কলকাতার বৃষ্টি এরকম, নিশিপুরে কিন্তু অন্যরকম।
অনেকক্ষণ বাদে গাড়ির ভিতরকার নিস্তব্ধতায় এই একটা মাত্ৰ কথা শোনা গেল।
ঝুমকি বাঁ দিকে কাচের ভিতর দিয়ে বাইরে চেয়েছিল, চোখ ফিরিয়ে বলল, কিরকম?
কলকাতার বৃষ্টি কি কারও ভাল লাগে? শান বাঁধানো শহরে বৃষ্টির কোনও ভূমিকাই নেই, সৌন্দর্য তো নয়ই, প্যাঁচপ্যাচে, নোংরা শহরটা যেন আরও কুচ্ছিত হয়ে যায়।
আর নিশিপুরে?
দেখেননি তো! মস্ত নদীর ওপর যখন মেঘলা আকাশের ছায়া পড়ে আর বৃষ্টির শব্দ মাদলের মতো বাজতে থাকে টিনের চালে, মাটির কোষে কোষে, ঘাসে, গাছে সব জায়গা যখন বৃষ্টি নেমে আসে তখন মন ভরে যায়। কী দামাল বাতাস!
ছোট্ট একটু গলা খাঁকারি দিয়ে ঝুমকি বলল, কলকাতায় কি বৃষ্টির দরকার নেই? বৃষ্টি হলে শহরের রাস্তাঘাট ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়, আবহাওয়া ঠাণ্ডা হয়, শুনেছি নাকি অসুখবিসুখও কমে যায়।
গাড়ি খুব ধীরে আর সাবধানে চালাতে চালাতে হেমাঙ্গ বলে, বৃষ্টির প্রয়োজন শহরেও আছে, কিন্তু বৃষ্টিকে তেমন করে উপভোগ করা যায় না। এখানে রাস্তায় জল জমে যায়, ট্র্যাফিক জ্যাম হয়।
আমার কিন্তু কলকাতার বৃষ্টি বেশ লাগে।
নিশিপুরে বর্ষাকালে গিয়ে কয়েকদিন থেকে আসলে আর কলকাতার বৃষ্টি তত ভাল লাগবে না।
ঝুমকি একটু হেসে হঠাৎ বলল, আচ্ছা, চারুমাসির বাড়ি যেতে আজ আমাদের এত সময় লাগছে কেন বলুন তো! আমি তো রোজ হেঁটেই চলে যাই।
উৎকণ্ঠ হেমাঙ্গ বলে, একটু ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। সোজা রাস্তায় একটা ট্রাক ব্ৰেকডাউন হয়ে পড়ে আছে। সেখানে জ্যাম।
ও।
তাছাড়া রাস্তায় জল জমে আছে। বেশি জোরে চালালে ইঞ্জিনে জল ঢুকে যাবে। তখন গাড়ি ঠেলা ছাড়া উপায় থাকবে না।
ও বাবা!
হেমাঙ্গ একটু হাসল, যন্ত্র নিয়ে ওইটেই তো অসুবিধে।
আপনি ঠিক কৃষ্ণজীবনবাবুর মতো হয়ে যাচ্ছেন, না?
হেমাঙ্গ আহত হল। সে কারও মতো, একথা শুনতে তার ভাল লাগার কথা নয়। সে গম্ভীর গলায় বলল, আমি আমার মতোই।
কৃষ্ণজীবনবাবুও খুব যন্ত্রবিরোধী লোক। উনিও খুব প্রকৃতি আর গ্রাম ভালবাসেন।
বুদ্ধিমান বিবেচক মানুষদের পক্ষে সেটাই তো স্বাভাবিক!
আচ্ছা, আমার তো শহরই বেশি ভাল লাগে। শহর কত ইন্টারেস্টিং। রোজ কত ঘটনা ঘটছে! আর গ্রাম যেন থেমে আছে। দিনের পর দিন একইরকম।
হেমাঙ্গ ফের একটু চুপ করে থেকে বলল, গ্রামেও ঘটে। অনেক কিছু ঘটে। চোখ থাকলে ঠিকই দেখা যায়।
কী ঘটে। সেখানে?
খুব ছোট ছোট ঘটনা। জোক কিভাবে চলে জানেন?
না। আমি জোক দেখিইনি। কিরকম হয় বলুন তো?
আপনার জন্য শিশিতে ভরে কয়েকটা নিয়ে আসব।
একটু বিবর্ণ হয়ে ঝুমকি বলল, কামড়ায় তো!
কামড়ে ধরে থাকে। সহজে ছাড়ে না।
ও বাবা!
জোকের কাছ থেকেও কিন্তু আমাদের শেখার আছে।
ঝুমকি হেসে ফেলল, জোকের কাছ থেকে আবার কী শেখার আছে?
টেনাসিটি। ওই কামড়ে ধরে থাকাটা। সকলে কি পারে ধরে থাকতে?
আমার শিখে দরকার নেই বাবা।
হেমাঙ্গ হাসল, ভয় পেলেন? প্রকৃতিতে কিছুই ভয়ের নেই। শহুরে লোকেরা যে কোনও পোকামাকড় সরীসৃপ দেখলেই ভয় পায়। আমিও পেতাম। এখন ভয়ের বদলে আনন্দ হয়। আমার উঠোন দিয়ে কত সাপ যাতায়াত করে জানেন?
মা গো!
কিন্তু আমার আর ভয় করে না। বেশিরভাগ সাপেরই বিষ নেই। বিষধরদেরও না ঘটালে কিছু করে না। ওদের মতো ওদের থাকতে দিন ওরাও আপনাকে আপনার মতো থাকতে দেবে। আর সাপ কী সুন্দর প্রাণী বলুন তো! আমন চিত্রল শরীর কোটা প্ৰাণীর আছে?
উঃ, সাপের কথা শুনেই আমার গা সিরসির করছে। প্লিজ, আর বলবেন না।
হেমাঙ্গ গাড়িটা চারুশীলার বাড়ির ভিতরে ঢুকিয়ে থামাল। তারপর স্বগতোক্তির মতো বলল, ইট ওয়াজ এ সুইট জার্নি। আসুন, সবাই আপনার জন্য বসে আছে।
মুখখানা কেন যে হঠাৎ রাঙা হয়ে গেল বুমকির কে বলবে!
ঝুমকির ওই লালিমাটুকু লক্ষ করল হেমাঙ্গ, যখন নেমে ঘুরে গিয়ে বাঁদিকের দরজাটা ঝুমকির জন্য খুলে দিয়ে দাঁড়াল। একটু ভাবল সে, কোনও অন্যায্য কথা বলে ফেলেনি তো! তাদের কথা হয়েছে। শহর, গ্রাম, বৃষ্টি, জোক আর সাপ নিয়ে। লজ্জা পাওয়ার মতো বিষয়বস্তু তো একটাও নয়!
যখন তারা দোতলার হলঘরে ঢুকল তখন একটা কর্ডলেস টেলিফোনে চারুশীলা কাকে যেন এক্ষুনি চলে আসার জন্য খুব করুণ গলায় অনুনয় করছিল, চলে আসুন না, প্লিজ… না না, এতে কিছুহবে না। জার্নি করে এসেছেন তো কী হয়েছে? আপনি তো দারুণ হার্ডি মানুষ।… দেখুন না। আমি তো প্ল্যান করে কিছু করিনি। আজ। হঠাৎ মনে হল এই বৃষ্টির দিনে একটু আড্ডা দেওয়া যাক… আচ্ছা, আপনি আমাদের অপছন্দ করেন না তো!… তা হলে চলে আসুন। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ!
টেলিফোন রেখেই চারুশীলা দৌড়ে এসে বুমকিকে ধরল, এসেছিস! উঃ বাঁচলাম।
কিন্তু তুমি তো আমাকে আগে বলোনি মাসি! আমার খুব রাগ হয়েছে।
আহা, এ বাড়িতে তোর আবার নেমন্তনের দরকার হয় নাকি? আগে থেকে ঠিক করা ছিলও না। হ্যাঁ রে, তোকে আজ এত সুন্দর দেখাচ্ছে কেন?
যাঃ! আমি আবার সুন্দর নাকি?
কেন, তুই বুঝি জনিস না যে তুই সুন্দরী? ন্যাকা!
বেশি বোলো না তো, শুনলেও লজ্জা করে।
না রে, তোকে আজ ভারি মিষ্টি দেখাচ্ছে। আয়, আজ তোকে একটা জিনিস দিই।
অনেক তো দিয়েছো মাসি! আর কেন?
আহা, কী আবার দিলাম তোকে?
তিনখানা জাপানি শাড়ি, দুটো দামী সেন্ট, এক ডজন লিপস্টিক আর মেক আপ, ভ্যানিটি ব্যাগ, কলম।
তাতে কি? আরও দেবো। আয় আমার সঙ্গে।
