হেমাঙ্গ হঠাৎ চারুশীলাকে বলল, বারোটা সুটকেস এনেছিস, তোদের তিন জনের পাওনা তো মোটে ছটা সুটকেস! তাও আমেরিকা থেকে এলে। বাকি ছটা কি মাশুল দিয়ে আনলি? কত গেল?
চারুশীলা চোখ পাকিয়ে বলে, সব জায়গায় তোর এত হিসেব কেন রে? মাশুল দিয়েছি বেশ করেছি।
আমেরিকার বাজার তো ফাঁকা করে দিয়ে এসেছিস দেখছি।
কিনবো না তো কি? কী সস্তায় কী সুন্দর সুন্দর জিনিস! যা দেখি তাই কিনতে ইচ্ছে করে।
ওইটেই তো তোর রোগ! কনজিউমারিজমের চূড়ান্ত।
আর তুই তুই কিছু কম যাস নাকি! বাড়িটাকে তো জিনিসের মিউজিয়ম বানিয়ে রেখেছিস।
হেমাঙ্গ ব্যথিত গলায় বলে, অতীতের কথা। আজকাল আর কেনাকাটা করিই না। তোকে দেখেই বৈরাগ্য এসেছে।
বেশি বকিস না। জাহাজে আমার আরও জিনিস আসছে।
গোটা জাহাজ বোঝাই করে নাকি?
হলেই বা। তোর মতো সন্নিসি তো নেই। আমার বাপু টাকা ওড়াতে ভাল লাগে।
চয়নের দিকে চেয়ে চারুশীলা হঠাৎ বলল, এই চয়ন, আমন চুপচাপ কোণে দাঁড়িয়ে কেন? ইস, কতকাল পরে চেনা মুগুলো আবু দেখছি! আমার হাঁফ ধরে গিয়েছিল। এসো তো চয়ন, আমার সামনে এসে বোসো। তোমার জন্য অনেক জিনিস এনেছি।
চয়ন মৃদু হেসে বলে, অত জিনিস দিয়ে কি করব? আমি তো একটা মানুষ। আপনি কত শার্ট প্যান্ট দিয়েছেন।
তাতে কি? আরও দেবো। ওই হেমাঙ্গর মতো বৈরাগী হয়ে থেকে না। ভাল পোশাক পরবে, ভাল খাবে।–দাবে। তোমার চেহারা একটু ফিরেছে।
বিদেশের গল্প উঠল। কফি আর বিদেশী বিস্কুট সার্ভ করা হল। সব কিছুর মধ্যে চয়ন শুধু দেখেছিল দুটি নিঃসঙ্গ মানুষের দু জোড়া চোখ মাঝে মাঝে জোড়া লাগছে। সরে যাচ্ছে। বার বার।
চারুশীলার ফিরে আসায় কলকাতাটা অনেক ঝলমলে হয়ে গেল চয়নের কাছে। বাতাসে যেন একটা আনন্দের বার্তা বয়ে যাচ্ছে। বড় খুশি হল। আরও খুশি হল, দু জোড়া চোখ দু জোডা চোখকে খুঁজে বেড়াচ্ছে বলে। …
তিন মাসের মাথায় হঠাৎ এক সন্ধেবোলা অনিন্দিতা উঠে এল ছাদে।
শোনো, তোমার সঙ্গে সিরিয়াস কথা আছে।
চয়নের আজ শরীর ভাল নেই। বর্ষার শুরুতেই তার ঠাণ্ড লেগে সামান্য জ্বর হয়েছে। টিউশনিতে যায়নি; ঘরে বসে বই পড়ছিল। উঠে বসে বলল, বলো।
অনিন্দিতা দরজায় দাঁড়িয়ে তার দিকে গভীর চোখে চেয়ে বলল, তুমি কি বাবাকে টাকা দিয়েছো?
চয়ন মাথা নত করে বিরল, কে বলেছে?
বাবাই বলেছে। তবে সহজে নয়। আমরা বাবার লক্ষণ জানি। জেরা করে করে কথা বের করেছি।
চয়ন মৃদু স্বরে বলল, উনি ধার নিয়েছেন।
কত টাকা?
আপাতত দশ হাজার।
আপাতত মানে! আরও দেবে নাকি?
উনি বলেছেন, আরও কিছু লাগতে পারে।
অনিন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ছি।
রাগ করছো কেন?
রাগ করব না! তুমি কত কষ্ট করে চালাও তা তো আমি জানি। বাবা কী আক্কেলে তোমার কাছ থেকে টাকা নিল তা বুঝতে পারছি না। লোকটা সারা জীবন এইসব করে বেড়াচ্ছে।
চয়ন মৃদু হেসে বলল, ছিল, তাই দিলাম।
ছিল মানে! কষ্ট করে টাকা জমিয়েছো, ব্যাংকে থাকলে সুদ হত। তোমার টাকার গল্পটা আমিই বাবা আর মায়ের কাছে করেছিলাম। সেইটেই ভুল হয়েছে দেখছি। টাকার গন্ধ পেয়েই তোমাকে এসে ধরেছে। আমাদের কিছু বলেনি। কিন্তু বাবার টাকার সব হিসেব আমরা জানি। বাড়তি দশ হাজারের হিসেব আমি ধরেছি। তারপর চেপে ধরায় বাবা স্বীকার করেছে যে, টাকাটা তুমি দিয়েছো। আচ্ছা চয়ন, বাবাকে টাকাটা দেওয়ার আগে তোমার কি উচিত ছিল না। আমাকে একবার জিজ্ঞেস করে নেওয়া! তুমি তো জানো না, বাবা কিরকম লোক।
চয়ন একটু হাসল।
অনিন্দিতা বলল, কাজটা খুব খারাপ করেছো। আমরা না জানতে পারলে টাকাটা তুমি আর ফেরত পেতে না। বাবা খারাপ লোক নয়। কিন্তু গরিব তো! গরিবের চরিত্র বলে কিছু থাকে না। তোমার টাকাটা বাবার শোধ দেওয়ার ক্ষমতাই নেই।
সেটা আমি জানতাম।
জেনেও দিলে? তুমি অদ্ভুত মানুষ। দশ হাজার টাকা এক কথায় যে দিয়ে দেয় সে কিন্তু বোকাও ।
কেন যে টাকাটা নিয়ে এত কথা বলছো! আমার লজ্জা করছে।
তোমার চেয়েও আমার লজ্জা ঢের বেশি। শোনো, বাবাকে আর একটি পয়সাও দেবে না। বাবাকে আমিও খুব বকে দিয়েছি।
তুমি আজ খুব উত্তেজিত।
আমার বড্ড সম্মানে লেগেছে। বাবা যদি টাকাটা শোধ দিতে না পারে তাহলে তোমার কী ধারণা হত বলো তো আমাদের সম্পর্কে?
খারাপ ভাবতাম না। লোকে তো অভাবে পড়েই নেয়!
তুমি জানো না। বাবার অভাব যতটা নয় তার চেয়ে বেশি হল উদ্বেগ। আমরা গরিব ঠিকই, কিন্তু একখানা ছোটো বাড়ি করার মতো টাকা বাবার ছিল। বসে থেকে থেকে সময় গেল, জিনিসের দাম বাড়ল, এই কৃপণতার কোনও মানে হয়!
চয়ন ফের মৃদু একটু হাসল।
তোমাকে আজই বাবা এক হাজার টাকা দিয়ে যাবে। বাকিটা শোধ দিতে একটু দেরি হতে পারে। কিন্তু দু মাসের মধ্যে নিশ্চয়ই।
আরে, অত তাড়াহুড়োর কি আছে!
তোমার নেই, আমার আছে। বুঝলে!
বুঝেছি। বাড়ি কাদুর?
ছাদ ঢালাই হয়ে গেছে। জানালা দরজা হয়নি, হবেও না। তবে বাঁশের ঝাঁপ দিয়ে কাজ চালানো যায়। দেখা যাক।
তুমি যে কেন এত উতলা হচ্ছে? বাড়িটা ওঁকে শেষ করতে দাও, তারপর টাকা শোধ দিলেও চলবে।
না, তা হয় না। তোমার কষ্টের টাকা, ও টাকা নেওয়া পাপ।
তা নয়। অনিন্দিতা, আর কেউ ওঁকে টাকাটা দেবে না। সন্দেহ করবে, অবিশ্বাস করবে, কিংবা দিলেও চড়া সুদ নেবে।
সে তো ঠিকই। কিন্তু এভাবেই আমাদের চলতে হবে। ভেবো না।
তুমি অকারণে রাগ করছে।
