ভেতরটা বলি বলি করে ওঠে চয়নের। সে বলে না। মৃদু হাসে শুধু।
আপনি তো সাজাতিক লোক মশাই। জ্যোতিষী করেন নাকি?
না।
তাহলে?
মনে হয়।
কী মনে হয়?
মনে হয় আপনি কাউকে ভালবাসেন। সত্যিকারের ভালবাসেন। কিন্তু টের পান না।
আমিই যদি টের না পাই তাহলে সেটা আপনি টের পান কেমন করে?
আমিও পাই না।
তবে বলছেন যে!
আমার মাঝে মাঝে অদ্ভুত কিছু একটা মনে হয়।
সেই অদ্ভুতটা কি?
ওই তো বললাম, আপনি না জেনেই কাউকে ভালবাসেন। সেটা এত ভিতরের ব্যাপার যে টের পান না।
তাই কি হয়? ভালবাসা টের না পেয়ে উপায় নেই।
হয়তো সেটাকে ভালবাসা বলে চিনতে পারেন না।
এসব হেঁয়ালিতে আমি বিশ্বাস করি না। তবে আমি একজনকে খানিকটা ভালবাসার চেষ্টা করেছিলাম ঠিক কথা। সে
চয়ন চুপ করে রইল।
হেমাঙ্গ বলল, ভালবাসাটা ছিল বন্ধুর মতো। কিন্তু চারুদি সব গোলমাল করে দিল।
উনি ভুল করেননি। বিয়ের চেষ্টা করে উনি আপনার উপকারই করেছেন। তাতে আপনি বুঝতে পারলেন যে রশ্মিকে আপনি সেরকম ভালবাসেন না।
এরকম একটা কথা। আপনি আগেও বলেছিলেন। আপনি কিন্তু একটু বিচ্ছু টাইপের আছেন। এবার বলুন তো, আজ যা বললেন তার সোর্সটা কি?
আমি সত্যিই জানি না।
না জেনেই বলছেন?
মনে হয়, ব্যাপারটা এতই গভীর এবং গোপন যে, আপনি সেটা কনশাসলি স্বীকার করতে চান না। তাই ব্যাপারটা আপনার কাছে ধরা দেয় না।
এটা কি ফ্রয়েভীর ব্যাপার নাকি মশাই?
ফ্ৰয়েড আমি পড়িইনি।
কিন্তু ভালবাসার জন্য তো একটা মেয়ে অন্তত চাই। সেটা কে?
আছে হয়তো!
কে হতে পারে?
চয়ন মুচকি একটু হেসে চুপ করে থাকে।
হেমাঙ্গ তার চোখের দিকে চেয়ে বলে, আপনি কি তাকে চেনেন?
হয়তো চিনি।
আপনাকে আজ হয়তোতে পেয়েছে কেন?
আমার অনুমানটাও এত পাতলা যে বলার মতো নয়।
আমার পরিচিত মেয়ের সংখ্যা এতই কম যে অনুমানটা খুব ডিফিকাল্ট নয়।
দুজনে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর হেমাঙ্গ বলল, চলুন আপনাকে গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি। থাক। আমি চলে যেতে পারব।
সেটা জানি। তবু আপনার কম্পানি আমার কিছুক্ষণ আরও দরকার।
তাহলে চলুন।
১০০. এত আনন্দ হল বাড়িতে
এই যে এত আনন্দ হল বাড়িতে, গৃহপ্ৰবেশে এত লোক খেল, এত হইচই, এর মধ্যেও বীণাপাণি রইল আড় হয়ে। তার মনে একটুও সুখ নেই। সে শুনেছে ভিড়ের মধ্যে এক ফাঁকে এসে নিমাই নাকি শ্বশুর-শাশুড়িকে প্ৰণাম করে চলে গেছে। চোখাচোখিটুকুও হয়নি তার সঙ্গে। না হয়ে ভোলই হয়েছে। বীণাপাণির যত অশান্তির মূলে তো ওই একটা লোক।
ভয়ে বীণাপাণির বুক সবসময়ে দুরদুর করে। বনগাঁয়ে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলেই বুক হিম হয়ে যায়। নিমাই নাকি ছোড়দাকে বলেছে, বীণাপাণি বনগাঁয়ে ফিরে যেতে পারে। কথাটার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝেনি বীণা। সে বনগীয়ে ফিরবে কি না তা নিয়ে নিমাইয়ের মাথাব্যথা কেন?
বীণার সবচেয়ে দুঃখ, নাটকটাই জীবন থেকে বাদ হয়ে যাচ্ছে। সজল বলেছিল, কাকা টের পেয়ে গেছে। কাকা এমনিতে ভাল, কিন্তু চটালে সাড়ে সর্বনাশ। বীণা কি করবে। তাই ভেবে পাচ্ছে না। ডলার। আর পাউন্ড বাঁচাতে সে চট করে। যা মাথায় এসেছিল তেমনই একটা কৌশল করে রেখে এসেছে বটে, কিন্তু তাতে বিপদটা রয়েই গেল। কাকা তাকে খুঁজবে, দরকার হলে খুনও করাবে। তবে বিষ্টুপুর শীতলাতলার পাল্লাটা একটু দূরের, এইটুকুই যা ভরসা। উদ্বেগ টাকাগুলোর জন্যও রয়েছে। মেঝের নিচে গর্তের মধ্যে চাপা আছে ঠিকই, তবু নাগালের মধ্যে যে নেই সেটাই দুশ্চিন্তার কারণ। কী হচ্ছে কে জানে!
বাড়িটা যে দেখনসই হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। মা-বাবার মুখে হাসি ধরছে না। দাদা মেলা জিনিসপত্র কিনে ঘর সাজিয়ে দিয়েছে। সোফাসেট, লোহার আলমারি, নতুন খাট। এরকম রাজার হালে থাকার কথা মা-বাবা তো কখনও ভাবেনি।
তবে বিষ্ণুপদ তাকে বলেছে, বড় অস্বস্তি হচ্ছে, বুলি প্রথম প্রথম তো! মনে হচ্ছে যেন পরের বাড়িতে ঢুকে পড়েছি।
নতুন বলে হচ্ছে বাবা, দুদিনেই সয়ে যাবে।
তা বটে। আজ ঝাঁঝরির চলে জান করলুম, ঠাণ্ডা না লেগে যায়।
বুঝে সুঝে কোরো।
কাল থেকে ভাবছি। ওই কুয়োপাড়েই চানটা করব। এ ঠিক জুতা হচ্ছে না।
না বাবা, পুরনো অভ্যাস বজায় রাখলে নতুনটা আর অভাস হবে না। দাদা এত আদর করে সব করে দিল।
তা বটে।
সবচেয়ে খুশি নয়নতারা। চোখে-মুখে সবসময়ে ডগমগ ভাব। মুখে উপচে পড়ছে হাসি।
ও মা, তোমার যে দেমাকে মাটিতে পা পড়ছে না গো!
নয়নতারা হেসে বলে, তা বাপু, একটু দেমাক আমার হয়েছে। সব ঘুরে ঘুরে দেখলি তো!
মেঝেটা বাপু যেন তেলতেল করছে। সিঁড়িটিাড়ি সব দেখলি? আর রান্নাঘর? কত তাক, কত কাবার্ড।
কাবার্ড কথাটা দাদা শিখিয়েছে মাকে। শুনে সবাই হাসে।
বীণাপাণিও হাসল, আমাকে কোন ঘরখানা দেবে মা?
কেন, দোতলায় তিনখানা শোওয়ার ঘর। আমাদের পাশের ঘরেই তুই থাকবি।
দাদাকে বড্ড ভয় বীণার। অপরাধবোধও কম নয়। এই দাদাকে তারা এ বাড়ি থেকে অনেক অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তবু এতদিন বাদে দাদা কিছু মনে করে রাখেনি নিশ্চয়। তা না হলে এখানে এত বড় বাড়ি করে দিত না। খুব ভয়ে ভয়ে আর লজ্জার সঙ্গে গৃহপ্ৰবেশের পর দিন সকালে দাদার ঘরে গেল বীণা। প্ৰণাম করে বলল, কেমন আছ দাদা?
কৃষ্ণজীবনের মুখে গভীর চিন্তার ছাপ। বলল, ভালই। তুই কেমন?
ওই একরকম। আমাদের আর ভাল থাকা!
কৃষ্ণজীবন গম্ভীর গলায় বলে, তুই নাকি যাত্রায় নামিস?
