অকারণে নয়। বাবাকে আমি চিনি। উনি তোমাকে পেয়িং গেস্টও রাখতে চাইছেন। লোকটা খুব বোকা। বাস্তব বুদ্ধি কিছু নেই। উনি ভাবছেন তোমাকে আর আমাকে একটা সম্পর্কে বেঁধে ফেলা যাবে।
চয়ন মৃদু মৃদু হাসতে লাগল।
অনিন্দিতা বলল, হেসো না। বাবার বোকামি দেখলে গা জ্বলে যায়।
আরও তিন মাস বাদে অনিন্দিতারা চলে গেল। বাড়ি যাহোক করে শেষ হয়েছে। বাকিটা বাড়িতে গিয়ে শেষ করবে। যাওয়ার সময় অনিন্দিতা খুব কেঁদেছিল। বলল, তোমার মতো একটা মানুষ কি আর পাবো? ভাল থেকো।
টাকাটা ওরা শোধ দিয়ে গেল। কিন্তু তাতে একটুও খুশি হল না চয়ন। মনে হল, না দিলেই বোধহয় ভাল ছিল। কত কষ্ট হল ওদের! হয়তো গয়না-টয়না বিক্রি করেছে।
১০২. কাকা তাকে ডাকল না
কাকা তাকে ডাকল না, খোঁজও করল না। প্রথম দিন কয়েক আশায় আশায় ছিল বীণাপাণি। কাকা তাকে বড় আর্টিস্ট করার স্বপ্ন দেখত। হয়তো দোষঘাট ভুলে গিয়ে ক্ষমা করে দেবে, ডেকেও পাঠাবে। কিন্তু একদম সাড়াশব্দ নেই।
দিন সাতেক বাদে বীণাপাণি বুঝতে পারল, কাকা তাকে আর ডাকবে না। হয়তো প্রতিশোধ নেবে না, কিন্তু তা বলে সব ভুলেও যাবে না। নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে বীণা গিয়ে দাঁড়াতেও পারবে না। কাকার সামনে।
কিন্তু দিন কি করে চলবে সেইটেই সমস্যা। পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল কাকা। তখন সুনজরে দেখত, বোনাস না কি যেন বাবদে টাকাটা দিয়েছিল তাকে। ব্যাঙ্কে একটা ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছিল সে। টাকাটা তুলতে হল।
সজল এসে প্রায়ই বলে, চলো, বিয়েটা সেরে ফেলি।
আজকাল বিরক্ত হয়। বীণাপাণি। বলে, বিয়ে-বিয়ে করছে কেন বলো তো! ওটা একটা ব্যাপার নাকি? আমার জীবনে কত বড় সর্বনাশটা হয়ে গেল বলো তো! কোনও দল যদি না ডাকে তবে না খেয়ে মরতে হবে। ভাগ্যিস কিছু টাকা বোনাস দিয়েছিল কাকা, তাই চলছে।
সেই পাঁচ হাজার টাকা?
হ্যাঁ।
সজল একটু হেসে ম্লান মুখে বলল, বোনাস কে বলল?
কাকাই তো বলেছিল এরকম একটা কথা।
সজল মাথা নেড়ে বলল, বোনাস নয়। কাকাও দেয়নি নিজের ট্যাক থেকে।
তাহলে?
ওটা দিয়েছিলেন তোমার স্বামী নিমাইবাবু।
স্তম্ভিত হয়ে গেল বীণাপাণি, তার মানে!
কাকাই একদিন বলেছিল, নিমাই বীণার ঋণ শোধ করতে টাকা পাঠিয়েছে। মিথ্যে কথা বলে টাকাটা তাকে গছাতে হয়েছে।
নিমাই দিয়েছে!
হ্যাঁ। আমি জানি বীণা।
বীণা বিছানায় অবশ্য শরীরে বসে পড়ে বলল, ঋণ শোধ দিয়েছে?
সেরকমই শুনলাম। নিমাইবাবু মানুষটি বড্ড ভাল। আমি যখন গিয়েছিলাম তখনও মনে হয়েছিল, খুব সৎ ধর্মভীরু মানুষ। আমি মাংস-পরোটা খেয়েছিলাম, উনি দাম দিতে দেননি।
সেইজন্যই ভাল?
না বীণা, সেইজন্য নয়। কেমন যেন মনে হয়েছিল, উনি এই আমাদের মতো নন। অন্যরকম।
ওকে তোমরা কিছুই জান না। ভীষণ পাজি, নিমকহারাম, শয়তান।
সজল মাথা নেড়ে বলে, তা ঠিক। বাইরে থেকে আর কতটা বোঝা যাবে! তবে দোকানটা কিন্তু খুব চলে। আমি গত সপ্তাহে কাঁচরাপাড়া গিয়েছিলাম। দোকানটা দেখলাম আরও বড় হয়েছে। প্ৰচণ্ড বিক্রি।
বীণা রাগের গলায় বলল, তাই এত টাকার গরম! আমার ঋণ শোধ দিয়েছে!
ভাগ্যিস দিয়েছিল! নইলে তোমার এখন চলত কিসে? তোমারও চাকরি নেই, আর আমাকে তো তাড়িয়েই দিয়েছে অপমান করে।
বীণা চুপ করে রইল। বুকে আগুন জ্বলছে।
বীণা, মিছিমিছি। রাগ করে কী করবে? জীবনে এরকম খারাপ সময় সকলেরই মাঝে মাঝে আসে। আমি তোমাকে বিয়ে থাকে বলি জানো? দুজনে মিললে আমাদের একটা জাের হবে। একটা কিছু করতে পারব।
কী করবে?
ধরো, যদি যাত্রার দল করি!
যাত্রার দল করা কি চাট্টিখানি কথা!
খুব শক্তও নয়। এ অঞ্চলে তোমার বেশ নামডাক আছে। তোমাকে দাড় করালে ধীরে ধীরে একটা দল করা যায়।
তোমার অভিজ্ঞতা নেই বলে স্বপ্ন দেখছো। কাকার বিশ্ববিজয় অপেরা নিতান্তই ছোট দল, তবু তারও কত লোকজন, কত জিনিসপত্র লাগে দেখেছে? কাকা পয়সাওলা মানুষ বলে পেরেছে। আমরা পারব না।
চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি!
বীণা সবেগে মাথা নেড়ে বলে, ওসব আমাকে বোলো না। নতুন দল গড়ে তারপর কেঁচে গঙুষ করা আমার পোষাবে না। ওসব তোমার জন্য। আমি অনেক ঠেকে শিখেছি।
কেন যে এত হতাশ হয়ে পড়ছো!
আমার সমস্যা তুমি বুঝবে না। তাই বিয়ের জন্য আমন হামলে পড়ছে।
আমরা তো একসঙ্গে থাকতেও পারি!
না সজল, তাও পারি না। আমাকে যত সস্তা বলে তুমি ভাবো ততটা সস্তা আমি নই। যদি শরীর চাও তাহলে বাজারে মেয়েমানুষের অভাব নেই। তাদের কাছে গেলেই পারো।
সজল লজ্জায় লাল হয়ে বলল, ছিছি। বীণা, আমি মোটেই ওভাবে বলিনি। আমি বলছিলাম নিমাইবাবুর সঙ্গে যখন তোমার ডিভোর্স হয়নি তখন বিয়েটা হয়তো অসামাজিক হবে। তাই বলছিলাম, আজকাল তো লিভিং টুগেদার হয়।
হতে পারে। কিন্তু ওসব প্রস্তাব আমার এখন ভাল লাগে না সজল। এখন তুমি যাও।
কথার মাত্রা রাখতে পারিনি। মাপ করে দিও।
সজল গেল। কিন্তু ছাড়ল না। মাঝে মাঝেই আসতে লাগল। সজলকে কিছু খারাপ লাগে না বীণার। কিন্তু এই অনভিজ্ঞ, কপর্দকহীন সুন্দর ছেলেটার হাতে নিজেকে সমৰ্পণ করার কথাও কেন যেন আজকাল আর সে ভাবতেই পারে না। বসে বসে গল্প করতে তার অবশ্য খারাপ লাগে না।
গল্প করে করে তিন মাস কেটে গেল। তাদের সম্পর্ক একটুও এগোলো না। বীণা ঘোরাঘুরি করে এল চিৎপুরের যাত্রাপাড়ায়। কোনও দলেই জায়গা নেই। অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। হাতের টাকা ফুরিয়ে এল প্রায়। দুশ্চিন্তায় রাতে ভাল ঘুম হয় না।
