মণীশ মৃদুস্বরে বলল, আচ্ছা, আমি কি ইচ্ছে করে ডিপ্রেসড হয়ে আছি? মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে এমন তো হতেই পারে যখন সে নিজের মনের সঙ্গে লড়াই করে হেরে যায়।
আমি শুধু কারণটা জানতে চাই।
কারণটা যদি আমিও জানতাম! নিজের মনে পাতি পাতি করে খুঁজে দেখছি রোজ, বুঝতে পারছি না।
আমার মনে হয়, বুবকার জন্যই।
হতে পারে। তবে কি জানো, আজকাল আমার একা চুপচাপ থাকতে ভাল লাগে। আমি বরাবর হৈ-চৈ হুল্পোড় ভালবাসি। নির্জনতা বরং সইতে পারতাম না। আজকাল কেন লোনলিনেস ভাল লাগে!
তুমি কি ইনট্রোভার্ট হয়ে যাচ্ছে?
তাও জানি না। কিছুই জানি না। শুধু তোমাকে বলি, প্লীজ, আমাকে নিয়ে অত দুশ্চিন্তা কোরো না। কয়েকদিন যাক, স্পেলটা হয়তো কেটে যাবে।
অপর্ণার দুচোখ টলটল করছিল জলে, এবার উপচে পড়ল। স্বলিত গলায় বলল, তোমাকে এরকম দেখলে আমার কত কষ্ট হয়তো জানো?
জানি অপু। আমি তো তোমার কাছেই আছি।
কোথায় কাছে আছো! কত দূর মনে হয় তোমাকে তা কি জানো?
তাও জানি। বিয়ার উইথ মি। আমার সঙ্গে এই সময়টা পার করে দাও।
আমার গৃহপ্ৰবেশের কী হবে?
গৃহপ্ৰবেশ হতে বাধা কি? হোক।
তুমি পার্টিসিপেট করবে তো?
কেন করব না? শুধু একটা অনুরোধ, অফিস থেকে এ বাড়িটার ভাড়া দিচ্ছে। আপাতত আমরা এ বাড়ি ছাড়ব না। কেমন?
নিজের বাড়ি থাকতে আর পরের বাড়িতে কেন?
এখান থেকে অফিসে যাতায়াতের সুবিধে বেশি। তাছাড়া এ জায়গাটা আমার বেশ ভদ্র বলে মনে হয়।
গৃহপ্ৰবেশের পর কি বাড়ি তালাবন্ধ পড়ে থাকবে?
তাই থাক না কিছুদিন।
অপর্ণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তাই থাক।
আজ মেঘলা বৃষ্টির দিনের চাপা অন্ধকারে অপর্ণার সকালটা মাটি হয়ে গেল। সে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। হল পেরিয়ে সামনের বারান্দায় এসে বৃষ্টির দিকে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ। তার এখনও কত অপূর্ণ সাধ রয়ে গেছে। বাড়িটা হল, এরপর ছিল বাড়ি সাজানোর পালা। এখনও রং হয়নি ভিতরে। প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে পলেস্তারা পড়েছে। ওপরে হবে হাল্কা খুশিয়াল রঙের প্ল্যাস্টিক পেইন্ট। সামনের ঘরে ওয়াল পেপার লাগাবে বলে পছন্দও করে রেখেছিল একটা আরণ্যক দৃশ্য। কী যে চমৎকার হত। নতুন কিছু আসবাবু দিয়ে সামনের হলঘরটা ছবির মতো সাজাবে।
কিন্তু কী হবে। আর? যাকে নিয়ে, যাকে ঘিরে তার জীবনের সব সাধ-আহাদ, সে কেন এরকম মনমরা হয়ে যাচ্ছে?
কী হয়েছে মা? এনিথিং রং? কাদছো নাকি?
অপর্ণা ফিরে অনুকে একটু দেখল। অনু আর ছোটোটি নেই। তার কাঁধ ছাড়িয়ে উঠছে। লকলক করছে বয়স। ওদের আর ভুলিয়ে রাখা যায় কি?
অপর্ণা চোখ মুছল। ধরা গলায় বলল, বাপির কাছে যা। কথা বলিস না। কাছে বসে থাক। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দে, যা।
অনু একটা চিন্তা করল যেন। তারপর বলল, বাপি ইজ ক্ৰডিং। ভেরি মাচ ইন এ ট্রান্স। বাপিকে ডিস্টার্ব কেন করবো মা?
তোর বাবার কী যে হয়েছে বুঝতে পারছি না।
বোধহয় হি ইজ মিসিং দাদা ভেরি মাচ।
তাই তো ভাবছি। কিন্তু এতটা কি স্বাভাবিক? ছ মাসের বেশীই তো হয়ে গেল। এখনও কেন মিস করবে?
বাবা যে দাদাকে ভীষণ ভালবাসে। কিন্তু তুমি এত আপসেট কেন মা? হোয়াই ইউ?
আমার ভাল লাগছে না। গৃহপ্রবেশে কত আনন্দ হবে বলে ভেবেছিলাম। কিছু করতে ইচ্ছে করছে না।
অনু বেশ সুন্দরী। ফরসা, স্বাস্থ্য বেশ চমৎকার, মুখখানা চটক-সুন্দর। ঝুমকির সৌন্দর্য অন্যরকম। সে রোগার দিকে, লাবণ্যই বেশী। তাকে চোখে পড়ে না, কিন্তু একটু তাকিয়ে থাকলে ঝুমকি যে কত সুন্দর তা বোঝা যায়। অনু চট করে চোখে পড়ে। নিচের ঠোঁটটা ঝকঝকে সুন্দর দাঁতে একটু কামড়ে ধরে সে বলল, আচ্ছা, আমি বাপির কাছে যাচ্ছি।
শোন, বেশি কথা বলিসনি।
আচ্ছা মা! আমি আজকাল বাপিকে অন্য ধরনের কম্প্যানি দিই। কবিতা শোনাই, শেক্সপীয়র শোনাই, বিটোফেন শোনাই। বুঝেছো?
বুঝেছি, তুমি তো পাকা মেয়ে।
ঠিক কথা। আমি ম্যাচিওরড।
শোন, বরং এক কাপ কফি করে নিয়ে যা। তোর বাবা এসময়ে একটু কফি খায় দুটির দিনে। আজ বৃষ্টিও হচ্ছে।
ঠিক আছে।
ঝুমকি উঠেছে?
কখন! শী ইজ অলসো ব্রুডিং।
কেন?
আজকাল দিদিও তো চুপচাপ মা। অল অফ ইউ আর কিপিং মাম।
অনু চলে যাওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখল। অপর্ণা। তারপর হলঘর পেরিয়ে এল ঝুমকির ঘরে। ঝুঁকি এই সূতসকালে একটা মোটা বই খুলে পাশে রেখে টেবিলে খাতা খুলে কী লিখছে।
কী করছিস?
তাঁর ঠাণ্ড হাসি হেসে বলল, একটু কাজ।
কিসের কাজ?
একটা প্রোগ্রামিং। যশিখেছিলাম সব প্র্যাকটিসের অভাবে ভুলে যাচ্ছি।
তোর বাবা এত চুপচাপ হয়ে গেছে যে আমার মনটা ভাল নেই।
ঝুমকি একটু অবাক হয়ে বলল, ঠিক বলেছে তো মা! বাবা আগের মতো আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা-ইয়ার্কিও করছে না আজকাল, তাই না?
এতদিনে সেটা টের পেলি?
ঝুমকি একটু লজ্জা পেয়ে বলে, আমি ভাবছিলাম, বুবকার জন্য বোধহয় মন খারাপ।
যদি তাই হয় তবে কি আমাদের উচিত হবে না লোকটাকে একটু আনন্দের মধ্যে রাখা।
সে তো ঠিক কথা। আচ্ছা, আমি বাবার কাছে যাচ্ছি।
এখন দরকার নেই। অনুকে পাঠিয়েছি। এখন আবার তুই গেলে ভাববে। আমিই দুজনকে পাঠিয়েছি।
তাহলে থাক। আমি বরং পরে যাবো। বাবাকে নিয়ে তুমি কি খুব চিন্তায় পড়েছো?
পড়ব না?
অত চিন্তা করো না, আমার বাবা একজন করেজিয়াস সেলফ-মেড ম্যান। একটু সেন্টিমিন্টাল আছে, কিন্তু আমার বাবা সহজে কাবু হওয়ার লোক নয়।
