কি কথা? বলেছে তুই বনগাঁয়ে ফিরে গেলে তোর কোনও অসুবিধে হবে না। বলে গেছে কাকা না কে যেন, তোকে আর কিছু বলবে না। মিটমাট হয়ে গেছে।
তড়িৎ-স্পর্শে উঠে দাঁড়ায় বীণাপাণি, বারবার খবরটা দিচ্ছে কেন বলো তো! আমার বনগাঁয়ে যাওয়া নিয়ে ওর এত মাথাব্যথা কেন?
তা তো জানি না। আমিও ভাবছিলাম মেসেজটার মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ আছে।
না গো দাদা। কোনও রহস্য নেই। কাকার সঙ্গে আমার একটু মন কষাকষি চলছিল, তাই।
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলল, তা নয় রে বীণা। আমি বাবার কাছেও কিছু শুনেছি।
কী শুনেছি দাদা?
তোর ডলার। আর পাউন্ডের কথা। কাজটা ভাল করিসনি।
বাবাকে কে বলল?
নিমাই, এখান থেকে যেদিন চলে গিয়েছিল। মাঝরাতে, বাবার সঙ্গে দেখা হয়। তখন বলেছিল।
ওঃ। বলে বীণা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।
ও টাকা তুই কেন যে বিপদ মাথায় করে নিজের কাছে রেখেছিলি!
ও টাকা তো কারও নয় দাদা।
সে তো ঠিকই। কারও নয়। তার মানে তোরও নয়।
কিন্তু গচ্ছিত ছিল যে।
তাহলেও সেটা যে গচ্ছিত রেখেছিল তার বাড়ির লোকের পাওনা। তোর পাওনা হয় কি করে?
তার বাড়ির লোককে পাবো কোথায়?
খুঁজেছিলি?
না।
ও টাকার জন্য তোকে বোধ হয় অনেক গুনাগার দিতে হল। না?
দাদা, আমি কি তবে চোর?
তুই বোকা।
আমি লোভী, না দাদা?
অভাবে পড়ে হয়তো লোভ করেছিলি।
তুমি আমাকে চোর বলবে না?
বললে কি তুই খুশি হোস?
না, বলোই না, চোর বলতে ইচ্ছে করে কি না।
না। চুরি করিাসনি ঠিকই, তবে কাজটাও ভাল হয়নি।
এখন আমি কি করব দাদা?
কৃষ্ণজীবন মৃদু একটা ম্লান হাসি হেসে বলে, অনেক দুঃখের কথা শুনিয়েছিস আজ। তোর বিয়ে, সংসার, জীবনসংগ্রাম সব শুনলাম। কিন্তু এবার তোর সুখের কথাও শুনতে ইচ্ছে করছে।
সুখ কোথায় দাদা? আমার মতো পোড়ারমুখি আর আছে?
অনেক আছে। তোর এখনই বা বয়স কী?
কী করতে বলে আমায়?
আমি বলি নিমাই যা বলে তাই কর। বনগাঁয়ে ফিরে যা। যাত্ৰাদলের চাকরি গেছে ভালই হয়েছে। আর ওপথে যাওয়ার দরকার নেই।
পেট চলবে কি করে?
পেট চালানোর ভার বাবা যাকে দিয়েছে তার ওপর আর একবার নির্ভর করে দেখা না!
কার কথা বলছ? নিমাই? ওর সঙ্গে আর এ-জীবনে আমার মিল হবে না।
তুহলে যা ভাল বুঝবি করিস।
হ্যাঁ দাদা, তোমাদের নিমাই কাকার সঙ্গে মিটমাটের কথা বলে গেল কেন? ঝগড়া তো আমার সঙ্গে কাকার, নিমাই মাঝখানে আসছে। কোথা থেকে?
তা জানি না।
বীণাপাণি সারা দিন কথাটা নিয়ে ভোবল। মিটমাট তো হওয়ার কথা নয়। মিটমাট হবে কি করে? :
সারা রাতটা ঘুমহীন কাটল তার। সকালে উঠেই সে বনগাঁয়ে রওনা হয়ে গেল। সরেজমিনে ব্যাপারটা দেখতে হবে। বুকটা দুরুদুরু করছে।
ঘোমটা টেনে বাস থেকে এক স্পট আগে নেমে পড়ল বীণা। তারপর অনেকটা হেঁটে দুপুরে নিজের ঘরে পৌঁছলো। দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকে স্তব্ধ হয়ে গেল সে। মিটমাট কিভাবে হয়েছে তা বুঝতে আর বাকি থাকল না।
তবু উপুড় হয়ে গর্তটা ভাল করে খুঁজে দেখল। বীণা। নেই। তার বুক-বুক করে লুকিয়ে রাখা অত ডলার। আর পাউন্ড সব হাওয়া।
মেঝের ওপরই বসে পড়ল বীণা। বুকটা হাহাকারে ভরে গেল। দু চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। দুঃখের দিনে ওই লুকোনো যখের ধানের কথা ভেবে কত ভরসা পেত সে। ভাবত সব গেলেও ওটা তো আছে।
আজ কিছু রইল না তার।
কাকাও তাকে আর বিশ্বাস করবে না। কখনও।
সারা দিন রান্নাবান্না না করে না খেয়ে চুপ করে শুয়ে রইল বীণা।
বিকেলে তার কাছের প্রতিবেশীর মেয়ে সুমনা এসে বলল, ও মা! তুমি এসেছ বীণাদি! এদিকে কত কাণ্ড হয়ে গেল! তোমার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল।
কী কাণ্ড রে? বলে বীণা উঠে বসল।
তুমি কিছু জানো না?
না তো।
তোমাকে মারবে বলে কাকার দল ঘোঁট পাকিয়েছিল তা জানো?
না। তাও জানি না।
সজলদাকে তো খুব মেরেছে।
বীণা চুপ করে রইল।
ওরা নিমাইদাকেও ধরেছিল। নিমাইদা নাকি তোমার টাকা নিয়ে কাঁচরাপাড়ায় দোকান দিয়েছে। নিমাইদাকেও মারত।
মারেনি!
না। কাকা নিমাইদাকে খুব ভালবাসে তো!
তারপর বল।
নিমাইদা তোমাকে বাঁচানোর জন্য অনেক টাকা দিতে চেয়েছিল কাকাকে। এমন কি দোকান অবধি বিক্রি করতে চেয়েছিল। তা অবশ্য করতে হয়নি।
ঘরে গর্ত করল কে রে?
নিমাইদা এসে তোমার লুকোনো টাকা বের করে কাকাকে দিয়ে দিয়েছে। নইলে নাকি তোমার বিপদ ছিল। হ্যাঁ, বীণাদি, এ নাকি সেই পগার টাকা?
বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, একটু জল খাওয়াবি সুমনা? গলাটা শুকিয়ে আছে।
সুমনা দৌড়ে গিয়ে জল এনে দিল। তারপর বলল, তুমি নাকি আর যাত্রা করবে না বীণাদি?
কে জানে কী করব!
সজলদার সঙ্গে কি তোমার বিয়ে হবে?
কে বলেছে?
সবাই বলছে।
না রে। ওসব বাজে কথায় কান দিস না। সজল কেমন আছে জানিস?
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে। ভালই আছে বোধ হয়।.
সন্ধের পর সজল নিজেই এসে হাজিরা। বীণা ঘরদোর ঝাটপাট দিয়ে হ্যারিকেন জ্বেলে ক্টোভ ধরিয়ে চা করছিল।
সজল এসে বলল, বীণা, কেমন আছ?
আমার জন্য মার খেয়েছ। শুনলাম।
তোমার জন্য সব পারি।
তোমার বীরত্বের দরকার ছিল না।
বীরত্ব কে বলল? তোমাকে পালানোর পরামর্শ দিয়েছিলাম বলে এই শান্তি।
এখন কী হবে বলো তো!
তাই ভাবছি, দুজনেই বেকার।
১০১. কত সামান্য হলেই চলে যায়
আমাদের কত সামান্য হলেই চলে যায়, তবু দেখ, সেই সামান্যটুকুই হতে চায় না। রাজপ্রাসাদও নয়, বড়লোকদের ফ্ল্যাটবাড়িও নয়। দুখানা ঘর, একটু বারান্দা, কলঘর, একখানা রান্নাঘর, ব্যস হয়ে গেল। তা সেটুকুরও যা এস্টিমেট দাঁড়াচ্ছে তাতে চোখ উল্টে যায়। অনিন্দিতা আর তার মায়ের তাড়নায় না করেও উপায় নেই, কিন্তু বড্ড ভয় পাচ্ছি। বাবা, শেষ করতে পারব তো!
