অপর্ণা মেয়ের দিকে একটু চেয়ে থেকে বলে, আমার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল একটা ট্রামের মধ্যে। সামনে একটা রক্তমাখা লাশ পড়ে আছে, তখনও ভাল করে মরেনি। ভয়ে কাঠ হয়ে আছি। অর্ধচৈতন্য। তোর বাবা ক্যামেরা বুলিয়ে উঠে এল। পটাপট ছবি তুলল, তারপর আমাকে দেখে খুব অবাক হয়ে কী যেন বলল। আমি জবাবও দিতে পারিনি। তখন আমাকে হাত ধরে টেনে নামিয়ে আনল। চারদিকে কাদানে গ্যাস, গুলি। এসপ্ল্যানেড ইস্টে পুলিশ লাঠিচার্জ করছে। কী সাহস ছিল লোকটার!
গল্পটা তারা বহুবার শুনেছে। ঝুমকি বলল, ছিল নয়। মা, আমার বাবা এখনও সাহসী। বাবার মতো এরকম পুরুষ দেখাই যায় না। বাবা এই ফেজটা কাটিয়ে উঠবে।
তোমরা দুই বোন বাবাকে একটু সঙ্গে দিও। ছেলের জন্য তাহলে আর ততটা মন খারাপ করবে না।
আচ্ছা মা।
হ্যাঁ রে, হেমাঙ্গবাবুর একটা বাড়ি আছে না কোন গ্রামে যেন!
ঝুমকি হঠাৎ যেন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তারপর বলল, হ্যাঁ, নিশিপুর।
তুই একবার গিয়েছিল না চারুশীলার সঙ্গে?
হ্যাঁ তো।
তোর বাবাকে সেখানে কয়েকদিন রাখা যায়?
ঝুমকি একটু ভেবে বলল, তার কি দরকার আছে মা?
কথাটার জবাব আগে দে। উল্টে প্রশ্ন করছিস কেন?
রাগ করলে?
তোর বাবা এটা নির্জন জায়গা চাইছে।
ঝুমকি ইতস্তত করে বলে, বলে দেখা যায়। হেমাঙ্গবাবু প্রতি উইক-এণ্ডে সেখানে চলে যান বলেই শুনেছি।
এক সপ্তাহ যদি আমি আর তোর বাবা গিয়ে সেখানে থাকতে চাই তাহলে রাজি হবে হেমাঙ্গ?
তা হবে বোধহয়।
একটু বুলি দেখ না। হেমাঙ্গ তো চমৎকার মানুষ। যেমন বিনয়ী, তেমনি ভদ্রতাবোধ, ওর বাড়িতে ফোন আছে, ফোন করে দেখবি?
আজ রবিবার। বোধহয় আজ সেখানেই গেছে।
দেখ না একবার! যা বৃষ্টি হচ্ছে কদিন। হয়তো যায়নি।
নম্বর দিচ্ছি, লাইনও না হয় ধরে দিচ্ছি, তুমিই কথা বলো মা।
আমি! আমার সঙ্গে তো ততটা পরিচয় নেই। একটু আলাপ।
ঝুমকি ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে, আমার বড্ড লজ্জা করছে মা। গুছিয়ে বলতে পারব না।
ওমা! মেয়ের লজ্জা দেখ। যখন চাকরি করতে গিয়েছিলি তখন এ লজ্জা কোথায় ছিল? দুটো মাত্ৰ কথা জিজ্ঞেস করবি, অত লজ্জার কী?
ঝুমকি কাতর গলায় বলে, প্লীজ মা। আচ্ছা, আমি না হয় চারুমাসীকে দিয়ে বলিয়ে দিচ্ছি।
তবু নিজে বলবি না? ঠিক আছে, চারুকেই বল। সেটাই ভাল হবে বোধহয়।
ঝুমকি উঠল এবং চারুশীলার নম্বর ডায়াল করল।
তার গলা শুনেই চারুশীলা চেঁচিয়ে উঠল, এই ঝুমকি! শীগগির চলে আয়। আজ শাহী পোলাও করা হচ্ছে। সঙ্গে আলু আর মুগীর দো-পেঁয়াজা। আসবি?
এ বৃষ্টিতে বেরোলে মরে যাবো।
আচ্ছা বাবা, গাড়ি পাঠাচ্ছি।
ঝুমকি হাসল, ফের বাড়াবাড়ি শুরু করেছো! তুমি কি একটুও একা থাকতে পারো না?
একা কী রে? জয়েন দ্য ক্রাউড। আমার বাড়িতে এই বৃষ্টিতেও কারা আজ এসেছে জনিস?
কারা?
রিয়া উইথ চিলড্রেন, মলয় নামে সুব্রতর এক বন্ধু উইথ ফ্যামিলি অ্যাণ্ড দেয়ার ইজ অ্যানাদার পারসন। গেস হু?
কি জানি বাবা।
দুর বোকা! পারলি না? হেমাঙ্গা! দ্যাট গ্ৰেট সন্ন্যাসী ব্রাদার অফ মাইন। চলে আয়।
শোনো মাসী, আমার একটা কাজ করে দেবে?
কি কাজ রে?
আমার মা আর বাবা এক সপ্তাহের জন্য একটা আউটিং-এ যেতে চায়। হেমাঙ্গীবাবুর সেই নিশিপুরের বাড়িটায় ওদের
ব্যবস্থা করে দিতে পারবে?
ধুস! এটা একটা কাজ হল?
দাও না তাহলে বলে।
তুই নিজেই বল না। ঐ তো হেমাঙ্গ ক্যারম খেলছে।
না মাসী। আমার লজ্জা করছে।
আচ্ছা তাহলে বলছি। কিন্তুকণ্ডিশন আছে।
কী কণ্ডিশন?
গাড়ি পাঠাচ্ছি, চলে আয়। এ বাড়িতে আসতে তো তোর নেমন্তনের দরকার নেই।
না, আজ থাক।
অবজেকশন ওভাররুলড়। গাড়ি যাচ্ছে। পাঁচ মিনিটে তৈরি হয়ে নে। আচ্ছা বাবা, গাড়ি লাগবে না। দু মিনিটের তো হাঁটাপথ। আমিই যাচ্ছি। না বাবা, তোর ঠাণ্ডার ধাত। ভিজলে আবার গণ্ডগোল হবে। গাড়ি তো বসেই আছে। তৈরি হয়ে নে। ফোনটা রেখে মায়ের দিকে চেয়ে ঝুমকি বলল, হল তো! ফোন করে ফ্যাসাদ ডেকে আনলাম। এখনও ও বাড়িতে
যেতে হবে।
হেমাঙ্গর বাড়িটা পাওয়া যাবে?
তা যাবে। কিন্তু এখন আমাকে তৈরি হতে হবে যে! নেমন্তন্ন।
তা যা না।
চারু বড় ভাল মেয়ে। ঝুমকি তৈরি হচ্ছিল। বুক কাঁপছে। গলা শুকোচ্ছে। সে নিজের কাছে ধরা পড়ে গেছে অনেক দিন। মনে মনে অনেক লড়াই করেছে। হেরে গেছে। কী করবে ঝুমকি? তার যে কিছুই করার নেই।
প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে সদরে একটা গাড়ি এসে থামল। দরজা খোলা ও বন্ধের শব্দ হল। তারপরই ডোরবেল।
দরজা খুলে অপর্ণা একটু অপ্রতিভা। সামনে এক গাল হাসি নিয়ে হেমাঙ্গ দাঁড়িয়ে।
আরে, আপনি এসেছেন! আসুন।
গায়ের পাতলা বর্ষতিটা খুলে হেমাঙ্গ ঘরে ঢুকে বলল, মণীশবাবু কোথায়?
বসুন, ডাকছি।
মণীশ এল। প্ৰসন্ন মুখে বলল, কী খবর?
আপনাকে আমার গায়ের বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে এলাম। কবে যাবেন বলুন!
মণীশ অপ্রস্তুত, বলল, যাবোখন। তাড়া কি?
নুনু আমার তাড়া আছে। আমি আমার বাড়িটা কয়েকজন সজ্জনকে দেখাতে চাই।
মণাশ হাসল।
অপর্ণা বলল, হেমাঙ্গীবাবুর বাড়িটা নাকি খুব সুন্দর জায়গা। চলোই না কয়েকদিন বেড়িয়ে আসি।
মণীশ মাথা নেড়ে বলল, ছুটি নেই যে।
ছুটির দরকার নেই। চাকরি যাবে না। চলো।
ভিতরের ঘরে ঝুমকি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। চারুমাসীটা যে কী? ওকেই পাঠাল কেন নিতে? ঝুমকির বুঝি লজ্জা
করে না?
১০৪. ছোট ফিয়াট গাড়ির মধ্যে
ছোট ফিয়াট গাড়ির মধ্যে তারা দুজন সামনের সিটে পাশাপাশি বসা। চারদিকে বৃষ্টির ঝরোখা, সামনের উইন্ডস্ক্রিনে বৃষ্টির লহর খেলছে। চারদিক আবছা, মেঘলা আলোয় কিছু অপ্ৰসন্নতা। কিন্তু পৃথিবীর ঋতুচক্রের নিয়ম অনুযায়ী বাদলার সময় বৃষ্টিও তো হবে। আজ বুঝি এই বৃষ্টির আলাদা কোনও প্রয়োজন ছিল? কে জানে কী!
