নামি দাদা। না নেমে উপায় ছিল না তখন।
কৃষ্ণজীবন চিন্তিতভাবে তার মুখের দিকে চেয়ে বলে, আমার যাত্রা সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই। কিন্তু লোকে বলে, যাত্রার দলে ভদ্রবাড়ির মেয়েরা যায় না। তুই যে কেন গেলি!
সামান্য ক্ষোভের সঙ্গে বীণাপাণি বলল, আমি কি ভদ্রবাড়ির মেয়ে দাদা? তুমি কি জানো না। আমরা কত কষ্টে মানুষ হয়েছি? আর কীভাবে আমাকে একজন হাড়হাভাতের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হল! ওরকম শ্বশুরবাড়ি যেন শক্ররও না হয়। কী গরীব ভাবতে পারবে না। তার ওপর হল অসুখ, চিকিৎসার টাকা নেই, পথ্যি জোটে না। কী করতাম বলো তো!
কৃষ্ণজীবন তার মুখের দিকে গভীর নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল। বলল, বল শুনি।
কেঁদে ফেলল বীণাপাণি। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলল, নিজেকে ভদ্রবাড়ির মেয়ে বলে ভাবতে কবেই তো গেছি। এ গরিব বাড়ি থেকে আরও গরিব আর-এক বাড়িতে গিয়ে উঠেছি। ভদ্র পরিবেশ কোথায় পেয়েছি বলো তো! জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল আমার। তখন তো তুমি আমাদের পাশে ছিলে না। তুমি ছাড়া আর এ বাড়ির কেই-বা ভদ্রলোকের মতো বলো তো! মেজদা সেজদা এদের তো জানো। আজ মস্ত বাড়ি হয়েছে তোমার দয়ায়, কিন্তু এতদিন কিভাবে কেটেছে আমাদের?
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলল, ঠিক কথাই তো। কিন্তু তবু যাত্ৰাদলে কেন গেলি সেটা বোঝা গেল না।
ওই জন্যই তো। কাকা নামে একটা নাটক-পাগল লোক আছে, সে-ই বাঁচিয়ে দিল চাকরি দিয়ে।
কিন্তু সেই লোকটা নাকি স্মাগলার?
হ্যাঁ, তাও ঠিক। তবে সে লোক ভাল।
নিমাই কি খুব খারাপ লোক রে বীণা?
মেরুদণ্ডহীন।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, অনেকদিন আগে তাকে একবার দেখেছিলাম। ফের দেখা হল গতকাল। আশ্চর্যের বিষয় হল, তাকে আমার ভীষণ ভাল লোক বলে মনে হয়েছে। কেন রে?
কেন তা কি করে বলব? বাবাও বলে, তুমিও বলছি, আমি তো ভালর কিছু দেখি না। অকর্মার ধাড়ি।
আমরা ছাড়া আর কেউ বলে না?
বলে। ভাল লোক ভাল লোক শুনে শুনে কান পচে গেল। কিন্তু ভাল ধুয়ে কি জল খাবো?
শুনি এখন সে কাঁচরাপাড়ায় হোটেল চালাচ্ছে। ভাল আয়।
কে জানে কি!
তোর সঙ্গে কি ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?
ওইরকমই।
কেন হল?
বনল না।
কৃষ্ণজীবন মাথাটা একটু দুধানে নেড়ে বলল, খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে একটা ব্যবসাকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে সে খুব অকৰ্মণ্য বলে আমার মনে হয় না।
এতদিন তো পারেনি।
কৃষ্ণজীবন তার চোখের দিকে চেয়ে বলল, সেইটেই তো তোর কাছে জানতে চাইছি, এতদিন পারেনি কেন?
ও মা! তা আমি বলব কি করে?
তোর সঙ্গে ছিল, অথচ তখন পারল না, তোকে ছেড়ে এসেই পেরে গেল তার মানেটা কী দাঁড়াচ্ছে?
কী বলো তো?
তার মানে দাঁড়াচ্ছে কোনও কারণে ও তোর কাছে বাধা পেত, সাহস করে উঠতে পারত না, তোর মুখাপেক্ষী হয়ে ছিল। হ্যাঁ রে, নিমাই কি খুব স্ত্ৰৈণ?
মোটেই নয়।
ব্যাপারটা খুবই রহস্যময়। এনিওয়ে, তোকে ছেড়ে গিয়ে লোকটার তো উন্নতিই হয়েছে দেখছি।
হোক, আরও হোক। আমি তো আর ভাগ বসাতে যাচ্ছি না।
কৃষ্ণজীবন হাসল, কী কথার কী জবাব। বোস, ঠাণ্ডা হ্যাঁ। ওর ওপর তোর এত রাগের কারণটা আমাকে বলবি? নিরীহ, সৎ একজন লোক, হয়তো-বা মুখচোরা, তার বেশি আর কি খারাপ হবে নিমাই বল তো!
তোমরা বুঝবে না। তোমরা সবাই ওর পক্ষে।
আমরাই বা কেন নিমাইয়ের পক্ষে সেটাও কি ভেবেছিস?
তোমরা ওর সততাকে খুব দাম দাও।
সততাকে তুই দাম দিস না?
দেবো না কেন, কিন্তু বেশি-বেশি করলে রাগ হয়। এটা কলিযুগ, সততা দিয়ে কি বাঁচা যায়? কাকা ওকে একটা চাকরি দিয়েছিল, কেন নিল না জানো? ওটা নাকি পাপের টাকার তহবিল। সেই চাকরি পরে আমি নিই।
সেটা কি নিমাই অন্যায় করেছে?
করেছেই তো। তোমার নিমাই হল নিমকহারাম। এতদিন আমারটা খেল-পরল, আমার টাকায় মা-বাবার প্রতিপালন করল, আর আমাকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে গেল। এই লোকের কী যে গুণ দেখলে তোমরা!
কৃষ্ণজীবন হঠাৎ প্রশ্ন করে, বনগাঁযে তুই কি একা থাকিস?
একা আবার কি? সেখানে আমার নিজের বাড়ি, পাড়া-প্রতিবেশী আছে, চেনাজানা কত লোক। ওকে একা বলে না।
নিমাই আসে না?
আসবার মুখ আছে নাকি?
কৃষ্ণজীবন একটু উদাস হয়ে গিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কাল নিমাই এসেছিল। চেহারাটা ভাল হয়েছে একটু। বেশি কথা বলল না। কিন্তু মুখখানায় এমন একখানা ভাব আছে যাতে ওকে ভাল লাগে। এরকম শুদ্ধ চোখ বড় একটা দেখি না।
কী বলল তোমাকে? আমার নামে লাগায়নি?
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলে, সেরকম লোকই নয়। তোর কথা তার মনে আছে বলেও তো মনে হল না।
কি করে বুঝলে?
আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
কী জিজ্ঞেস করেছিলাম।
তোর সঙ্গে দেখা করেছে কিনা। অবাক হয়ে বলল, আমি তো তার কাছে আসিনি। এ বাড়ির কর্তা আমার গুরুজন, তাকে প্ৰণাম করে চলে যাবো।
এত আস্পর্ধা?
কৃষ্ণজীবন হাসল, আমাকেও প্ৰণাম করেছে। বাবাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে প্ৰণাম করেছে।
পাঁচ হাজার?
হ্যাঁ। বাবা অবশ্য নেয়নি। ফিরিয়ে দিয়েছে।
কতক্ষণ ছিল?
আধঘণ্টার বেশি নয়। দোকান খোলা আছে বলে তাড়াতাড়ি চলে গেল।
বীণাপাণি চুপ করে বসে রইল। তার কান্না পাচ্ছে, রাগ হচ্ছে, সব লণ্ডভণ্ড করে দিতে ইচ্ছে করছে। ভগবান এমন একচোখো কেন? আজ দান উল্টে বীণাপাণির রোজগার বন্ধ, আর ওদিকে নিমাইয়ের বরাত ফিরেছে। এরকম কেন হয়?
জীবন হঠাৎ একটু নরম গলায় বলল, আমাকে একটা কথা বলে গেছে নিমাই। তোকে বলার জন্য।
