হেমাঙ্গ একটু হেসে বলল, তুই বোধ হয় দাঁত মাজতে গিয়ে পেস্ট একটু খেয়েও ফেলিস!
লজ্জা পেয়ে বাসন্তী বলে, দু-একবার কি আর গিলে ফেলিনি। তবে ব্ৰাশে বাপু মুখে রীড় জ্বালা করে প্রথমটায়। ছড়ে গিয়েছিল। এখন অবশ্য সয়ে গেছে। মুড়ি এনেছি, এই দেখা। সকালে ভাজিয়ে আনলাম সুবাসীর বাড়ি থেকে।
এই বলে একটা প্ল্যাস্টিক ব্যাগ তুলে তাকে দেখায় বাসন্তী।
হেমাঙ্গ নিষ্পৃহ গলায় বলে, চা কর।
লহমায় চা করে নিয়ে এল বাসন্তী। সঙ্গে গরম মুড়ি, একটু তেল আর আদাকুচি দিয়ে মাখা, ওপরে কয়েক দানা বাদাম ছড়ানো। বাসন্তী রোজ সকালে তার সামনে বসে চা খায় আর আগড়ুম-বাগাড়ম বকে।
তোমার মুখখানা আজ শুকনো দেখাচ্ছে কিন্তু দাদা।
হেমাঙ্গ গভীর চিন্তামগ্ন ছিল, বলল, হুঁ।
আজি কী খাবে বলো তো!
খাওয়ার এখনও দেরি আছে। অত তাড়া দিস না।
জোগাড়যন্তর তো করতে হবে। ফুলু বেলা দশটা নাগাদ মাছ দিয়ে যাবে। শুধু মাছের জোল আর ভাত করলে হবে? সঙ্গে একটা ভাজাভুজি করে দেবোখন। হবে? বলো না!
খুব হবে।
বাসন্তী উঠে গেল। তার অনেক কাজ এখন। বাটপাট, বাসন মাজা, নিকোনো, বিছানা তোলা। বাসন্তী গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে কাজ করে, দাওয়ায় বসে শুনতে পায় হেমাঙ্গ। ধীরে ধীরে উঠে সে চটিটা পরে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। ইট বাধানো বিচ্ছিরি ভাঙাচোরা রাস্তাটা ধরে সে গায়ের মধ্যে খানিকটা হেঁটে যায়। যত দিন যাচ্ছে তত লোক বাড়ছে। বছরটাকের মধ্যে ঘাটপাড়ে নুন নতুন কয়েকটা দোকান হল। খুবই দীন দোকান। তবু তো দোকান। মানুষ বাড়ছে, ফাঁকা জায়গা ভরাট হচ্ছে, অরণ্য বা চাষের জমি কেড়ে নিচ্ছে মানুষের বসত। আর রুজিরোজগার। কৃষ্ণজীবন লড়াই করছেন বটে, লড়াইটা থেকে যাচ্ছে ওপর মহলে। এখনও সেই লড়াইয়ের কোনও প্রভাব এসে পড়েনি এলাকার এইসব মানুষের জীবনযাপনে।
হাঁটতে হাঁটতে বসতি ছাড়িয়ে পতিত জমি আর আগাছার জঙ্গলে এসে পড়ল হেমাঙ্গ। নিত্যই সে নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করে। একটা করে নামও দেয়। তারপর সেই দেওয়া নাম ভুলেও যায়।
ভাঙাচোরা জমি হঠাৎ খাদের মতো ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। নিচে ক্ষয়া জমি, ঘাসপাতা, কিছু অখ্যাত গাছ। তেমন শ্ৰী নেই জায়গাটার। তবু সকালের রোদের ঐশ্বর্যের কিছু ঝলমল করছে। ঢালুর ধারে একটু ঘাস-জমি খুঁজে নিয়ে সাবধানে বসিল হেমাঙ্গ। আজকাল সে আর সুন্দর জায়গা খোজে না, হতশ্ৰী জায়গাতেও সৌন্দর্যের সন্ধান করে। আজকাল এটাই তার হবি। তার জগৎ অনেক বড় হয়েছে।
পাখি ডাকছে। একটা ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে উত্তর থেকে। আজ হেমাঙ্গর মন ভাল নেই। আজ হোক, কাল হোক, তাকে ঘরবন্দী করার চেষ্টা একদিন ফলবতী হবেই হয়তো। নিজেকে সে আর বিশ্বাস করে না। রশ্মির প্রেমে পড়ে বিয়ে প্রায় করেই ফেলেছিল। আর কি। কী যে হত তা হলে! ভাগ্যিস রশি বিলেতে ফিরে যাওয়ার বায়না ধরেছিল। ওই শর্ত উপেক্ষা করলে আজ রশ্মি তার বউ হয়ে যেত। কোথায় থাকত। তার এই স্বাধীনতা?
থেকে থেকে একটা বিশ্ৰী পচা গন্ধ আসছিল। বেড়াল কিছু একটা মরে পচছে কোথাও কাছেপিছে। এই গন্ধটার মধ্যে কোনও সৌন্দর্য আবিষ্কার করার চেষ্টা বৃথা। গৌ ধরে খানিকক্ষণ বসে থেকে উঠে পড়ল সে। হাঁটতে হাঁটতে নদীর বঁধে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নদী তার অদ্ভুত লাগে।
পৃথিবীর সব সভ্যতা, সব বড় বড় নগরের পত্তন হয়েছে কোনও না কোনও নদীর ধারে। নদী ছাড়া কোনও মহানগর নেই। কারণটা হয়তো নৌবাহনের সুবিধে। কিন্তু নদী হেমাঙ্গকে পাগল করে দেয়। নদীর ধারে এসে দাঁড়ানোমাত্র তার চোখ দুটো মুগ্ধ আর নিষ্পলিক হয়ে গেল।
মন কেন ভাল নেই তার? কিছুতেই বুঝতে পারছে না হেমাঙ্গ। ইদানীং মাঝে মাঝে এটা হয়। মনটা কেমন বিগড়ে বসে থাকে। খুব অস্থির আর হতাশ লাগে তখন। কারণ ছাড়া কিছুই হয় না। মন খারাপেরও কারণ একটা আছেই। কিন্তু কেন, ধরতে পারে না হেমাঙ্গ?
ঘুরে ঘুরে, অনেকটা হেঁটে, অনেকের সঙ্গে কথাটথা বলে সে যখন ফিরল। তখন রান্না সেরে হা করে বসে আছে
এই তোমার ফেরার সময় হল? কটা বাজে বলো তো! দেড়টা। এর পর কখন চান করে খাবে? অবেলা হয়ে যাবে না?
হেমাঙ্গ একটু হাসল, অত হুড়ো দিস না। ছুটির দিনটা একটু আমার মতো থাকতে দে।
আমার খিদে পায় না নাকি?
খেলেই পারতিস।
ও-বাবা! তোমার খাওয়া হয়নি। আর আমি রাঙ্গুসী গিলতে বসব? যাও চান করে এসো গে।
একটু চা খাওয়াবি না?
চা? উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। বউ হলে তাকে জ্বালিয়ে খাবে বাপু।
বাসন্তী চা করে দিল অবশ্য। স্নান করে আসার পর ভাত বেড়ে দিল। তারপর বলল, হ্যাঁ দাদা, আমার কিন্তু একজনকে খুব পছন্দ।
অন্যমনস্ক হেমাঙ্গ মুখ তুলে বলল, কাকে পছন্দ হল আবার? তোর তো এখন একটা বর আছে।
আহা, আমার কথা বললাম নাকি?
তবে কার কথা?
তোমার কথা গো! তোমার জন্য একটা পাত্রী আমার পছন্দ হয়েছে খুব।
যাক বাবা। আমি ভাবলাম তোরই বোধ হয়। আবার কাউকে পছন্দ হল!
আমার কথা বাদ দাও। এই মরদটাও দেখো, কিছুদিন পরই পিঠটান দেবে। ভাবগতিক ভাল নয়। কাজকর্মও তো নেই। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা সারা দিন।
ওরকম লোককে বিয়ে করলি কেন?
না করে কী করব? কোন জজ-ব্যারিস্টার জুটবে এই পোড়া কপালে? এ-সবই জোটে এসে।
ঘরামী না কী যেন বলছিলি!
ঘরামীই। কিন্তু কোজ নেই হাতে।
কোথা থেকে জোটালি?
ঘাট পেরোনোর সময় ভটভটিতে আলাপ হয়েছিল।
