চয়ন বিদেশ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। সে চুপ করে রইল।
হেমাঙ্গ বলল, চারুদি হয়তো ফিরে আসবে। আগেও একবার চেষ্টা করেছিল সুব্রতদার সঙ্গে বিদেশে সেটল করার।
মন খাবে বলে বেশ ভাল আয়োজন করেছিল হেমাঙ্গ। তবে আমিষ ছিল না। হেমাঙ্গ বলল, আজকাল আমি নিরামিষ
কেন?
এমনি, আমার মনে হচ্ছে, পশুপাখিদের ধরে ধরে খাওয়ার কোনও অধিকার আমার নেই।
তাই বা কেন? লোকে তো খায়।
লোকে কত কিছু করে। সব কিছুর মানে হয় না। আপনার কি নিরামিষ খেতে অসুবিধে হচ্ছে?
চয়ন মৃদু হেসে বলল, না তো! আমি তো নিরামিষই খাই। মাছ কেনার ক্ষমতা নেই, রাধেই বা কে? তবে প্রেজুডিস নেই। আচ্ছা, আপনার চারটে মিক্সি কেন লাগে?
হেমাঙ্গ হেসে ফেলল, আগে নতুন নতুন জিনিস কেনার খুব ঝোঁক ছিল। বাজারে একটা নতুন প্রোডাক্ট এলেই কিনে ঘোড়াম। এসব তখনকার ব্যাপার। রয়ে গেছে। এখন একটাও কাজে লাগে না। আপনাকে একটা প্রেজেন্ট করে দিচ্ছি।
আমি! আমি নিয়ে কি করব?
প্রোডাক্টটা হাতে এলে কাজে লাগানোর কথা মনে হবে।
না, দরকার নেই। আমার ঘরে জায়গাও নেই। চারুদি কত কী দেন, আমার সবই পড়ে আছে। কাজে লাগে না।
আপনিও একটু অফ-বিট, তাই না?
না, অফ-বিট নই। আমি যা হয়েছি তা অবস্থার চাপে!
ভিকটিম অফ সারকামন্ট্যান্সেস? আমরা সবাই তো তাই। আচ্ছা একটা সত্যি কথা বলবেন? আপনার টিউশনি করে মাসে কত ইনকাম হয়?
চয়ন একটু হিসেব করে বলল, বোধ হয় হাজার দুই।
কত খরচ করেন?
হিসেব করিনি। তবে হাজার খানেক তো বটে।
বছরে তাহলে আপনার বারো হাজার টাকা সেভিংস হওয়ার কথা। হয় কি?
চয়ন একটু অস্বস্তি বোধ করে বলল, তা তো জানি না।
আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই?
আছে একটা।
তাতে কিছু রাখেন না?
হ্যাঁ, মাঝে মাঝে টাকা রাখি। কারণ ঘরে রাখলে চুরি যেতে পারে।
ব্যাঙ্কে কত জমা হয়েছে জানেন না?
পাস বই অনেকদিন এন্ট্রি করানো হয়নি।
আপনি কি মানি-কনশাস। নন?
চয়ন লজ্জা পেয়ে বলে, ঠিক তা নয়। তবে মনে হয় ব্যাংকে আমার খুব বেশি থাকে না।
আমি অ্যাকাউন্ট্যান্ট। টাকা পয়সার ব্যাপারে মনো-হওয়াকে গুরুত্ব দিই না। কালকেই ব্যাঙ্কে গিয়ে জেনে নেবেন আপনার ঠিক কত টাকা আছে। আর পাস বইটা আপ-টু-ডেট করে নেবেন।
কেন বলুন তো?
টাকা পয়সার ব্যাপারে ইনফমর্ড থাকা ভাল। আপনি কি এখনও চাকরি খুঁজছেন?
চয়ন একটু স্তিমিত গলায় বলল, না, আর খুঁজছি না। ওটা আমার হবে না।
দেশে তত চাকরিও নেই। যদি চাকরি একটা কষ্ট করে পেয়েও যান মাইনে পাবেন অত্যন্ত কম। খাটাবে বেশি। এমপ্লয়ারদেরই এখন যুগ।
তাই দেখছি।
যদি কিছু টাকা জমাতে পেরে থাকেন ড়ু সামথিং অন ইওর ওন।
কি করব? ব্যবসা?
আপনি তো পড়াতে পারেন। বরং একটা টিউটোরিয়াল খুলুন।
টিউটোরিয়াল অনেক আছে। আমারটা চলবে না।
নেগেভিটি আইডিয়া নিয়ে শুরু করলে হবে না। আন্দা-জল খেয়ে লাগুন না! কাজটা করতে শুরু করলেই দেখবেন, কিছু একটা হতে শুরু করেছে। স্টার্ট ইট রোলিং।
চয়ন একটু হাসল।
হেমাঙ্গ বলল, এদেশে দেখবেন কেউ কোনও ভেনচার করতে চায় না। একটা কাপড়ের দোকান কেউ করল, দেখাদেখি আর একজনও কাপড়ের দোকানই করল তার পাশে। ফের আর একজনও তাই করল। ফলে বিজনেসটা ভাগ হয়ে গেল। কারোই তেমন লাভ হয় না। কিন্তু মাথা খাটালে দেখতে পেত। সেখানে হয়তো সেলুন খুললে বা স্টিম লন্দ্রি করলে বা ওরকম কিছু করলে কম্পিটিশন কম হত। এই মাথা খাটানোটুকুও নেই। আর একটা কথা কি জানেন? এদেশের ব্যবসাদার বা দোকানদাররা সেবাবুদ্ধি কাকে বলে জানে না। মানুষকে সেবা দেওয়ার মনোভাব থাকলে ব্যবসার ভোল পাল্টে যেত। প্ৰত্যেকটা ব্যবসাই হওয়া উচিত ওয়েলফেয়ার বিজনেস। দিনরাত অসৎ লোকদের ট্যাক্স ফাকিতে সাহায্য করতে করতে আমি টায়ার্ড।
টিউশনি করতেও আমার তেমন ভাল লাগে না।
টিউটোরিয়াল হয়তো ভাল লাগবে। না হলে আমার সঙ্গে গ্রামে চলুন। চাষবাস করবেন। পারবেন না?
চয়ন এবার হাসল না। একটু ভাবলা। তারপর বলল, আমার দ্বারা বোধ হয় কিছু হবে না।
ভাবুন। ভাল করে ভাবুন। মাথা থেকে কিছু একটা বেরোবেই। তারপর হার্ড ওয়ার্ক অ্যান্ড অনেস্টি অ্যান্ড সার্ভিস।
চয়ন মৃদু হেসে বলল, আপনি খুব প্র্যাকটিক্যাল। আমি তা নাই। অথচ চারুদি আমাকে কী বলে গেছেন জানেন? বলে গেছেন যেন আপনাকে আমি চোখে চোখে রাখি।, s
হেমাঙ্গ হাঃ হাঃ করে হাসল। বলল, ও আমাকে এখনও নাবালক বলে মনে করে।
ওঁর ভয় আপনি সন্ন্যাসী হয়ে যাবেন।
হেমাঙ্গ গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বলে, না, সন্ন্যাসী হওয়ার কোনও চান্স নেই।
চয়নের ভিতরে মন্দু একটা বেল বেজে উঠল। সে জানে। সে টের পায়। কি করে পায়? হয়তো রোগে ভুগে তার স্নায়ুতে এমন কিছু রতার সঞ্চার হয়েছে যাতে সে অনেক সূক্ষ্ম জিনিস আবছা বুঝতে পারে।
মৃদু হেসে চয়ন বলল, সেটা আমি জানি।
অবাক হয়ে হেমাঙ্গ বলে, কি জানেন?
আপনি হয়তো শিগগিরই ঘর-সংসার করবেন।
সে কী? আমি তো সে কথা বলিনি!
না, আপনি বলেননি।
তাহলে?
এমনি মনে হল।
এমনি মনে হল? না মশাই, ওটা কথা নয়। ঝেড়ে কাশুন।
চয়ন মৃদু হাসল শুধু।
আমি বলতে চেয়েছিলাম সন্ন্যাসী হওয়ার হ্যাজার্ডস আমার পোষাবে না। তা ছাড়া আমি তো ধর্ম করি না। সংসারী হওয়ার ইচ্ছে আমার নেই।
চয়ন মৃদুস্বরে বলে, হয়তো তার আছে।
কারি?
যাকে আপনি বিয়ে করবেন!
অবাক হেমাঙ্গ বলে, কাকে?
