তোমার অনেক বন্ধু ছিল একসময়ে। যখন খবরের কাগজে কাজ করতে তখনকার কলিগারাও তো আছে! ডাকবে না। তাদের?
মণীশ প্রস্তাবটা মাছি তাড়ানোর মতো হাতের ঝাঁপটায় উড়িয়ে দিল। বলল, আরো না না, ও চ্যাপটার কবেই ক্লোজড হয়ে গেছে। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে? পুরনো আমল ধরে টানাটানি কেন ভাই!
কেমন দেখাবে বলো তো সেটা! আমার বাপের বাড়ির লোকেরা আসবে, তোমার কেউ আসবে না?
মুখটা করুণ করে মণীশ বলল, আমার কেউ নেই যে আপু! কবে মা-বাবা মরে গেছে। এক কাকা ছিল, বছর পাঁচেক হল নেই। তার ছেলে নয়ন দিল্লিতে চাকরি করে, মেয়ে রাউরকেল্লায়। বহুকাল যোগাযোগ নেই। এদের ডাকার কোনও মানেই হয় না! কেউ আসবে না।
তাইতো বলছি, পুরনো বন্ধুদের ডাকো!
সেটাও অর্থহীন হবে। সম্পর্কই নেই, হঠাৎ নেমন্তন্ন করার মানে হয়?
আচ্ছা, একটা কথা বলবে?
কি কথা?
তুমি এক সময়ে দারুণ আড্ডাবাজ ছিলে। কিন্তু ধীরে ধীরে সব ছেড়ে দিলে কেন?
আবার জোর করে একটু হাসে মণীশ, মেজাজটা হারিয়ে গেছে।
কেন হারাল?
বিয়ে করার পরথেকেই কেন যেন বাইরে বাইরে কাটাতে ভাল লাগত না। তখন ফটোগ্রাফির জন্য খুব ঘুরে বেড়াতে হত। একটা ক্লান্তি ছিল। তোমাকে পেয়ে ঘরমুখ্যো হলাম। তারপর নতুন একটা ভাল চাকরি পেয়ে আড্ডাটা ছাড়তে হল। ছেলে-মেয়ে হওয়ার পর আরও সরে এলাম। এরকম সবারই অল্পবিস্তর হয়।
না গো, তুমি বড্ড বেশি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছো! তোমাকে এতখানি ঘরকুনো আড্ডাছাড়া করতে কি আমি চেয়েছিলাম, বলো তো?
একটু অবাক হয়ে মণীশ বলে, তুমি করেছে বলিনি তো! আমার নিজেরই ভাল লাগত না।
কাজটা বোধহয় ভাল করোনি। তোমার একটা বাইরের জগৎ থাকলে বোধহয় ভালই হত।
ম্লান একটু হাসল মণীশ, এই-ই ভাল আছি।
বুবকার জন্য কি তোমার খুব বেশি কষ্ট হয়?
মণীশ মাথা নেড়ে বলে, না, বুবকা বড় হয়ে গেল, এখন তো দূরে সরে যাবেই। ওটা মেনে নিয়েছি। অত ভাবছো কেন?
তোমারমুখখানা যে ভীষণ করুণ দেখায় আজকাল।
ও এমনিই। আমার মনের কোনও ব্যালান্স নেই। এই ভাল, এই খারাপ।
অফিসে কিছু হয়নি তো?
আরে না, অফিসে কী হবে!
তাহলে এমন মেলাঙ্কলিক হয়ে যাচ্ছে কেন? আগে তো ঝুমকি বুবকা আর অনুর সঙ্গে আড্ডা মারতে, মেয়ে দুটো তো আছে।
মণীশ হাসল, হ্যাঁ আছে। তবে ওরা পরভৃৎ। ভাব করে কি হবে! কিছুদিন পরেই তো অন্যের ঘরে পালিয়ে যাবে।
উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। নিজের মেয়ে পরের ঘরে যাবে বলে তো খুব দুঃখ, আর পরের মেয়েকে যে তুলে এনেছো নিজের ঘরে! তার বেলা?
তা বটে। কিন্তু আমি তো জীবনের নিয়ম পাল্টে দিতে চাই না অপু। যা ঘটবার তা ঘটবেই! বুবকা বড় হল, হস্টেলে গেল, এরপর হয়তো বিদেশে চলে যাবে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাবে। এসব ঘটনা তো স্থির হয়েই আছে। আমি শুধু একটু গুমারে মরব। এই যা!
ইজিচেয়ারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে অপর্ণা বলল, ওগো ওরকম করতে নেই। তুমি ওরকম করলে আমি যে ভীষণ দুর্বল হয়ে যাই। তুমি আগের মতো একটু হই-চই করলে আমার বুকটা ঠাণ্ডা হবে।
স্তিমিত গলায় মণীশ বলে, আমার ভিতর থেকে হৈ-চৈ ভাবটা উঠে আসছে না। অপু। তোমাকে যদি আমার ভিতরটা দেখাতে পারতাম! যেন একটা অন্ধকার ঘর। শব্দ নেই, আলো নেই, কিছু নেই।
ও মা গো! শুনলে বুকটা কেমন করে।
ভয় পেও না। হয়তো একটা ডিপ্রেশন চলছে। ঠিক হয়ে যাবে।
বরং বুবকাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলে চিঠি লিখে দিই।
না না, এই তো সামার ভ্যাকেশন কাটিয়ে গেল। ওসব করতে যেও না। বুবকার জন্য নয়। অপু। বুবকাও একটা ফ্যাক্টর বটে। কিন্তু আসলে হার্ট অ্যাটাকটাই আমার ভিতরে মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। আজকাল কেবল এই বৃথা জীবনযাপনের অর্থটা হাতড়ে বেড়াই, কিছু পাই না।
তোমাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে এবার ঠিক আমার হার্ট অ্যাটাক হবে। কী করলে তুমি ভাল থাকবে বলো তো?
তা তো জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয় বেশ তপোবনের মতো যদি একটা জায়গা খুঁজে পেতাম। শান্ত, পবিত্র, নির্জন, চারদিকে নিবিড় গাছপালা, তাহলে বোধহয় সেখানে গিয়ে থাকতে ভাল লাগত।
সেরকম জায়গা বোধহয় খুঁজলে পাওয়া যাবে। কদিন ছুটি নিয়ে চলো ঘুরে আসি।
খুব উৎসাহ দেখাল না মণীশ। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ওরকম জায়গা হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু গিয়ে হয়তো আমার আর ভাল লাগবে না।
হঠাৎ অপর্ণা বলল, আচ্ছা, আমার মনে পড়ল, চারুশীলার ভাই হেমাঙ্গ এরকমই একটা কোন জায়গায় যেন গিয়ে মাঝে মাঝে থাকে। চারুশীলার সঙ্গে ঝুমকিও একবার গিয়েছিল। সুন্দরবনের দিকে বোধহয়। সে নাকি নদীর ধারে খুব সুন্দর নির্জন একটা জায়গা। দাঁড়াও, ঝুমকিকে ডাকি।
থাক অপু। ওসব পরে হবে। তুমি তোমার গৃহপ্রবেশের কথা কী বলছিলে?
অপর্ণ স্নান হয়ে বলে, আমার গৃহপ্রবেশের কথা তো কেউই শুনতে চাইছে না। বাড়িটা যেন একা আমার। কী সুন্দর দেখতে হয়েছে বাড়িটা! যে দেখছে সেই পছন্দ করছে। চারুশীলার বর সুব্ৰত নিজে ডিজাইন দেখে দিয়েছে! কত বড় আর্কিটেক্ট! শুধু এবাড়ির কারোরই গাল উঠছে না।
তা নয়। অপু। আমার এখন আর জাগতিক কিছুর প্রতিই আকর্ষণ নেই। তোমার বাড়ি খুব সুন্দর হয়েছে সন্দেহ নেই। আমার ভালও লেগেছে। তবে আমার আরও গভীর চিন্তার কারণ ঘটেছে বলেই বাড়িটা নিয়ে ভাববার বা আনন্দ করার মেজাজটা নেই।
সেইজন্যই তো আমার মন খারাপ। তোমার আনন্দ না হলে ও বাড়ি দিয়ে আমার কী হবে? আমার এত পরিশ্রম বৃথা গেল।
