ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর চয়ন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। মানুষকে প্রত্যাখ্যান করার শক্তিটাও যে তার কেন নেই!–তার জানা আছে, এই ছাপোষা অবসরপ্রাপ্ত লোকটি কোনও দিনই তার টাকা শোধ দিতে পারবে না। তবু একে না। দিয়েই কি সে পারবে? বাধা হবে চক্ষুলজ্জা, বাধা হবে নিজের কাছে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয়।
সকালের টিউশনি সেরে ফেলার পথে সে ব্যাংকে গেল এবং ভয়ে ভডে কাউন্টারে বলল, আমি যদি দশ হাজার টাকা তুলতে চাই তাহলে কী করতে হবে?
সুবেশ এবং সুভদ্র ক্লার্কটি বলল, অত টাকা তুলতে একটা প্ৰােয়র ইন্টিমেশন দিতে হয়। আপনি ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করুন।
ম্যানেজারও একজন সুবেশ লোক, তবে কিছুটা গভীর। শুনে-টুনে একটা চেক-বই ইসু্য করে বললেন, কাল এসে টাকা নিয়ে যাবেন।
রাত্রিবেলা ভদ্রলোক আর একবার এলেন, গিয়েছিলে নাকি ব্যাংকে?
হ্যাঁ।
তুলেছো?
না। তবে কাল দেবে।
ভদ্রলোক স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, বাঁচালে বাবা। টাকাটা পেলেই কাজ শুরু করে দেবো। রাজমিন্ত্রির সঙ্গে কথা হয়ে আছে।
এটা বলেই ভদ্রলোক চলে গেলেন।
পরদিন টাকাটা দুপুরে তুলে আনল চয়ন। ভদ্রলোক রাত্রিবেলা এসে নিয়ে গেলেন। তারপর চয়নের একটু ফাঁকাফাঁকা লাগল। এর আগে সে আর কাউকে কখনও ধার দিয়েছে বলে মনে পড়ে না। এই প্ৰথম। এবং এতগুলো টাকা! তার ভুকু দুঃখও হচ্ছিল টাকাগুলোর জন্য। অনিন্দিতার বাবার যা অবস্থা তাতে ইচ্ছে থাকলেও টাকাটা শোধ করার উপায় ওঁর নেই।
টাকার কথাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চয়নের একটু সময় লাগল। পরদিন বিকেল পর্যন্ত অন্যমনস্কতাটা রয়ে গেল তার মোহিনী বলল, চয়নদা, আপনার কী হয়েছে? এত আনমাইভাল লাগছে কেন?
আপনার সবই শুধু এমনিই।
কত কী ঘটে যায়! বলে চয়ন লাজুক হাসল।
মোহিনী বলল, মা বলে, চয়নটা যা অন্যমনস্ক রাস্তায় ঘাটে অ্যাকসিডেন্ট না করে বসে!
না, ওসব ভয় নেই। অন্যমনস্ক থাকি বটে, কিন্তু একটা ইনস্টিংক্ট কাজ করে।
আচ্ছা, আপনি কি একটা খবর শুনেছেন?
কী খবর?
চারুমাসি ফিরে আসছে।
অবাক হয়ে চয়ন বলে, তাই নাকি!
হেমাঙ্গদা এসেছিল কাল। বলে গেল চারুমাসি নাকি ফোন করে কানাডা থেকে জানিয়েছে মাসের শেষেই ফিরে আসবে।
কেন?
একদম নাকি ভাল লাগছে না।
চয়ন, কেন কে জানে, খবরটায় খুশি হল। টিউশনি ফিরে পাবে বলে নয়, চারুশীলা পরম উদারতাবশে তাকে নানা। উপটৌকন দেবে বলেও নয়—যেন এক প্রবাসের আত্মীয় বা প্ৰিয়জন ফিরছে। এরকম তো তার আর কারও বেলায় হয় না!
টাকার কথাটা চয়ন ভুলে যেতে পারল এবার। আর কোনও কাটা খচখচ করল না তার মনের মধ্যে।
দিন দশেক বাদে একদিন ভদ্রলোক এসে সন্ধেবেলা বললেন, বাবা চয়ন, যা উপকার করেছে তা আর বলার নয়। বুধ করে এগিয়ে যাচ্ছে। ভাগ্যিস একতলার গাঁথনিটা অনেক আগেই একটু করে রেখেছিলুম; বাড়িটা তাই টকাটক
যাচ্ছে।
সেটা তো খুব ভাল কথা।
টুকুধু একটু টান পড়তে পারে শেষের দিকে। যদি পড়েই, তুমি একটু দেখো বাবা।
আন পড়বে?
পাঁচ-দশ হাজার পড়তে পারে। ঠেকাটা পার করে দিও।
চয়ন লোকটার দিকে চেয়ে রইল। খুবই বিস্মিত সে। কিন্তু বিরক্ত নয়। এ লোকটার। আর কোনও সোর্স নেই।
একটা কথা ভেবেছি।
কি কথা?
বাড়ির অর্ধেকটা তোমার নামে লিখে দেবো।
সে কী! আমাকে দেবেন। কেন?
আমার তো ছেলে নেই, একটা মাত্র মেয়ে। লিখে দিলে তোমার কাছে আমার ঋণেরও খানিকটা শোধ হয়।
চয়ন প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে, না না, তার দরকার নেই।
ভদ্রলোক মৃদু হেসে বলন, দুখানা তো মাত্র ঘর। তা হোক, একটা তুমি নাও।
আমি নিয়ে কী করব?
কেন, থাকবে! এ ঘরে তোমার কত কষ্ট হয়।
না, আমার কষ্ট হয় না। বেশ তো আছি।
তোমার মাসিমারও খুব ইচ্ছে তোমাকেও নিয়ে যায়।
কেন! আমি গিয়ে কী করব?
ওই যে বলেছিলুম তোমাকে, সবাই মিলে একটা টিম করে থাকব। তোমাকে আমাদের খুবই পছন্দ।
চয়ন মৃদু হেসে বলল, জানি। কিন্তু সেটা ভাল দেখাবে না। আমারও সুবিধে হবে না। অত দূরে গেলে টিউশনির অসুবিধে হবে।
আহা দূর কিসের! আমাদের অফিসের একটা লোক এৱোজ কাটোয়া থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করত, জানো?
তা হয়তো করে। কিন্তু আমি ততটা শক্ত মানুষ নই।
ভেবে দেখো বাবা। একটু ভাবো।
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, ভাববার কিছু নেই। এটা হয় না।
তাহলে ওই কথাই রইল। যদি শেষ দিকে ঠেকে যাই, পাঁচ-দশ হাজারের জন্য যেন কাজটা আটকে না থাকে, একটু দেখো বাবা। পাই পয়সা অবধি শোধ দেবো। সুন্দ সমেত।
আমি সুদ চাই না।
ন্যায্য পাওনা ছাড়বে কেন!
লোকটা চলে গেলে চয়ন দুঃখিত হৃদয়ে বসে রইল। সে কি একটুও কঠোব হতে পারে না!
মাস শেষ হয়ে নতুন মাসের শুরুতেই ফিরে এল চারুশীলা। মোট বারোটা সুটকেস এবং হ্যান্ডব্যাগ ভর্তি জিনিস। এয়ারপোর্টে নেমেই কোনওক্রমে কাস্টমস ডিঙিয়ে বাইরে পা দিয়েই বলে উঠল, উঃ, বাঁচলাম বাবা!
চারুশীলাকে রিসিভ করতে একটা বাহিনীই হাজির ছিল এয়ারপোর্টে। তার মধ্যে চয়নও। সে চারুশীলার মুখে যে স্বস্তির প্রকাশ দেখল তাতে হাসিই পাচ্ছিল তার। আনন্দের হাসি। এই অস্থিরচিত্ত মহিলা চয়নের একটা নিৰ্ভলরার স্থল। এই ফিরে আসা যেন চয়নের রুক্ষ শুষ্ক জীবনে মেঘের সঞ্চার। দুর্বল হাতে সেও গোটা দুই সুটকেস বইল। তিনখানা গাড়ি এবং চারটে ট্যাক্সিতে বোঝাই হল মাল ও মানুষ।
বাড়িতে বসে গেল একটা সভা। সুব্রত আসেনি। ছেলেমেয়ে নিয়ে শুধু চারুশীলা। তিনজনের মুখেই আনন্দ আর স্বস্তির হাসি। এই ভিড়ের মধ্যে চয়ন এক ধারে দেয়াল ঘেষে দাঁড়িয়েছিল। তার শুধু চেয়ে থাকা। চেয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ তার চোখে একটা দৃশ্য ধরা পড়ল। এই ভিড়ে ভিড়াক্কার জমায়েত ও উচ্চকণ্ঠ কথাবার্তার মধ্যে দু জোড়া চোখ মাঝে মাঝে পরস্পরের দিকে নিবদ্ধ ও নিষ্পলক হয়ে থাকছে। তারপর দুজনেই যেন লজ্জা পেয়ে সরিয়ে নিচ্ছে চোখ। বার বার।
