অনিন্দিতার বাবার মুখে দুশ্চিন্তার রেখাগুলি সকালের স্পষ্ট আলোয় পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল চয়ন, দেশের লক্ষ মানুষের মুখেও কি একই দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে নেই! একই গল্প, একই টেনশন, একই অনিশ্চয়তা, এঁরা মানুষের কাছে একটু আশা-ভরসার কথা শুনতে চান। চয়ন কীই বা শোনাতে পারে!
ইট, সিমেন্ট, কাঠ যাতেই হাত দিতে যাই, হাতে যেন ছ্যাক লাগে। গত মাসখানেক ধরে কেবল দর জানতে বাজার ঘুরছি। যদি ছাদ ঢালাই না করে ওপরে টিন লাগাই তাহলে অনেকটা সস্তা হয়। কিন্তু এঁরা তো টিনের ঢাল শুনলেই ক্ষেপে যাচ্ছেন। এই যে তুমি টিনের চালের ঘরে আছে, তেমন কিছু খারাপ আছো কি? ওরা বুঝতেই চায় না।
চয়ন মৃদু স্বরে বলল, শুরু করলে ধীরে ধীরে হয়তো হয়ে যাবে।
দুর! সে চাকরি থাকলে হয়তো হত। তখন তো একটা আয় ছিল হে। এখন তো ঘরের টাকা ভেঙে খাচ্ছি। ফিক্সড ডিপোজিট রেখে খানিক সুদ হয় বটে, কিন্তু তাতে কি চলে?
আপনার পেনশন নেই?–
তাও আছে। তবে ওই যে বললুম, খরচ তো বাড়ে, কমে না।
ও। বলে চয়ন চিন্তিত হওয়ার একটা ভাব করল। কিন্তু অনিন্দিতার বাবার সমস্যা তাকে খুব একটা পীড়িত করছে না। করার কারণও নেই। বরং তার শুনতে একঘেয়ে এবং বিরক্তিকর লাগে। মানুষটিকে তার খুব পছন্দও হয় না। ইনি এখনও মনে করেন, অনিন্দিতার সঙ্গে চয়নের বিয়ে হওয়াটা উভয় পক্ষের আর্থিক সমস্যার সমাধান ও লোকবলের অভাব মেটানোর জন্য দরকার। এবং এ ব্যাপারে চয়নের মতামতের যে কোনও দাম আছে তাও ইনি মনে করেন না।
অনিন্দিতার বাবা মিটমিটি চোখে তার দিক চেয়ে হঠাৎ বলল, তোমার তো বাবা ঝাড়া হাত-পা।
চয়ন একটু অবাক হয়ে বলল, অ্যা!
বলছিলাম, তোমার তো দায়-দায়িত্ব কিছু নেই। নো লায়াবিলিটি।
চয়ন বলল, তা বটে।
টিউশনিতে আজকাল আয়ও তো ভালই।
চয়ন সংকুচিত হয়ে বলে, কোনওরকমে চলে যায়।
দেবে নাকি আমাকে কিছু ধার? আমি সুন্দ দেবো।
চয়ন একটু হাঁ করে থাকে। একজন লোক তার কাছে ধার চাইছে, এই ঘটনাটাই তার অবিশ্বাস্য মনে হয়। সে আবার কথা খুঁজে না পেয়ে বলে, অ্যাঁ!
বেশি নয়, হাজার দশেক পেলেই সামলে নিতে পারব।
চয়ন অবিশ্বাসের চোখে লোকটার দিকে চেয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে তার পূর্বাপর ঘটনাগুলো মনে পড়তে থাকে। কদিন আগে হেমাঙ্গ তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ব্যাংকে তার কত টাকা আছে এবং তা দিয়ে কোনও একটা ব্যবসা বা টিউটোরিয়াল খোলা যায়। কিনা, বাস্তবিকই তখনও সে জানত না, ব্যাংকে তার কত টাকা আছে।
না জানার কারণ হল, সে জানতে চাইত না। ভাবত অনেক টাকা জমলে সে একদিন নিজেকে নিজেই একটা সুরঙ্গুইনদের। তার চেক-বই নেই, টাকাও তোলার দরকার হয় না। পাশ-বই এন্ট্রি করায় না। মাসে মাসে শুধু টাকা জমা দিয়ে যায়।
হেমাঙ্গ খোঁজ নিতে বলায় কয়েকদিন আগে সে ব্যাংকে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, তার সুদে আসলে একান্ন হাজার টাকার ওপর জমা আছে। টাকাটা তার অনেক বলে মনে হল। এতটা আশাই করেনি।
সেদিনই সন্ধেবেলা সে ঘটনাটা অনিন্দিতাকে বলে।
অনিন্দিতাও অবাক হয়ে বলেছিল, একান্ন হাজার! তাহলে তো তুমি বড়লোক।
আমি ভাবছি কিছু একটা এই একান্ন হাজার দিয়ে শুরু করব।
করো। খুব ভাল হবে। কী করবে বলো তো!
এখনও ভাবিনি। তুমিও ভেবে দেখো তো কী করা যায়। আমার খুব ইচ্ছে করে একটা মনোহারি দোকান দেই। হরেক জিনিস থাকবে, নানারকম খদের আসবে, বিনিময় হবে। বেশ একটা জমজমাট ব্যাপার। বেঁচে থাকাটাকে টের পাওয়া যাবে।
করো, দোকানই করো।
কথা এইটুকু থেকে এতখানি গড়াল। অনিন্দিতা নিশ্চিত তার টাকার কথা। এঁর কাছে গল্প করেছে। করতেই পারে। সেটা শুনেই লোকটা ধার চেয়ে বসেছে বোধহয়।
অনিন্দিতার বাবা একটু ব্যগ্র গলাতেই বললেন, ভেবো না যে, শোধ দিতে পারব না। বাড়িটা করলে বাসা-ভাড়াটা তো বেঁচেই যাবে। সেটা তো তোমাকে মাসে মাসে দিয়ে যাবো। ওখানকার একটা ওষুধের দোকানে একটা চাকরিও পাকা হয়ে আছে আমার। মাসে আট শো টাকা। সেটা হলে তো কথাই নেই।
লোকটার ওপর রাগ হল না চয়নের। মায়া হল, এ যে তার চেয়ে অপদার্থ লোক! চয়ন কিছুক্ষণ ভেবে বলল, আমার এত টাকা আছে বলে আপনার মনে হল না?
লোকটা অবাক হয়ে বলে, নেই? কিন্তু অনিন্দিতা যে বলছিল, তোমার নাকি অনেক টাকা আছে ব্যাংকে!
চয়ন একটু হাসল। বলল, অনেক কষ্টে জমিয়েছি। একটা দোকান দেওয়ার ইচ্ছে ছিল।
লোকটা চয়নের ডান হাতটা চেপে ধরে বলল, দোকান তোমার হবে। দশটি হাজার টাকা আমার বড় দরকার। বিশ হাজারই চাইতুম, কম করেই বলছি।
চয়ন নিজের দুর্বল হাতটা চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারল না। বলল, আচ্ছা, আমি চেষ্টা করে দেখব।
চেষ্টা নয়। বাবা, টাকাটা না দিলেই নয়। বড্ড বেঘোরে পড়ে গেছি। আমার বউ আর মেয়ে আমাকে বাড়ি-বাড়ি করে তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না। মাঝে মাঝে আত্মহত্যা করতেও ইচ্ছে হয়। মেয়ের বিয়েটা আর হবে না। তা না হোক, বড়িটাই করে ফেলি। হিসেব করে দেখছি। এই দশ হাজার টান। পরে আমার।
আপনি অতি উতলা হচ্ছেন কেন? আমি ভেবে দেখছি।
কবে আসব বাবা?
চয়ন হাসল, আসবেন।
আমি বরং রোজই একবার তোমাকে মনে করিয়ে দিয়ে যাবো। কিন্তু একটা কথা। টাকার ব্যাপারটা যেন অনিন্দিতা বা তার মা না জানতে পারে তাহলে আস্ত রাখবে না। আমাকে।
চয়ন ম্লান হেসে বলল, ধার করা তো অপরাধ নয়।
তবু বলার দরকার নেই। আমি নির্লজ্জ বলে তোমার কাছে ধারটা চাইতে পারলুম। ওরা তো আমার সমস্যাটা জানে না।
