কুসুম এসে একদিন বলল, বীণাদি, কাজ করবে?
কী কাজ রে?
সেলাই ফোঁড়াই জানো? তাহলে সমীরবাবুর ওখানে কাজ হতে পারে। উনি সেলাই জানা লোক খুঁজছেন। কাঁথা ফোড় না। কী যেন বলে, শাড়ির ওপর সেই কাজ করতে হবে।
ধুস! ওসব আমি পারি না।
কুসুম হেসে বলল, তাহলে কী করবে?
হ্যাঁ রে, কাকা আমার কথা কিছু বলে না?
না।
একদম না?
না গো, তোমার কথা আর কেউ বলে না।
নতুন পালা নামছে নাকি, জানিস?
হ্যাঁ। কাকা তো নতুন একটা পালা লিখল। বর্ষাকালটা জোর রিহার্সাল হবে।
আমার বদলে এখন কে করবে। মেইন পার্ট?
পুতুল রায় বলে সেই যে মেয়েটা। সে-ই করছে।
এঃ মা! তার তো লেপাপোছা নাক-চোখ। জিবের আড় ভাঙেনি।
এখনকাকা তো তাকেই তৈরি করছে।
বীণার মন খারাপ হয়ে গেল। তার ঘরের কাজকর্ম আজও করে। তাকে সঙ্গও দেয়। তার কাছে দলের অনেক খবর পায় বীণা। সেইসব খবর তার দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়। এই যে পুতুল নামে মেয়েটা, ফিরে তোকানোর মতো চেহারাও নয়। আর অভিনয়ের কিছুই জানে না এখনও, এর কথা ভেবে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে।
হ্যাঁ রে কুসুম, আমাকে একটা লক্ষ্মীর পট এনে দিবি?
দেবো না কেন? কী করবে?
কোনওকালে পুজোআচ্চা ধর্মকর্ম করিনি তো! আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়, এসব একটু করে দেখি।
খুব ভাল হয়। বীণাদি। লক্ষ্মীর পাঁচলিও কিনে আনবখন। মন ভাল হবে। দেখো।
শুধু লক্ষ্মী নয়, কয়েকদিনের মধ্যেই বীণার ঘরে লক্ষ্মী, শিবলিঙ্গ, কালী আর শীতলার পট চলে এল। একটা সস্তা জলচৌকির ওপর তাদের বসানো হল। বীণা ব্যস্ত হয়ে পড়ল তাদের নিয়ে। ঠিক যেরকম ছেলেবেলায় পুতুল খেলত সেরকমই অবস্থা এখন তার।
সজল এসে সব দেখে হাসে, কী করছে বলো তো! হঠাৎ এত পুজোআচ্চা কেন?
কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে!
কিছু নিয়ে থাকতে চাও তাহলে তো সবচেয়ে ভাল হত একটা দল করলে। নতুনদের নিয়েই করব।
তুমি এখনও দল করার কথা ভাবছো?
ভাবছি। আমার তো আর কোনও যোগ্যতা নেই। অভিনয়টাও ভাল জানি না, তবু বড় নেশা। একটু ভাবো না বীণা! তোমাকে পাশে পেলে মনে হয়, অনেক কিছু করতে পারি।
আমাকে পাশে পাওয়ার আশা ছাড়ো। আমি আর নতুন করে কিছুই শুরু করতে পারব না। আমার মন ভেঙে গেছে।
ডলার। আর পাউন্ডগুলো নিয়েই কি এত কাণ্ড হল?
হ্যাঁ। ও টাকা কাকার নয়। আমার কাছে একজন গচ্ছিত রেখেছিল। ন্যায্য পাওনা আমারই হয়।
আমাকে যদি একবার বলতে তাহলে ঠিক কলকাতায় নিয়ে গিয়ে ব্ল্যাকে বেচে একটা ক্যাপিটাল করে ফেলতাম। আজ আর টাকার জন্য কিছু আটকাত না।
আজ আর টাকাটার জন্য শোক নেই। তবে দল ছাড়তে হলে বলে কান্না পায়। কেউ আর আমাকে চিনবে না।
চিনবে বীণা। তোমার ভিতরে যা আছে তা কম মেয়ের মধ্যেই পাওয়া যায়। আমি দল করার কথা ভাবছি। তুমি তাতে অভিনয় করতে রাজি তো?
বীণা হাসল, গাছে কাঁঠাল, গোফে তেল।
পারব বীণা, নিশ্চয়ই পারব।
আচ্ছা আমার আজও জানা হয়নি তোমাকে ওরা মারাল কেন?
ও কথা থাক। মেরেছে তো কী হয়েছে! আমি ওদের অন্য ভাবে মারটা ফিরিয়ে দেবো। সেইজন্য তো দল করার কথা ভাবছি।
বরং বাড়ি ফিরে যাও সজল। সংসারে মন দাও।
দুর! আমার আবার সংসার কোথায়?
মা-বাপ তো আছে।
তারা আমার ধার ধারে নাকি? ভাই তো আমাকে দেখতেই পারে না। যাত্ৰা করে বেড়াই বলে প্রেস্টিজও দেয় না।
এখানেই বা কোন মুখে আছো? কি করে চলে তোমার?
সে কি তুমি জানো না? চেহারাটা ভদ্রলোকের মতো, গান গাইতে পারি, গল্প জমাতে পারি, লোকের দায়ে দফায় দৌড়ঝাঁপ করতে পারি, এইসব প্লাস পয়েন্ট থাকায় এর ওর তার বাড়িতে মাথা গোজা বা দু-মুঠোর জোগাড় হয়ে যায়। দুটি মেয়েকে গান আর একটা ছেলেকে তবলা শেখাই। আবৃত্তি শেখানোর ক্লাসও খুলছি। একে কি বেঁচে থাকা বলে বীণা? কিন্তু এ ছাড়া আর উপায় কি বলো তো!
বিয়ের ভূত মাথা থেকে নেমেছে?
বিয়ের ভূত? কী যে বলো! বিয়ে করার কথা কখনও মনেই হয়নি। তোমাকে দেখার পর মনে হল, হ্যাঁ, এরকম, কাউকে পেলে এ জীবনটার একটা সার্থকতা আসবে। এটা ঠিক শরীরের আকর্ষণ নয়। বীণা, এ একটা অন্যরকম ব্যাপার।
শোনো, আমার একটু তীর্থে যাওয়ার শখ হয়েছে। যাবে সঙ্গে?
কোথায় যেতে চাও?
প্রথমে তারকেশ্বরে যাই চলো। সকালে গিয়ে বিকেলে চলে আসব। তারপর একবার তারাপীঠ।
কেন বলো তো! তোমার হলোটা কী?
কী যে হল তা বুঝতে পারছি না। দেখিই না। এসব করে একটু। কোনওদিন তো ভগবানকে ডাকিনি।
ঠিক আছে। কবে যাবে বোলো, সঙ্গে যাবো। তোমার সঙ্গে যাওয়ার তো একটা থ্রিল আছেই।
কথাটা কেন যেন ভাল লাগল না বীণার। কথাটা পবিত্র নয়।
দুদিন পর বীণা তারকেশ্বর গেল বটে, কিন্তু সঙ্গে সজলকে নিল না, নিল কুসুমকে। সারা দিনটা কেটে গোল যাতায়াতে। ভিড়ে, ঠেলা ঠেলিতে। যখন ফিরল। তখন শরীর ক্লান্ত, মনও ক্লান্ত।
হ্যাঁ রে কুসুম, তীর্থ করে এলাম। তবু মনটা ভাল লাগছে না কেন রে?
ওমা! ও কি কথা! আমার তো খুব ভাল লাগছে। বাবা তারকেশ্বর যেন গা থেকে পাপতাপ সব পুছে নিয়েছেন। ঝরঝরে লাগছে।
তোর আবার পাপটা হল কিসে?
আহা, কত পাপ অজান্তেও হয়।
তাহলে তোর জন্যই এইসব তীর্থটীৰ্থ। তোর মতো যদি সরল হতে পারতাম!
তোমার না মনটাই খুব চঞ্চল। সকলের তীর্থে গেলে আনন্দ হয়, তোমার কেন হয় না?
আমি বোধহয় খুব পাপী।
যাঃ। তুমি খুব ভাল।
সে তোর কাছে। ভগবানের কাছে নয়।
একটা কথা বলব বীণাদি?
বল না।
মেয়েদের কাছে কিন্তু স্বামীও ভগবান। কথাটা বললে তুমি রাগ করবে, নিমাইদাদাও কিন্তু বড্ড ভাল মানুষ। ভগবান যদি তোমার ওপর রেগে থাকেন তাহলে ওইজন্যই।
