ গরু মানে কি বল তো! সামথিং মিক্স আপ? ক্রস ব্রিড?
তোকে নিয়ে আর পারা যায় না। অনু আর তুই দুটোই ট্যাশ-গরু।
বল না!
কবিতাটা পড়েছিস?
বললাম তো বাংলা নলেজ নেই।
ট্যাশ গরু একটা মজার কথা। এ ফানি মিক্সড আপ। তবে আসলে ননসেন্স ভার্স।
আর ও কবিতাটা! আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর!
ওটা ননসেন্স ভার্স নয়। পোয়েট্রি।
বাবা ওটা আমাকে কেন বলে?
বাবার ভয় আঠারো বয়স হওয়ার পর তুই একটু ওয়াইল্ড হয়ে যেতে পারিস।
ওয়াইন্ডা! আমি! আমি তো বরাবর শান্ত ছেলে।
ঝুমকি ভ্রূ কুচকে বলল, তাই বুঝি? আজকাল নিজের ক্যারেকটর সার্টিফিকেট নিজেই দিচ্ছিস? তোর কিল ঘুষি, চুলটানার ব্যথা আজও আমার যায়নি, তা জানিস?
ওঃ, তোর কথা তো আলাদা। দিদিদের সঙ্গে ভাইরা সকলেই ওরকম এক-আধটু করে।
ইস, মায়ের কথাগুলো কেমন মনে করে রেখেছে দেখ!
আচ্ছা, আমি সত্যিই ওয়াইল্ড হয়ে যেতে পারি বলে বাবা মনে করে?
বাবা তোকে নিয়ে ভীষণ ভাবে। তাই বলে। আঠারো বছর বয়সটা একটু খারাপ।
এই সময়ে রান্নাঘরে এক অপর্ণা। গ্যাসের উনুনে মাছের ঝোল আর ডাল ফুটছে। রুটি বেলছে কাজের মেয়েটা। রোজ একইরকম একঘেয়ে দৃশ্য। সে এই রান্না করা, খাওয়া, শোওয়া, ওঠা, রান্না করা… ইত্যাদি একটা ছক থেকে বেরোনোর কোনও পথ খুঁজে পায় না। মাকড়সার জাল যেমন এও ঠিক তেমনি। নিজের জালের পরিধিতে দিনের পর দিন আটকে থাকে মাকড়সা। অপর্ণাও কি তাই?
