আপাতত আপা কলকাতার ভিখিরিদের জীবনী লিখছে। সেটা একটা কাণ্ডই। লাল কাপড়ে বাধাই খেরোর খাতা সবসময়ে তার সঙ্গে থাকে। ফুটপাথে হাঁটু গেড়ে বসে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিখিরিদের সাক্ষাৎকার নেয় এবং তা যত্ন করে টুকে রাখে। মাঝে মাঝে টেপ রেকর্ডারও ব্যবহার করে বটে, কিন্তু মাইক মুখের সামনে ধরলে অধিকাংশ ভিখিরিই ঘাবড়ে যায় বলে সেটা ব্যবহার করে খুব কম। বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে একটা বুড়ো ভিখিরিকে আপা বাবা বলে ডাকে। জীবনীসংক্রান্ত নোট তার অনেক জমেছে। আপার ইচ্ছে ছবিসহ বইটা আমেরিকা বা ইংলন্ড থেকে বেরোবে। খুব বিক্রি হবে। তার রয়্যালটি থেকে সে ভিখিরিদের জন্য একটা প্ৰাসাদ বানাবে ইস্টার্ন বাইপাসের কাছে কোথাও।
নাসা এবং রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা প্রকল্পে একটা প্রস্তাব উঠেছিল, বন্ধু দেশের কতিপয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষকে মহাকাশে ঘুরিয়ে আনবে। সেই প্রকল্পে নিজের নাম নথিভুক্ত করার জন্য আপা বিস্তর লেখালেখি করেছে। কোনও আশাব্যঞ্জক জবাব পায়নি। সে শিখতে চায় এয়ারো ডায়নামিকস। নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে-অৰ্থাৎ কেরিয়ার নিয়ে আপা চিন্তিত নয়। সে শুধু চায় পৃথিবীর সামনে ভারতবর্ষকে তুলে ধরতে। ভারতবর্ষের দারিদ্র্য, আধ্যাত্মিকতা, ভারতের বিচিত্র মানুষ ও ইতিহাসকে। আপা সংস্কৃতকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী। এ নিয়ে সে কাগজে কাগজে চিঠি লেখে। কয়েকটা চিঠি ছাপাও হয়েছে।
আপার সঙ্গ খুবই পছন্দ করে অনীশ। ওর কোনও সেক্স অ্যাপিল নেই এবং ওকে মেয়ে বলে না ভাবলেও চলে। ভাবেও না অনীশ। শুধু আজকাল, আই সি এস ই পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর থেকে তার একটু আফসোস হয়, আপার কাছে দু নম্বরের জন্য হেরে যাওয়াটা তার পৌরুষের পক্ষে অপমানজনক।
চার দিন ক্লাশে যায়নি অনীশ। সবাই জানে, তার বাবার অসুখ। আজ পাঁচ দিনের দিন দুপুরে আপা নার্সিং হোমে এসে হাজিরা। সঙ্গে ক্লাসের আরও পাঁচটি ছেলেমেয়ে। সুমিত সিং, অৰ্চনা হায়দার, রোশন, পিটার, রচনা। অনীশ সকালে আসছে না। সকালে উঠতে তার দেরি হয়। আসে দুপুরে, বিকেলে আর মাঝে মাঝে রাতেও।
মণীশকে রাখা হয়েছে ইনটেনসিভ কেয়ারে। সেখানে ঢোকা বারণ। তবে কাচের পার্টিশন দিয়ে শায়িত বাবাকে দেখতে পায় অনীশ। হু-হু করা বুক নিয়ে সে দেখে। চব্বিশ ঘণ্টা মনিটরিং-এ রয়েছে তার বাবা। কথা বন্ধ, নড়াচড়া বন্ধ। শুধু ওষুধ দিয়ে নিরন্তর ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়।
বেশীর ভাগ সময়ে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে অনীশ। আর ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর নেয়। বাবাহীন পৃথিবী কি সে সহ্য করতে পারবে? বাবা ছাড়া বেঁচে থাকাটার কি মানে থাকবে কোনও? আজকাল এই একটি চিন্তাতেই তার মাথা ভার হয়ে থাকে। মাইনাস বাবা এই পৃথিবীর, এই জীবনের কোনও বর্ণ, কোনও স্বাদ থাকবে না। বড় নিঃসঙ্গ লাগবে তার। ভীষণ একা। ভয় করবে।
পাশ করার পর ইদানীং তার বাবা তাকে মাঝে মাঝে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করছিল, ইউ আর কোয়াইট এ ইয়ংম্যান নাউ। এনি গার্ল? ইজ দেয়ার এনি গার্ল?
না বাবা, নো গার্ল।
মণীশ ভ্রূ কুঁচকে চিন্তিতভাবে বলে, সাম ডে এ গার্ল মে টেক এ প্লেস ইন ইওর লাইফ। এ ভেরি ইস্পট্যান্টি প্লেস। চুজ হার ইওরসেলফ। বাট বি চুজি। ভেরি ভেরি চুজি।
কিন্তু অনীশের জীবনে এখনও সেই অর্থে কোনও মেয়ে বা মহিলা নেই। তার দিগন্ত কেউ আড়াল করে দাঁড়ায়নি। তার অনেক অনেক মেয়ে-বন্ধু আছে। সম্পর্ক খুবই সহজ, জটিলতাশূন্য।
এ সব প্রসঙ্গ উঠলে তার মা একটু রাগ করে, কেন এখনই ওসব ওর মাথায় ঢোকাচ্ছে বলো তো? ও তো বলতে গেলেও এখনও দুধের শিশু।
মণীশ গম্ভীর হয়ে বলে, প্ৰাপ্তে তু ষোড়শবর্ষে পুত্রমিত্রবদাচারেৎ। আমি চাই আমার ছেলে আমার কাছে জলের মতো সহজ হোক, তাতে কমপ্লিকেশনসের ভয় থাকবে না। অধিকাংশ বাবাই এটা না বলে জেনারেশন গ্যাপি তৈরি হয়।
মায়েরা কখনও বোঝে না। এসব। তার মা এখনও ছেলের শৈশব আঁকড়ে পড়ে আছে। তাই তর্ক করে বাবার সঙ্গে।
বাবাকে আকণ্ঠ ভালবাসে অনীশ। এত ভালবাসে যে, তার মনে হয়। বাবা মরে গেলে তাকেও হয়তো আত্মহত্যা করতে হবে।
বন্ধু ও বান্ধবীরা যখন দুপুরবেলা আচমকা এসে হাজির হল, তখন নিঃসঙ্গ অনীশের মনে হল, এদের সঙ্গে তার দেখা হল দু হাজার বছর পর। কতকাল দেখেনি ওদের! এত একা, এত মৃত্যুহিম, এত অসহায় লাগছে নিজেকে যে, অনীশ নিজেকে দেখে নিজেই অবাক!
নার্সিং হোমের লবিটা বিরাট বড়। দুপুরবেলা একটু ফাঁকা। তারা বসে গেল। বন্ধুদের মুখ সময়োচিত গভীর। অনীশ শুকনো মুখে বলে, প্লীজ স্মাইল এ বিট। আমি একটু হাসিমুখ দেখতে চাই।
বাস্তবিক ওদের মুখের গাম্ভীর্য–যতই কৃত্রিম হোক–সহ্য হয় না। অনীশের। চারদিকটা শোকার্ত হয়ে পড়লে সে যে জোর পায় না।
বন্ধুরা একটু হাসল। তবে জোর করে। একটু সাহস-টাহস দিল। সুমিতের বাবা মস্ত হাৰ্ট স্পেশালিস্ট। তবে এখন আমেরিকায় গেছেন একটা কনফারেন্সে। সুমিত মুখে আফসোসের শব্দ করে বলল, ড্যাডি আমেরিকায় না গেলে আমি ড্যাডিকে নিয়ে আসতাম। এনিওয়ে অল বিগ ফিজিসিয়নস আর হিয়ার। নো ওরি।
একটু পড়াশুনোর কথা হল, একটু খেলাধূলার কথা হল, একটু পপ মিউজিকের কথা হল। তারপর আপা ছাড়া সবাই চলে গেল।
আপা বলে, তুমি কিছু খাওনি অনীশ? লানচ্?
লানচ্-ফানচ্ এখন মাথায় উঠেছে। খিদে পেলে—অর্থাৎ খুব খিদে পেলে দুটো কলা বা বিস্কুট খেয়ে নিই।
