লোকটি এ কথায় যেন একটু চিন্তিত হয়ে কৃষ্ণজীবনের মুখের দিকে চেয়ে রইল। মাত্র কয়েকদিন আগে লোকটির। সঙ্গে পরিচয়। পটলের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই। বছর দুই আগে চাকরি নিয়ে এসেছে। একটু আত্মভোলা, পড়ুয়া ধরনের মানুষ। আশ্চর্যের বিষয় এঁর লেখাপড়া এবং জ্ঞান বেশ বিস্ময়কর। সতীশ ঘটককে কৃষ্ণজীবনের ভালই লাগে।
সতীশ ঘটক ওপর-নীচে মাথা নেড়ে বলল, হিন্দি সিনেমা আর ভিডিওর অত্যাচারও কম নয়। মানুষগুলোকে বড় ভোতা করে দিচ্ছে। গ্রামে আজকাল চিন্তাশীল, সচেতন লোক নেই। একটা কালচারাল গ্যাপও ঘটে যাচ্ছে। আপনার মতো মানুষকেই গ্রামে দরকার ছিল। কিন্তু গ্রাম আপনাকে তো কিছুই দিতে পারবে না। না চাকরি, না মর্যাদা।
সতীশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কৃষ্ণজীবন উদাস গলায় বলল, আপনি জানেন না এই বিষ্টুপুর শীতলাতলা আমাকে কত দিয়েছে আমার জীবনের বোধটাই তৈরি হয়েছিল এখানে। কিন্তু আপনার কথাও মিথ্যে নয়। বিষ্টুপুর আজ আর আমাকে তেমন কিছু দিতে পারে না। তবু বিষ্টুপুর আমার সঙ্গেই থাকে, পৃথিবীর যেখানেই যাই বিষ্টুপুরের সঙ্গে মিলিয়ে সব কিছু দেখি। আপনাকে ঠিক বুঝিয়ে উঠতে পারব না।
আমি বুঝতে পারছি।
বিনয়ী মানুষটি উঠে পড়ল। বলল, আমরা স্কুল থেকে আপনাকে একটা সংবর্ধনা দিতে চাই। কবে আপনার সময় হবে?
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলল, না। সংবর্ধনা মানেই মানপত্র-টত্র তো! ওসব ভারী কৃত্রিম ব্যাপার। অনুষ্ঠানের দরকার নেই। যদি চান তো আমি একদিন ছাত্রদের মুখখামুখি গিয়ে বসব। কথা বলব।
সতীশ উজ্জ্বল হয়ে বলল, সেটাই ভাল হবে। একটা ডেট দিন। সবাইকে জানাতে হবে, ক্লাসে নোটিশ দিতে হবে।
কৃষ্ণজীবন বলল, কাল আমাদের গৃহপ্ৰবেশ। পরশু অবধি আমি আছি। পরশুই করুন।
সতীশ ঘাড় নেড়ে যে আজ্ঞে বলে চলে গেল।
কৃষ্ণজীবন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল বৈঠকখানায়।
এ বাড়িতে মমাজেইক-করা বৈঠকখানা হয়েছে, তাতে সোফাসেট সাজানো হয়েছে, রঙিন টি ভি এসেছে—এ সব প্রায় রূপকথার মতো। তবু হয়েছে। মিথ্যে নয়। এই পরিবর্তনটির কথাই ভাবছিল কৃষ্ণজীবন। তার অতীতের দারিদ্র্য, তার লড়াই, তার কষ্টের বড় হওয়ার ভিতর দিয়ে একটা সাফল্যের পরিণতি এসেছে। কিন্তু এটাকেই কি সফলতা বলে? দরিদ্র থেকে ধনী হয়ে ওঠা? অখ্যাতি থেকে খ্যাতির স্পষ্টতায় আসা? শুধু এইটুকু? কৃষ্ণজীবনের কাছে সফলতার সংজ্ঞা কিছু আলাদা। এখনও কত কী করার আছে তার। এখনও কত কাজ বাকি, কত সিঁড়ি ভাঙতে হবে তাকে। পৃথিবীর মুখ থেকে মৃত্যুর পাণ্ডুরতা যতক্ষণ দূর না হয় ততক্ষণ তার বিশ্রাম নেই, থামা নেই।
গৃহপ্ৰবেশ বড় করেই হচ্ছে। অনেক লোকের নেমন্তন্ন। টাকাটা কৃষ্ণজীবনই দিচ্ছে। এটুকু সে আজকাল পারে। ডার্লিং আর্থ বাবদে সে পনেরো লাখ টাকা পেয়েছে, আরও দশ-পনেরো লাখ এসে যাবে। দ্বিতীয় বইয়ের জন্য প্রকাশক আগাম দিচ্ছে শিগগিরই। কৃষ্ণজীবনের সামনে এখন অভাবিত ঐশ্বর্যের দরজা খোলা। তবু তার মন থেকে বিষণ্ণতা যায় না।
অভাব তাকে দুঃখী করে রেখেছিল ঠিকই, কিন্তু টাকা তাকে কখনোই সুখী করেনি। রিয়ার সঙ্গে এই টাকা নিয়েই অশান্তি হচ্ছিল। দিন কুড়ি আগে রিয়াকে পাঁচ লাখ টাকার চেক দিয়েছিল সে। রিয়ার মুখে হাসি ফুটল, সব অশান্তি দূর হয়ে গেল। টাকার এই আশ্চর্য শক্তি শুধু কৃষ্ণজীবনের ওপরেই কেন যে ক্রিয়াশীল নয়, কে জানে! টাকার খেলায় তার মাবাবা-রামজীবনের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। শুধু সে কেন পারল না খুশি হতে?
এ প্রশ্নটার জবাব খুঁজতেই যেন বেরিয়ে পড়ল কৃষ্ণজীবন। ডেকে নিল পটল আর গোপালকেও। সকালের আলোয় শীতের বিষ্টুপুরের কিছু শোভা আছে। নপাড়ার মজা দীঘি, বিষ্টুপুরই কত কি দেখাতে পারে। কৃষ্ণজীবনের রূপমুগ্ধ চোখদুটি আজও নষ্ট হয়নি।
পটল বলল, বড় জ্যাঠা, কোনদিকে যাবে?
যেদিকে খুশি চল।
হরিজ্যাঠার ওখানে খেজুরের রস পেড়েছে। খাবে?
কৃষ্ণজীবন হাসল, চল।
হরিহর গুড়ের কারিগর। মেলা খেজুরগাছ আছে তার। সুন্দর মেটেবাড়ি, নিকোনো দাওয়া।
হরিদা আছো নাকি? বলে কৃষ্ণজীবন হাঁক মারতেই হরিহর বেরিয়ে এল। গলায় কষ্ঠি, কপালে তিলক। গায়ে এই শীতেও একখানা বেনিয়ান মাত্ৰ।
ওরেব্বাস রে! কেষ্টবাবু যে! এসো, এসো!
সবই জানে, কৃষ্ণজীবন এখন মস্ত মানুষ। কতটা মস্ত তার আন্দাজ অবশ্য নেই। কিন্তু যার সঙ্গেই দেখা হয় সে-ই বিস্তার খাতির-টাতির করে। জ্যাঠার এই খাতির খুবই উপভোগ করে পটল। দেখ কেমন একখানা জ্যাঠা আমার! আছে তোমাদের এরকম?
হরিহর উঠোনে মোড়া আর জলচৌকি পেতে দিয়ে বসাল। তারপর রসের হাঁড়ি আর গেলাস এনে রস খাওয়াল। বলল, আজকাল তো আর আসা-টাসা হয় না? খুব নাকি বিলেত-টিলেত ঘুরে বেড়াও?
তা ঘুরি।
বেশ বেশ। আমাদের যে মনে রেখেছো এটাই ভাগ্যি। এক হাঁড়ি নতুন গুড় নিয়ে যেও এবার কলকাতায়। দিয়ে আসবখন।
রস খেয়ে তারা আবার বেরিয়ে পড়ে।
জ্যাঠা, তুমি এখনও খুব হাঁটতে পারো, না?
তা পারি।
তোমার সঙ্গে হাঁটায় পাল্লা দেওয়া কঠিন কাজ।
কৃষ্ণজীবন একটু হাসল।
খানিকক্ষণ বাদে পটল হঠাৎ বলল, জানো তো বড় জ্যাঠা, আজকাল আমি ক্লাসে ফাস্ট হই।
কৃষ্ণজীবন হঠাৎ থমকে গিয়ে বলল, তাই নাকি? কই, কেউ বলেনি তো আমাকে!
আমার লেখাপড়ার কথা বাড়িতে কেউ জানেই না। জিজ্ঞেসও করে না। দাদু কিছুদিন পড়াতো। আজকাল নিজেই পড়ি। হিমাদ্রি স্যার আমার রেজাল্ট দেখে কি বলেছে জানো? বলেছে, এও কৃষ্ণজীবনের মতো হবে।
