ব্যস! অমনি বিয়ে করে বসলি?
অত অবাক হয়ো না তো। ওরকম হয়। আমাদের সব সয়ে গেছে।
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, এটা কিন্তু ভাল নয়। বিয়ে কি এত সহজ? জলভাতের মতো? আমরা তো একটা বিয়ের কথা ভাবতেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে।
তোমার আবার সবতাতেই বেশি বেশি।
কী যেন বলছিলি?
সেই রোগা মেয়েটা এসেছিল না, সে কিন্তু খুব সুন্দর!
কোন রোগা মেয়েটা?
ঝুমকি গো!
হেমাঙ্গ একটা বিষম খেল। তারপর বলল, ওঃ, তাকে বুঝি তুই খুব সুন্দর দেখিস?
সুন্দর নয়?
হেমাঙ্গ ভাতটা নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, তাতে আমার কী?
ওকে তোমার পছন্দ নয়?
পছন্দ করে কী করব রে? সে তো আর আমাকে পছন্দ করেনি।
কী করে বুঝলে?
ওসব বুঝতে কি দেরি হয় রে।
তার বুঝি কেউ আছে?
থাকতেই পারে।
আমার মনে খুব ইচ্ছে, ওর সঙ্গে তোমার বিয়ে হোক। রশ্মিও খুব ভাল ছিল, কিন্তু বড্ড মেমসাহেবের মতো দেখতে। তাকে বুঝি তোর পছন্দ ছিল না?
ছিল। তবে কেমন যেন একটু বিলিতি গন্ধ। এ মেয়েটা কেমন আটপৌরে।
হেমাঙ্গ হেসে বলে, আটপৌরে মানে জানিস?
ওই কথার কথা একটা।
খাওয়া সেরে একটু উঠোনের রোদে চেয়ার পেতে বসে থাকে হেমাঙ্গ। বাসন্তী চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরে অবধিও তার কথাটা কানে বাজতে থাকে। হেমাঙ্গর। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাত্র।
চেয়ারে বসেই ভাতম্বুমে কিছুটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল সে। হিজিবিজি স্বপ্ন দেখছিল। তাদের বিডন স্ট্রিটের বাড়ির পাশেই নুটুবাবু বলে একজন থিয়েটারের লোক থাকে। পাড়ার লোকে বলে, নুটুবাবু নাকি মেয়ের দালাল। স্বপ্ন দেখল, সেই নুটুবাবু বিয়ে করে ফিরেছেন। সঙ্গে নতুন বউ নিয়ে গাড়ি থেকে নামছেন। হেমাঙ্গ দেখল। নতমুখী বউটি ঝুমকি। হেমাঙ্গ চেঁচাতে লাগল, ঝুমকি! পালিয়ে যান, এ লোকটা ভাল নয়! ঝুমকি তার দিকে চেয়ে একটু হাসল।
কে জানে কেন স্বপ্ন দেখে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল তার।
পরদিন সারাক্ষণ মনটা বিগড়েই রইল। একটুও ভাল লাগল না। বিকেলের দিকে কলকাতা রওনা হল সে।
সোমবার অফিস করে হঠাৎ অনেকদিন বাদে সোজা গাড়ি চালিয়ে চলে এল চারুশীলার বাড়ি।
যাক বাবা, এতদিনে আমাকে মনে পড়ল? দাঁড়া শাখ-টাখ বাজাই।
হেমাঙ্গ একটু হাসল, গরিবদের কথা ভাবিস তা হলে?
তুই গরিবদের চেয়েও খারাপ। তুই একটা ইডিয়ট।
তাও বটে, এখন ভাল-মন্দ কিছু খাওয়া তো!
কেন, ভালমন্দ খাওয়ানোর জন্য আমি কেন? বিয়ে করে বউ আনি, সে খাওয়াবে।
বউরা কি ভালমন্দ খাওয়ায়? ওরা তো আটপৌরে।
ইস, কথা শিখেছে! আটপৌরে!
হ্যাঁ রে, ঝুমকি কোথায় বল তো!
০৯৮. বিনীতভাবে নমস্কার
লোকটা বিনীতভাবে নমস্কার করে বলল, আপনি এই গ্রামের গৌরব বৃদ্ধি করেছেন, আমরা তার কী প্রতিদান দিতে পারি? কত সামান্য আমরা। এই গ্রামের কোনও গৌরব কখনও ছিল না। আপনার সুবাদে আজ আমরা বলে বেড়াই এ হল কৃষ্ণজীবন বিশ্বাসের গ্রাম।
কৃষ্ণজীবন অত্যন্ত অরন্তি বোধ করে বলল, গৌরব। গৌরবের কি আছে? আমি সামান্যই করতে পেরেছি। কত কী পারিনি।
আপনার কৃতিত্ব কতখানি তার পরিমাপ করার মতো শিক্ষাও তো এ গায়ের মানুষদের নেই। তারা শুধু জানে, কৃষ্ণজীবন বিশ্বাস এখন মস্ত মানুষ। তবে আমি আপনার বইখানা পড়েছি। মন্ত্ৰমুগ্ধ করে রাখে, মনটা যেন কেমন হয়ে যায়। অদ্ভুত আপনার ভাষা, তেমনি পর্যবেক্ষণ।
কৃষ্ণজীবন খুশি হয়ে বলল, আমার বই আপনি কোথায় পেলেন? এ দেশে তো বিশেষ পাওয়া যায় বলে শুনিনি।
লোকটি অমায়িক হেসে বলে, পেপারব্যাক এডিশন বেরোলে হয়তো আসবে। এখনও আসেনি। তবে আমার এক ভাগ্নী নিউ জার্সিতে থাকে। তাকে আপনার বইটির কথা লিখেছিলাম। সে নিয়ে এসেছিল।
একটা তৃপ্তির শ্বাস ছাড়ল কৃষ্ণজীবন। সে খ্যাতি চায় না, প্রচুর টাকাও করতে চায় না, সে চায় তার কথা লোকে শুনুক, বুঝুঁক। সে তো এই পৃথিবীর মঙ্গল চায়, মানুষের জন্য চাষ একটি সবুজ দূষণমুক্ত পৃথিবী। সে চায় দোলনের নিরাপদ বড় হওয়া। ভাবীকালের মানুষেরা যেন তাদের অভিশাপ না দেয়।
লোকটি বলল, আপনার বাবাকে গত তিন দিন ধরে আমি বইয়ের বিভিন্ন অংশ অনুবাদ করে শুনিয়েছি। উনি খুব খুশি হয়েছেন।
কৃষ্ণজীবন আবেগে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। বাবাকে যে এ বইটির কিছু অংশ শোনানো দরকার এটাই তার মনে হয়নি। সে গাঢ় কণ্ঠে বলল, বড় ভাল করেছেন। কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো।
কী যে বলেন। এই বইটির কথা আমি অনেককে বলেছি। কিন্তু গ্রামের লোক তো ইংরিজি পড়তে পারে না। আপনি বরং এর একটা বাংলা ভাষ্য বের করুন।
কৃষ্ণজীবন ম্লান হেসে বলে, বাংলা এডিশন বেরোলেও গ্রামের লোক পড়বে না। প্রথমত, তাদের বই পড়ার অভ্যাস নেই, দ্বিতীয় তাদের বই কেনার মতো সামর্থ্য নেই।
লোকটি মাথা নেড়ে বলল, ঠিক কথা। তবু বলি, ধীরে ধীরে এই বইয়ের কদর বাংলাতেও হবে। আমাদের গ্রামগুলোতে সভ্যতার কোনও খবরই পৌঁছতে চায় না। বড় পিছিয়ে আছে সব কিছু। তবু যদি লাইব্রেরিতে এক-আধ কপি করে রাখা হয় তা হলে এক-আধজনও তো পড়বে।
কৃষ্ণজীবন একটু হেসে বলল, আপনি এই বইয়ের প্রচার নিয়ে ভাববেন না। এ দেশের লোক আজ পর্যন্ত কারও কোনও শিক্ষাই নেয়নি। আমারটাও নেবে না। ভাল কথা শোনে, বুঝতেও পারে, কিন্তু কাজের সময় পাশ কাটিয়ে যায়।
লোকটি বিনীত হেসে বলে, তবু কি হাল ছাড়লে চলবে?
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমার প্ল্যান কী ছিল জানেন? গান, যাত্রা, নাটক কবিগানের ভিতর দিয়ে এ সব মানুষকে শেখাবো। গাছ কেটো না, পৃথিবীকে দূষণমুক্ত রাখে। কিন্তু পরে হাল ছেড়েছি। দেখলাম এরা এন্টারটেনমেন্টটা নেয়, শিক্ষাটা সাবধানে মাছের কাঁটার মতো বেছে ফেলে দেয়।
