তোকে কেউ পড়ায় না?
না তো! এখন নিজেই পড়ি। শক্ত লাগলে হেডস্যার বা অন্য সব স্যারের কাছে পড়া বুঝে নিই।
কৃষ্ণজীবন একটু ভেবে বলল, কোন ক্লাস হল তোর?
নাইন।
ওরে বাবা, তুই তো বড় হয়ে গেছিস।
পটল হাসল, বড়ই তো।
কত লম্বা হয়েছিস বল তো!
মাপিনি তো! তবে সাড়ে পাঁচ ফুট বোধহয়। তুমি কিন্তু খুব লম্বা। আমি অত লম্বা হবো না বোধহয়।
খেলিস?
হ্যাঁ। ফুটবল, ক্রিকেট। স্পোর্টস-এও প্রাইজ পাই। তুমি পেতে?
কৃষ্ণজীবন হাসল, পেতাম। তবে তখন ভাল জুটত না, বেশি দৌড়ঝাঁপ করতে সাহস হত না, পাছে খিদে পেয়ে যায়। ওই খিদের ব্যাপারটা থাকা ভাল, বুঝলি? খিদে মরে গেলে জীবনটা আলুনি হয়ে যায়।
বুঝেছি।
খিদে কিন্তু নানারকম আছে। যত বড় হবি, টের পাবি।
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে হেঁটে তারা একটা পুকুরের ধার পেরিয়ে গেল। কৃষ্ণজীবন জলের দিকে চেয়ে বলল, সাঁতার জানিস?
হ্যাঁ।
এই পুকুরটায় আমি সাতার শিখেছিলাম, মনে আছে।
বিস্ময় আর আনন্দে পটল বলে উঠল, আমিও তো এটাতেই শিখেছি জ্যাঠা।
কৃষ্ণজীবন হঠাৎ প্রশ্ন করে, জল তোর কেমন লাগে?
জল! জল খুব ভাল লাগে।
বাঁ ধারে একটা সজনেগাছে বৃষ্টিধারার মতো অজস্র কচি সজনে ঝুলে আছে। কৃষ্ণজীবন দৃশ্যটা দাঁড়িয়ে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর স্বগতোক্তির মতো বলল, জল আর মাটি, মাটি আর জলী! কত কী করতে পারে।
বড় জ্যাঠাকে খানিকটা বুঝতে পারে পটল, অনেকটাই পারে না। এই যে জ্যাঠা কেমন আনমনা আর বিষণ্ণ হয়ে গেল, কেমন গুটিয়ে পড়ল নিজের একটা অদৃশ্য খোলের মধ্যে, এই জ্যাঠাকে বুঝতে পারে না পটল। তবে তার ঠিক জ্যাঠার মতোই হতে ইচ্ছে করে।
কৃষ্ণজীবন হঠাৎ প্রশ্ন করে, লাঙল চালাতে পারিস?
না। কখনও চালাইনি।
শেখা ভাল। মাটির সঙ্গে একটা বুঝ হয়।
আচ্ছা জ্যাঠা।
গাছ চিনবি, বীজ চিনবি, ঋতুচক্র, খনার বচন শিখব। পাখি পোকামাকড় এ সব লক্ষ করিস? গাছপালা?
একটু-আধটু নয়, ভাল করে। যা করবি ভাল করে করবি। শুধু বই পড়লে শেখা হয় না। জীবন থেকেই পাঠ নিতে হয়। চারদিকে তোর কত মাস্টারমশাই দেখেছিস? ওই রোদ, আকাশ, গাছপালা, প্রজাপতি, চড়াইপাখি, সব তোর মাস্টারমশাই। পাঠশালা সাজিয়ে বসে আছে।
পটল হাসল, বুঝেছি।
কৃষ্ণজীবনও হাসল। বলল, আমি সামান্যই পেরেছি। তুই অনেক পারিস।
তুমি কত জানো!
শীতলাতলায় আজ হাটবার। মেলা লোকজন। গিসগিসে ভিড়। কৃষ্ণজীবন ভাইপোদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে হাট দেখল। দর জেনে নিল অনেক কিছুর। তারপর বলল, এখানে বোধহয় একটু সস্তা।
হ্যাঁ জ্যাঠা, এখানে কলকাতার চেয়ে অনেক সস্তা। সবাই বলে।
জিলিপি খাবি? আগে নিরাপদর দোকানে জিলিপি ভাজিত, এখনও কি আছে সেই দোকান?
পটল নাক কুঁচকে বলল, আছে। তবে আজকাল আর ভাল নেই। এখন ইন্দ্ৰনীল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ভাল জিলিপি করে।
ইন্দ্ৰনীল বেশ পরিচ্ছন্ন দোকান। পাকা ঘর, টেবিল চেয়ার আছে।
কৃষ্ণজীবন পটলকে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ রে, এরা শালপাতার ঠোঙায় জিলিপি দেয় না?
না জ্যাঠা, প্লেটে দেয়।
ধুস। শালপাতা না হলে জিলিপি খেয়ে সুখই নেই।
ইন্দ্ৰনীলের মালিক উমাপদ অবশ্য কৃষ্ণজীবনকে চেনে। সে শশব্যাস্তে মান্য অতিথির জন্য শালপাতা নিয়ে এর, যত্ন করে বসিয়ে গরম জিলিপি ভাজিয়ে দিয়ে বলল, কেমন হয়েছে আজ্ঞে?
কৃষ্ণজীবন জিলিপিতে কামড় দিয়ে নিমীলিত চোখে উমাপদর দিকে চেয়ে বলল, আমাকে আপনি-আজ্ঞে করছো কেন? তুমি তো আমার সঙ্গে পড়তে। ক্লাসমেট।
উমাপদ লজ্জায় ঘাড় নিচু করে বলল, সে কবেকার কথা! তুমি এখন কত বড় হয়েছে।
তাতে কি সম্পর্ক বদলায়? তোমার ছেলে যদি দেশের প্রধানমন্ত্রীও হয়, তাকে কি আপনি-আজ্ঞে করবে?
তা নয়। প্রথমটায় ভরসা পাচ্ছিলাম না, চিনতে পারবে কি না, মনে আছে কি না।
আমার স্মৃতিশক্তি সাংঘাতিক। কিছু ভুলি না।
উমাপদ হয়ে গেল। বলল, গরম সিঙাড়া খাবে? কড়াইণ্ডটি আর ফুলকপি দিয়ে করে দিচ্ছি।
না। উমাপদ, থাক। কত দাম বলো তো জিলিপির?
ও তোমাকে দিতে হবে না। চিনতে পেরেছে। এতেই আমার দাম উঠে গেছে।
কৃষ্ণজীবন তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা দামী ক্যালকুলেটর বের করে উমাপদর হাতে দিয়ে বলল, এটা রাখো, তোমার কাজে লাগবে।
ও বাবা, এ তো দামী জিনিস।
রাখো। হিসেবের সুবিধে হবে।
উমাপদ খুব লজ্জার সঙ্গে হাসল, আমাদের যা হিসেব তা তো মুখে মুখেই হয়ে যায়। যন্ত্র লাগে নাকি?
ঠিক কথা। ক্যালকুলেটর হাতে থাকলে মানুষ দুইয়ের সঙ্গে দুই যোগ করতেও মাথা ঘামায় না, বোতাম টেপে। যন্ত্র খুব খারাপ জিনিস।
উমাপদ এক ঠোঙা জিলিপি বেঁধে পটলের হাতে দিয়ে বলল, তোর দাদুকে দিস। আগে খুব আসতেন, আজকাল আসেন না।
জ্যাঠা, এখন বাড়ি যাবে?
না না, এখনই কি? চল, এখনও কত দেখার আছে।
০৯৯. একটু ফাঁকা লাগছিল চয়নের
চারুশীলার দীর্ঘকালের জন্য বিদেশ চলে যাওয়ার পর একটু ফাঁকা লাগছিল চয়নের। চারুশীলা তার প্রতি খুবই দয়ালু ছিল। যাওয়ার আগে তাকে হাজার দুই টাকা, একগাদা শার্টপ্যান্ট, কলম, ক্যালকুলেটর, সুগন্ধী স্প্ৰে দিয়ে গেছে। চয়ন এয়ারপোর্ট গিয়েছিল। চারুশীলা খুব কাদছিল। কান্নার প্রধান কারণ, তাকে বিদায় জানাতে হেমাঙ্গ আসেনি। যথাসময়ে খবর পেয়েও আসেনি বা কোনও খবরও দেয়নি। তবে,শিয়েছিল অনেকেই। ভিড়ে ভিড়াক্কার।
হেমাঙ্গ লোকটাকে চয়ন খানিকটা বোঝে, রোমান্টিক, একা, ঝঞাট-ঝামেলা পছন্দ করে না। তার জীবনে একটা স্থায়ী ঝঞ্ঝাট সৃষ্টি করতে চেয়েছিল চারুশীলা। ভাল ভেবেই করেছিল। কিন্তু সিদ্ধান্তটা ছিল ভুল। চয়নের বরাবর মনে হয়েছে, হেমাঙ্গর সঙ্গে রশ্মি ঠিক খাপ খাবে না।
