তুমি অনেক উইকি হয়ে গেছ। চোখের কোল বসে গেছে। চলো তোমাকে কিছু খাইয়ে আনি।
আরে না ভাই, খেতে ইচ্ছে করে না। আমার। টেনশনের মধ্যে কি খাওয়া যায়!
তোমাকে গুচ্ছের খেতে বলছি না। ট্রাই ফাস্ট ফুড। কিংবা ফুট জুসি। এগুলো খেতে কোনও বোরডম নেই। খেয়ে যাচ্ছি। তো খেয়েই যাচ্ছি—আমারও ওরকম ভাল লাগে না। চলো, স্ট্রং না থাকলে তোমার বাবার কোন উপকার করতে পারবে তুমি?
অনীশ রাজী হয়ে গেল। ফলের রস খেতে তার আপত্তি নেই। আর শরীরটা তার বেশ দুর্বল লাগছে আজকাল।
নার্সিং হোমের কাছাকাছি একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুজনে দুগ্ৰাস মুসুম্বির রস নিয়ে বসে গেল। অনীশ তার সব সহপাঠী বন্ধু এবং বাবার সঙ্গে ইংরেজিতেই কথা বলে। ব্যতিক্রম শুধু আপা। এ মেয়েটা ঝরঝরে বাংলা বলে এবং বাংলা ছাড়া ইংরেজিতে কখনও কথা বলে না। অনীশের সঙ্গে। আপা বলে, তোমাদের প্যাট্রিওটিজম নেই জানি। এখন যা আছে সেটা হল প্রভিনসিয়াল প্যাট্রিওটিজম। তামিলরা তামিলনাড়ু, কন্নড়রা কর্ণাটক, পঞ্জাবীরা পঞ্জাব নিয়ে পড়ে আছে। কিন্তু তোমরা বাঙালী আপার মিডলক্লাস— তোমাদের সেটাও নেই। আর কিছু না পারো মাতৃভাষায় কথাটা বোলো বাপু।
মুগা বাংলা জানে বললে ভুল হবে, সে বাংলার গোটা ইতিহাস জানে। বাংলা সাহিত্য জানে। বাংলা লোকসাহিত্য অবধি জানে।
এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে অনীশ আরও এক গ্লাস নিল। তারপর আপাকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর–এ লাইন তুমি শুনেছো?
আপা অবাক হয়ে বলে, কেন বলো তো!
অনীশ একটু লজ্জা পেয়ে বলে, আমার সতেরো বছর কমপ্লিট হওয়ার পর থেকেই আমার বাবা মাঝে মাঝে এ লাইনটা বলে। আমি তো বুঝতেই পারি না, আঠারো বছর বয়সটাই কেন ভয়ংকর? বাবার ধারণা আঠারো বছর বয়স হলেই ছেলেরা রান আফটার গার্লস অ্যান্ড ড়ু আনড়ুয়েবল থিংস। কিন্তু দেখ আপা, আমাদের আঠারো বছর বয়সটা কি সত্যিই ওরকম? পড়াশুনো, কেরিয়ার বিল্ডিং, হাজারো টেনশনের মধ্যে আমরা কি বয়সটা টের পাই? ইজ ইট এ রিয়েলি ডেনজারাস এজ? লাইনটা কার জানো?
তোমাকে নিয়ে আর পারাই যায় না। এটা কবি সুকান্তর লাইন।
সুকান্ত! মিন, সুকান্ত ভট্টাচার্ড?
হ্যাঁ বুদ্ধ। পড়েনি?
না। জাস্ট নামটা শোনা। পড়বার সময়টা কোথায় বলো তো? আমাদের সময় বলে কিছু আছে?
আমি তাহলে কি করে সময় পাই?
তুমি! তোমার কথা আলাদা, তুমি একসেপশনাল।
মোটেই নয় বাবা। তবে আমি তোমার মতো কেরিয়ার-কনশাস। নই। আমি যা পড়ি তা ভালবেসে পড়ি।
ওই আঠারো বছর নিয়ে কবিতা একদিন আমাকে শোনাবো?
মুখস্থ নেই। তবে বই দিতে পারি।
ঠিক আছে। আমার বাবা কেন লাইনটা কোট করে তা আমার জানা দরকার! আপা, তোমার কি মনে হয় বাবা সারভাইভ করবে?
কেন করবে না? ওঁর বয়স কত?
পঞ্চাশের ঘরে। আরলি ফিফটিজ। কিন্তু বয়সটা বড় কথা নয়।
নৈরাশ্যের মধ্যেও আশার কথা ভাবতে পারাটাই সবচেয়ে বড় ফিলজফি—তা জানো?
ভাবতে হলে বুকের জোর চাই। আমি যে একদম জোর পাচ্ছি না। আপা। বাবার কিছু হলে আমি বঁচিব না।
আপার চোখ হঠাৎ ছলছল করে উঠল। টেবিলের ওপর রাখা অনীশের হাতটা ধরে থেকে সে বলল, তুমি এই কারণেই ভীষণ ভাল।
কি কারণে?
পিতা স্বৰ্গঃ, পিতা ধৰ্মঃ, পিতাহি পরামং তপঃ, তুমি কথাটা মানো?
শুনেছি, অতটা নয়, তবে আমি বাবা ছাড়া অন্ধকার দেখি। মা বলে, বাবাই নাকি আদর আর আশকারা দিয়ে আমাকে নাবালক করে রেখেছে।
মা-বাবা ওরকমই হয়। ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে তারা ভীষণ প্যাশনেট। কিন্তু কি জানো, স্নেহ সবসময়ে নিম্নগামী। মা-বাবা আমাদের যতটা ভালবাসে আমরা কিছুতেই তাদের ততটা ভালবাসতে পারি না।
বাজে কথা। আপা। আমি কিন্তু—
তুমি তো প্রকৃতির নিয়ম উল্টে দিতে পারো না। তবে আমি মানছি তুমি তোমার বাবাকে খুব ভালবাসো, যতটা আমাদের বন্ধুদের কারও মধ্যেই দেখি না। আর সেইজন্যই তুমি ভীষণ ভাল।
থ্যাংক ইউ। কিন্তু তুমি জানো না, আমার বাবাও ভীষণ ভাল। আইডিয়াল ম্যান।
কেন জানবো না! তোমার বাবার সঙ্গে তো আমি কত কথা বলেছি। অনেক খবর রাখেন। প্রচুর পড়াশুনো করেছেন। স্মার্ট।
অ্যান্ড অনেস্ট। অ্যান্ড লাভিং। অ্যান্ড কেয়ারিং।
আপা অনীশের হাতে মৃদু চাপড় দিয়ে বলে, শোনো, এখন বাবার কথা অত ভেবো না। মনটাকে অন্যদিকে সরিয়ে নাও।
কি করে?
জোর করে। সবসময়ে বাবার কথা ভাবছো, অথচ তার জন্য প্র্যাকটিক্যালি তোমার কিছু করার নেই, এটা তোমাকে ভীষণ দুর্বল করে ফেলছে। জোর করে মনটাকে অন্য চিন্তা-ভাবনায় নিয়ে যাও। পৃথিবীটা তো অনেক বড়, কত কি আছে, ভাবতে পারো না!
না।
তাহলে একটা কাজ করবে? আমার সঙ্গে দাবা খেলবে?
দাবা? যাঃ!
দাবা খুব ভাল খেলা। মনটাকে একদম গ্রেফতার করে নেয়। কিছুক্ষণ খুব রিলিফ পাবে। আর যদি থ্রিলার পড়তে চাও আমি তোমাকে একটা দারুণ বই দিতে পারি। রোড টু গনডলফো। পোপকে চুরি করার একটা মজাদার উপন্যাস পড়বে?
অনীশ হোসে ফেলে। বলে, বাবার কথা ভাবতে তো আমার খারাপ লাগছে না। মনটাকে অত সহজে সরানো যাবে না। আপা!
আমি মনে করি। কাল থেকে তোমার ক্লাস করাও উচিত। তোমার বাবা নার্সিং হোম-এ, ডাক্তাররা যা করার করবে। তুমি কেন ক্লাসে যাচ্ছে না?
পড়াশুনোর চিন্তা মাথায় উঠেছে। আমাদের ফিউচারও খুব আনসার্টেন। বাবাই আমাদের সোর্স অফ ইনকাম। চাকরিটা ভাল। কিন্তু আমাদের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স বা প্রপার্টি নেই।
