এয়ারপোর্টে তাকে আলাদা ডেকে চারুশীলা ধরা গলায় বলল, শোনো চয়ন, হেমাঙ্গ আজ আমাকে সত্যিকারের দুঃখ দিয়েছে। ওকে আমি কতটা ভালবাসি তা হয়তো বোকাটা জানেও না। আমাকে সি-অফ করতে আসেনি। বোধ হয় রাগে। তুমি প্লিজ ওর সঙ্গে একটু কাল বা পরশু দেখা করতে পারবে?
পারবো না কেন?
ওর অফিসে আজ ফোন করেছিলাম। ওরা বলল হেমাঙ্গ আউট অফ স্টেশন। কোথায় গেছে বলতে পারল না। এরকম ভুঞ্জয়ার কথা নয়, আজ আমি চলে যাচ্ছি এটা ও ভালই জানে। তুমি গুর সঙ্গে দেখা করে বোলো, আমি খুব দুঃখ পেয়েছি। ভীষণ।
বলব চারুদি, আপনি চিন্তা করবেন না।
আমি আরও ওর কোনও ব্যাপারে থাকতে চাই না। বিয়ে করুক বা না করুক, কখনও কিছু বলব না। তা বলে সম্পর্ক কেন তুলে দেবে বলো তো! আমরা পিঠোপিঠি ভাইবোনের মতো মানুষ হয়েছি, আমাকে ভীষণ ভালবাসত ও। কেন যে এরকম হয়ে গেল!
আপনাকে এখনও উনি ভালবাসেন।
চারু মাথা নেড়ে বলে, আর বাসে না, এখন ও অন্যরকম হয়ে গেছে, একেবারে বাউণ্ডুলে। হয়তো সন্ন্যাসী হওয়াই ওর কপালে আছে। সেই জঙ্গলের বাড়িটাতে গিয়ে পড়ে থাকে। শোনো, দরকার হলে তুমি সেখানেও যেও।
যাবো।
ওকে একটু দেখো।
চারুশীলার যে কী গভীর মায়া হেমাঙ্গর প্রতি সেটা বুঝতে পেরে একটু ঠাণ্ডা হল চয়ন। এই ভালবাসাটা তার আর অয়নের মধ্যে নেই। খুব কম পরিবারেই ভাইবোনে এরকম ভালবাসা আছে। তাও চয়ন শুনেছে, হেমাঙ্গ আর চারুশীলা আপন ভাইবোন নয়, পিসতুতো মামাতো। একসঙ্গে বড় হয়েছে মাত্র।
কথা রেখেছিল চয়ন। দুদিন পর অফিসে ফোন করে জানল, হেমাঙ্গ ফিরেছে, তবে ফের বাইরে গেছে।
আরও দুদিন অপেক্ষা করল চয়ন। তারপর এক সোমবার হেমাঙ্গকে ধরল অফিসে, টেলিফোনে।
হেমাঙ্গ খুব খুশির গলায় বলল, আরে গ্রেট চয়ন! কী খবর?
আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
চলে আসুন আজ বিকেলে আমার বাড়িতে। ধরুন সাতটা?
যাবো।
রাতের খাবারটা একসঙ্গেই খাবো দুজনে, কেমন?
না না, তার দরকার নেই।
অত লজ্জা পাচ্ছেন কেন? আমি আজকাল খুব সিম্পিল খাই। স্পার্টন লাইফ স্টাইল, ফ্রগাল মিল, আমার পরিবর্তনটা লক্ষ করে অবাক হবেন। চলে আসুন। আড্ডা মারা যাবে।
সাতটার পনেরো মিনিট আগেই পৌঁছে গেল চয়ন। হেমাঙ্গ তখন নিজের হাতে কী একটা রান্না করছিল মাইক্রোওয়েভে, পাশে তার চাকরীটিও বেশ ব্যস্ত।
তাকে দেখে সত্যিকারের খুশি হল হেমাঙ্গ। তাকে দেখে খুশি হয় এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। হেমাঙ্গ তাদের মধ্যে একজন। সে বলল, আরো বাঃ, আপনার চেহারার তো বেশ উন্নতি হয়েছে দেখছি।
চয়ন লাজুক হাসল, কথাটা মিথ্যে নয়। তার চেহারার সম্প্রতি কিছু উন্নতি ঘটেছে।
বসুন বসুন, আগে কি একটু চা বা কফি খেয়ে নেবেন?
না, আমার নেশা নেই।
হালকা কিছু খাবার খাবেন? ইফ ইউ আর হাংরি?
না; চারুদি আমাকে যাওয়ার আগে একটা মেসেজ দিয়ে গেছে।
তাই নাকি? কিরকম মেসেজ?
আপনি সি-অফ করতে যাননি বলে উনি খুব দুঃখ পেয়েছেন, ভীষণ। খুব কান্নাকাটিও করছিলেন।
হেমাঙ্গর মুখ থেকে হাসিটা ধীরে ধীরে মুছে গেল। সে একটু মাথা নেড়ে বলল, চলুন বসি।
সোফা-সেটে সাজানো ড্রয়িং রুম মুখোমুখি বসে হেমাঙ্গ ধীর গম্ভীর গলায় বলল, খুব কাদছিল?
খুব, উনি আপনাকে বড্ড ভালবাসেন।
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, জানি। খুব ছেলেবেলা থেকেই চারুদি আমাকে সারা দিন কোলেপিঠে করে রাখত। আমি ওর খুব ন্যাওটা ছিলাম। আমাদের বাড়িতে কড়া শাসন আর ডিসিপ্লিনের মধ্যে ওই চারুদিই। আমাকে আড়াল করে রাখত। আমি দুষ্টুমি করলে বা অন্যায় কিছু করলে আমার হয়ে নির্বিকারভাবে মিথ্যে কথা বলত। ওর নিজের ভাইবোন বলতে কেউ ছিল না। মা-হারা মেয়েকে ওর বাবা বাধ্য হয়ে আমাদের বাড়িতে রেখে দেয়। সেই থেকে ও আমার নিজের দিদির মতোই। তা ছাড়া ও আমার খুব বন্ধুও। একটু ডমিনেটিং, কিন্তু চারুদি অত্যন্ত অফ-বিট মেয়ে। লোভ নেই, সঞ্চয় করতে জানে না, টাকা ওড়াতে ভালবাসে, লোকের জন্য করেও অনেক। সবগুলো হয়তো প্রাস কোয়ালিটি নয়, কিন্তু তাতেই ও অফ-বিট। তাই না?
হ্যাঁ। ওঁকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি।
হেমাঙ্গ হেসে ফেলে, শ্রদ্ধা-ফ্রদ্ধা আপনার একটা রোগ। চারুদিকে শ্রদ্ধা করার কি আছে? সি ইজ এ ভেরি গুড ফ্রেন্ড। এরপর হয়তো বলবেন আপনি আমাকেও শ্রদ্ধা করেন। শ্রদ্ধা রোগটা আপনার সারানো দরকার।
চয়ন ফের লাজুক হাসল। বলল, উনি বলে গেছেন, আপনাকে আর ডিস্টার্ব করবেন না।
হেমাঙ্গ একটু হেসে বলল, আপনাকে আর কষ্ট করে মেসেজ দিতে হবে না। বোম্বাইয়ের শাহর এয়ারপোটে প্রায় সারা রাত আমি চারুন্দির অনেক করুণ বিলাপ শুনেই এসেছি।
অবাক হয়ে চয়ন বলে, তার মানে?
চারুদি রওনা হওয়ার আগের দিন আমি বোম্বাই যাই।
ওঃ।
চারুদিকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই খবরটা আগে দিইনি। বোম্বাইতে আমার ইনফ্লয়েনশিয়াল ক্লায়েন্ট আছে। তাদের একজনই আমাকে ট্রানজিট লাউঞ্জে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয়। চারুদি আর সুব্রতদা তো ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠেছিল। আর ছেলেমেয়ে দুটো যা খুশি হয়েছিল তা বলার নয়। ভোরে প্লেনে ওঠার আগে অবধি জোর আড্ডা হয়েছিল।
চয়ন একটা শ্বাস ফেলে বলল, যাক, আপনি একটা খুব ভাল কাজ করেছেন। চারুদি এত আপসেট ছিলেন। তা ছাড়া অনেক দিনের জন্য চলে গেলেন তো!
হেমাঙ্গ ভ্রূ কুঁচকে একটু ভেবে বলল, চারুদিকে যতদূর চিনি, ও বেশি দিন বিদেশে থাকতে পারবে না। ছেলেমেয়েকে ছেড়েও থাকা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। আমার মনে হয় ওর গোটা প্ল্যানটাই ভেস্তে যেতে পারে। ডেভেলপাড় দেশগুলোর অবস্থা আমার ভাল বলে মনে হয় না। বড্ড পারমিসিভ। বড্ড বেশি ব্যক্তিস্বাধীনতা, বড্ড বেশি সেক্স অ্যান্ড অবসেশনস। সবচেয়ে বেশি লোনলিনেস। কিছুদিনের মধ্যেই দেখবেন ওসব দেশে সাজঘাতিক মানসিক সংকট দেখা দেবে। অ্যাফলুয়েনস যে শেষ কথা নয় সেটা বুঝতে বেশি সময় লাগবে না।
