রেগে যেতে গিয়েবীণা হেসে ফেলল, তোর অঙ্ক খুব সোজা। সব একেবারে স্পষ্ট দেখতে পাস, না?
তা নয় তো কী?
তুই জীবনে খুব সুখী হবি। খুব আহ্লাদে থাকবি।
তুমি কেন নিমাইদাকে ভালবাসো না বলো তো! ওরকম মানুষকে ভাল না বেসে পারা যায়?
বুঝি নিমাইদার প্রেমে পড়েছিস রে মুখপুড়ি?
যে সব অসভ্য অসভ্য কথা বলো!
অসভ্য কেন হবে! ঠিকই তো বলছি। এতই যদি পছন্দ। তবে বিয়ে করে ফেল। এখন তো আর আমি তার বউ নই।
ইস! তোমার মুখের একেবারে আগল নেই। বীণাদি, ভগবান কিন্তু পাপ দিচ্ছেন।
বীণা খুব হাসল, বলল, দিক না পাপ।
খুব তো বলছো, ওদিকে জুরের ঘোরে স্বপ্ন দেখে তো কাঁদতে বসেছিলে নিমাইদাদা আবার বিয়ে করেছে ভেবে। আমাকে খবর আনতে বলেছিলে, মনে নেই?
তা আছে।
তবে অত বড় বড় কথা বলছো যে! তুমি মনে মনে ঠিকই নিমাইদাদাকে ভালবাসো, মুখে স্বীকার করতে চাও না।
খুব বুঝেছিস।
বুঝিনি?
ছাই বুঝেছিস।
কুসুম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কি জানি বাপু, আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। যেমন বুঝি বলি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বীণা গান্ধীর হল। বলল, হয়তো তুই-ই ঠিক বুঝিস রে। কে জানে কে ঠিক আর কে ভুল!
বীণা চুপচাপ শুয়ে রইল। সারা দিন গরম আর ঘামে তার শরীর দুর্বল লাগছে। মনটা বিস্বাদে ভরা। এভাবে কি জীবন কাটবে? এই কাজ-না-থাকা, পালা-না-থাকা, ক্ল্যাপহীন জীবন কিভাবে কাটবে তার?
রাতে কিছু খেল না বীণা। রান্না করতেই ইচ্ছে করল না। শুয়ে মড়ার মতো ঘুমোলো।
সকালে উঠে তার মনে হতে লাগল, এভাবে জীবন কাটবে না তার। এভাবে কিছুতেই বেঁচে থাকা যাবে না। তাকে কিছু করতে হবে। কী করবে। সে? কী করবে?
বেলা দশটা নাগাদ যখন দ্বিতীয়বার চা খেতে বসেছে বীণা, তখনই একটা ছেলে এল। সাধারণ চেহারা। বিনয়ী। বলল, আমাকে নিমাইদাদা পাঠিয়েছেন। এই যে চিঠি।
নিমাইয়ের চিঠি! খুব অবাক হল বীণা। মুক্তোর মতো হস্তাক্ষরে খামের ওপর তার নাম লেখা। চিঠিটাও মুক্তাক্ষরে। তবে সম্বোধন নেই। শুধু লেখা: তোমার অবস্থা আমি জানি। যদি দোষ না ধরো তাহা হইলে সামান্য কিছু টাকা গ্ৰহণ করিও। এই অর্থে কোনও গ্রানি নাই। আমি পরিশ্রম দ্বারা উপার্জন করিয়াছি। নিমাই।
বীণা চোখ তুলে চাইতেই ছেলেটা তার প্লাস্টিকের ব্যাগ খুলে এক বাণ্ডিল নোট বের করে দিল।
আশ্চর্যের বিষয়, বীণা কিছু না ভেবেচিন্তেই টাকাটা নিল।
পাঁচ হাজার আছে। গুনে নিন।
গুনতে হবে না।
একটু যদি লিখে দেন তো ভাল হয়।
কী লিখবো?
টাকাটা যে পেয়েছেন।
ও।
বীণা ঘরে খুঁজেপেতে একটা পার্ট মুখস্থ করার খাতার কাগজ ছিঁড়ে তাতে লিখল, টাকাটা পেয়েছি। বীণা।
সারাটা দিন বীণা আজ ঝুম হয়ে বসে রইল। রান্না করতে ইচ্ছে হল না। খিদে পেয়েছিল, মুড়ি চিবিয়ে চা খেয়ে খিদেটা মারল।
কুসুম সন্ধেবেলা এল।
কী গো বীণাদি, মুখ শুকনো কেন?
এমনি বসে আছি। মন ভাল নেই।
আবার কী হল?
তোর নিমাইদাদার কাছে হেরে যাচ্ছি।
আহা, কী কথা! হারার কী হল?
তোর নিমাইদাদা আমাকে খোরপোষ পাঠাচ্ছে।
সে আবার কী?
বউকে ত্যাগ দিলে খোরপোষ দিতে হয় না, তাই!
কুসুম হাসল, টাকা পাঠিয়েছে বুঝি?
হ্যাঁ, আর আমিও নির্লজের মতো নিলাম।
নেবে না কেন? ও টাকা তো আশীৰ্বাদ!
তোর মতো করে ভাবতে পারলে বোধহয় ভাল হত। আমি যে পারি না।
না পারো, টাকাটা মাথায় ঠেকিয়ে খরচ কোরো। ওতেই হবে।
কী হবে রে?
ভাল হবে।
বীণা কিছু বলল না। আজ মনটা অন্যরকম লাগছে। অদ্ভুত লাগছে।
বীণাদিদি, একটা কথা বলব?
বলনা!
যাও না একবার নিমাইদাদার কাছে!
গিয়ে?
পায়ে পড়ো গিয়ে।
ওমা, কেন?
তাই বা কেন?
স্বামীর পায়ে ধরতে হয়।
তোর মাথা!
১০৩. রবিবারের এক সকালে
হ্যাঁ গো, গৃহপ্ৰবেশে আমরা কাকে কাকে নেমন্তন্ন করব। রবিবারের এক সকালে বিষণ্ণ মণীশকে কথাটা জিজেস করল অপর্ণা।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। মেঘলা আকাশ নিবিড় মেঘে ছাইরঙা হয়ে আছে। মণীশ বসে আছে আবছা অন্ধকার ঘরে, জানালার ধারে তার পলকা ইজিচেয়ারে। পাশে একখানা টেবিল। ইংরেজি-বাংলা দুটো খবরের কাগজ জড়ো হয়েছে তার ওপর। মণীশ কাগজদুটো একটু উল্টেপাল্টে রেখে দিয়েছে, যেন পৃথিবীর কোনও খবরেই তার আর কোনও প্রয়োজন নেই। বিষণ্ণ দুটি চোখ জানালার বাইরে স্থাপন করে সে চুপ করে বসে আছে।
ক্ৰমে ক্ৰমে মণীশের এই চুপ হয়ে যাওয়া ভাল লাগছে না। অপর্ণার। আজকাল রাতে বিছানায় শুয়ে আগেকার মতো কিছুক্ষণ গল্প করার অভ্যাসটাও কমে যাচ্ছে তাদের। অপর্ণার অনেক কথা থাকে। বলেও, কিন্তু মণীশ নীরবে শোনে। জবাব দিতে চায় না। মণীশের কাছ থেকে কথা বের করতে না পেরে অপর্ণার নিঃসঙ্গ লাগে, ভয় হয়। ভয় জিনিসটার কোনও মাথামুণ্ডু নেই। কতরকম ভয়, কত রকম যে অমঙ্গলের কথা মনে হয় সব সময়ে!
হ্যাঁগো, কী হল তোমার? বলে মণীশের মাথায় সস্নেহে হাত রাখল অপর্ণা।
মণীশ চোখ দুখানা তার দিকে তুলল। মুখে বিমৰ্ষতা ছাড়া আর কোনও এক্সপ্রেশন নেই। শুধু ছেলে হোস্টেলে গেছে বলেই কি এতটা মনখারাপ হয়। কারও!
মণীশ একটু জোর করেই হাসল। বলল, কিছু হয়নি। আজকাল একটু গুটিয়ে যাচ্ছি নিজের মধ্যে। কী বলছিলে?
আমি বলছিলাম, গৃহপ্রবেশে কাকে কাকে ডাকা হবে? কার্ড ছাপিয়ে নেমন্তন্ন করতে হবে কি না। ক্যাটারার কাকে ঠিক করবে। অনেক কথা আছে যে তোমার সঙ্গে। অমন চুপ করে থাকলে তো আমার চলবে না!
মণীশ একটু উঠে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করে বলল, এগুলো তো সব তোমার ব্যাপার। আমার তো কয়েকজন অফিস-কালিগ ছাড়া ডাকার কেউ নেই। আত্মীয়স্বজনই বা কে বলো! একটা ভাই, তা সেও বিকানিরে। তাকে নেমন্তন্ন করলেও আসতে পারবে না। আমি বলি, তুমি যাকে ইচ্ছে ডাকো। আমি আমার কলিগদের কয়েকজনকে ডাকতে পারি।
