ও বােঝানাে যায় না, আপনি বুঝতে হয়।
তা বটে । আমাদের বুঝও যে বড় কম। তবে আপনার বড্ড বেশি।
আমার গায়ের বাস তো মার কাছে লাগিয়ে ভাঙিয়ে প্রায় তুলেই দিয়েছ তুমি। এর পর আরও কি চাও?
গাঁয়ের বাস তুলে দিচ্ছি আপনার ভালর জন্যই। এর পর একেবারে লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যাবেন যে! গায়ের লোক আপনাকে আড়ালে কি বলে জানেন ? বলে পাগলবাবু, অবশ্য আদর করেই বলে, আপনার ওপর কারও কোনও খার নেই। তবে ওসব শুনতে কি আমার ভাল লাগে, বলুন!
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমি তো পাগলই। লোকে যখনই জীবনের সবচেয়ে সত্য বস্তুর সন্ধান পায় তখনই কি করে যেন লোকের চোখে পাগল বা ক্ষ্যাপা বলে মনে হয় লোকটিকে।
তা সে লোকে যাই বলুক আমার কিছুই যায়-আসে না।
আরও একটা কথা । আপনার বাড়ির লোকের ধারণা হয়েছে, আপনি এই গাঁ-গঞ্জেই একটা বিয়েশাদি করে বসবেন। হয়তো। তা হলে ষোলো কলা পূর্ণ।
হেমাঙ্গ একটু অবাক হয়ে বলে, তুমি এটাও মাকে বুঝিয়েছ নাকি ? তুমি তো মহা বিপজ্জনক লোক!
জিব কেটে বাকা বলে, মিছে কথা বলব আপনার নামে ? ওসব নষ্টামো করতে যাব কেন ? কিছু বলিনি। তবে আপনাকে একটা বিষয়ে একটু সাবধান করে দিই। নগেন সামন্তর মেয়েটা বড্ড ঘুরঘুর করছে আজকাল। অত আসকারা। দেবেন না।
পারুল! সে তো পড়তে আসে মাঝে মাঝে।
বয়সের মেয়ে, বুঝলেন না! গা-গঞ্জ জায়গা, পাঁচটা কথা উঠে পড়বে।
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, সে তো বাচ্চ মেয়ে! তোমরা কিরকম মানুষ বলে তো! ওটুকু মেয়েকে নিয়েও কথা হয়?
টুকু আবার কি? ষোলো বছর বয়স হল।
ধুস! বারোর বেশি হতেই পারে না।
আপনার কি দেখার চোখ আছে? অতি উদাস থাকলে ওরকমই হয়। ও মেয়ের বয়স পনেরো পুরে এই ষোলো চলছে। সন্ধের পর টর্চ বাতি নিয়ে পড়তে আসার অত কি গরজ? আর পড়া মানে তো হয় করে আপনার মুখের দিকে চেয়ে থাকা। আপনি আর ওসব একদম ঘাড়ে নেবেন না।
হেমাঙ্গ একটু অসহায়ভাবে চুপ করে রইল। পারুল তার কাছে পড়তে আসছে মাত্র মাসখানেক হল! তাও সপ্তাহে মাত্র দুদিন, শনি আর রবিবার, হেমাঙ্গ এখানে আসে; নগেন সামন্ত নিজেই নিয়ে এসে বলেছিল একদিন, বাবু, আমার মেয়েটা লেখাপড়ায় ভাল। সবাই বলে, মাথা আছে। ক্লাসে ফাস্টও হয়। যদি আপনি একটু দেখিয়ে দেন তাহলে আরও ভাল করবে।
সেই থেকে একটু করে পড়ায় হেমাঙ্গ; মেয়েটার মাথা সত্যিই ভাল। গাঁয়ে-গঞ্জে–কে জানে কেন–ছেলেমেয়েদের মধ্যে লেখাপড়ার চাড় এবং মেধা নেই। এই মেয়েটার আছে দেখে হেমাঙ্গ একটু উৎসাহ বোধ করেছিল। পারুল দেখতে খুব সাদামাটা গেয়ো আর পাঁচটা মেয়ের চেয়ে সামান্য আলাদা চেহারার। চোখে বুদ্ধির দীপ্তি আছে। কিন্তু তার বয়স এতই কম যে তাকে পুরুষের চোখ দিয়ে কখনও লক্ষই করেনি হেমাঙ্গ।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভুলটা আমারই। গায়ের মেয়ের বয়স আর শহরের মেয়ের বয়সের যে আলাদা হিসেব সেটা মনে ছিল না, বুঝলে বাকা?
আপনার বরাবরই হিসেবের ভুল। অথচ আপনি নাকি হিসেবের ওস্তাদ।
হেমাঙ্গ একটু ভয়ে ভয়ে বলে, গায়ে কি পারুলকে নিয়ে কথা উঠেছে নাকি? না আমাকে ভয় দেখোচ্ছ?
বাঁকা মিঞা ঘাড় চুলকে বলল, কথাটা ওঠেনি, তবে উঠে পড়বে। আমি আপনাকে আগাম একটা হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখলাম। সামন্তকেও বলে দিয়েছি যেন বাবুকে আর ডিস্টার্ক করা না হয়।
হেমাঙ্গ হেসে বলল, তুমি আমার মাকেও ছাড়িয়ে গেলে দেখছি।
আমি হলাম। আপনার লোকাল গার্জেন। ঠাকরুন। তাই বলে দিয়েছেন।
তা হলে তো কথাই নেই।
আপনি কিন্তু আমার প্রথম কথাটার জবাব দেননি। বলছি এ ভাবেই কি চলবে। সাধা-সন্ন্যাসীই হয়ে যাবেন শেষ অবধি?
তা আর হতে পারলাম। কই। সাধুরা তো জপতপ করে, আমি তো তা করি না। আমি শুধু পৃথিবীটা দেখি! চার দিকে কত রূপ বলো তো! ছোট্ট একটা পোকা, একটু ফুল, একটা পাতার মধ্যেও কত সূক্ষ্ম মেকানিজম আর এসথেটিক্স! তুমি দেখতে পাও না?
তা পাই, তবে আপনার মতো অমন মজে যাই না। শুধু দেখে বেড়ালে কি জীবন চলে? এবার একটু সংসারী হওয়ার কথাও ভাবুন।
হেমাঙ্গ শুধু হাসল, কিছু বলল না। বাঁকা মিঞা আরও কিছুক্ষণ সদুপদেশ দিয়ে উঠে গেল। লোকটা যে তাকে ভীষণ ভালবাসে তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু ওর ভালমন্দের বোধটা অন্যরকম।
গতকাল শুক্রবার ছিল। অফিস থেকে দুপুরবেলা বেরিয়ে সে সোজা চলে এসেছে। এখানে; এখানে যেন গাছপালা, পোক-মাকড়, বাতাসটা অবধি তার জন্য অপেক্ষা করছিল। এসব কথা সে কাকে বোঝাবে? এখানে আকাশে মেঘ ও রৌদ্রের খেলা, জলের লহরী, পাতার কোপন, উড়ন্ত পোকার পাখনায় আলোর বর্ণালী সে ছাড়া আর কে দেখবে? এখানে এসে সে কত শিখেছে, কত কি বুঝতে পেরেছে, অনুভূতি হয়েছে কত সূক্ষ্ম! তাকে কেন পাগল ভাবে লোক?
নতুন শীতের সকালবেলার রোদ চাঁদরের মতো বিছিয়ে পেতে দিয়ে গেছে কে। সেই চাঁদরে গাছপালার ছায়ার নানা নকশা। উঠোন নিকোনো, তকতকে। এ সবই করে বাসন্তী।
বাসন্তীর কথা ভাবতে ভাবতেই বাসন্তী চলে এল। একদিন বাসন্তীকে বলেছিল। হেমাঙ্গ, হ্যাঁ রে, অত নোংরা। উলোকুলো হয়ে থাকিস কেন? পরিষ্কার থাকতে পারিস না? সেই থেকে বাসন্তী এখন ফরসা শাড়িই শুধু পরে না, চুল বঁধে, মুখে বোধ হয় পাউডারও দেয়, তারপর আসে।
আজ এসেই বলল, ও দাদা, গত সোমবার থেকে ব্রাশ আর পেষ্ট দিয়ে দাঁত মাজছি, তা জানো? কী ভাল গো স্বাদটা! মুখটা যেন মিষ্টি হয়ে যায়।
