ঝুমকি অবাক হয়ে বলে, বিয়ে? এখনই কিসের বিয়ে?
এটাই তো বয়স।
তোমার আমলে ছিল। এখন নয়।
তোর কোনও অ্যাফেয়ার নেই তো?
ঝুমকি লাল হয়ে বলল, থাকলে টের পেতে না?
না। তুই ভীষণ চাপা।
কাজ করতে দাও তো। বড্ড জ্বালাও।
আমাকেও বলবি না?
অ্যাফেয়ার নেই মাসি।
বাজে কথা। তুই বলছি না।
তোমার কাছে কি কিছু লুকোই?
চারুশীলা অন্য প্রসঙ্গে চলে যাওয়ায় সাময়িক রেহাই পেয়ে গেল ঝুমকি। কিন্তু দুদিন বাদে আবার কথাটা উঠল। ঝুমকি বড্ড অস্বস্তি বোধ করে প্রসঙ্গটা উঠলেই।
একদিন চারুশীলা করুণ মুখ করে বলল, জানিস আমি আমার ওই পাগল ভাইটাকে বড় ভালবাসতাম। যতই গালাগাল করি আর বকি-ঝকি ওর মতো সাদা মনের মানুষ হয় না। কিন্তু ও বোধহয় সন্ন্যাসী-টন্ন্যাসীই হয়ে যাবে শেষ পর্যন্ত।
ঝুমকি অবাক হয়ে বলে, কেন মাসি।
তা যদি জানতুম তা হলে তো হতই। রশ্মি বিয়ে করেছে বলেই কি না জানি না, ও যেন কেমন বারমুখখা আর উদাসীন হয়ে গেছে।
ঝুমকির বুকটা ধক ধক করছিল। বলল, ওঁদের মধ্যে কি খুব ভালবাসা ছিল মাসি? আমার তো মনে হয় না।
আমারও তা মনে হয় না। হেমাঙ্গ তো চিরকাল মেয়েদের ব্যাপারে উদাসীন। তবে কি জানিস, হয়তো রশ্মির বিয়েটা ওর পৌরুষে ধাক্কা দিয়েছে। তাই ওরকম হয়ে গেছে। মানুষের ভিতরের কথা কে জানতে পারে বল।
তুমি ভাল করে খোঁজ নাও। এত অনুমান কররা কেন?
কি করে খোঁজ নেবো বল তো। হেমাঙ্গ তো কলকাতায় থাকেই না। কখনও হিল্পি-দিল্লি করে বেড়ায়, কখনও গায়ে গিয়ে বসে থাকে। আজকাল নাকি চাষবাস করছে, মাছ ধরছে, আরও কি কি সব করছে। কিছু বুঝতে পারছি না।
ঝুমকি একটু চুপ করে থেকে বলল, ওসব করা তো খারাপ নয়।
কে জানে কী! তবে হেমাঙ্গ বড় পাল্টে গেছে। গত শনিবার এসেছিল । মুখে হাসি নেই, কথাবার্তা নেই। এমন কি ভাল করে খেল না অবধি।
ওঃ। বলে ঝুমকি চুপ করে থাকে।
হেমাঙ্গর সঙ্গে তার আর কবে দেখা হবে তা জানে না ঝুমকি। কখনও দেখা হবে কি? মাঝে মাঝে তার মনে হয়, জীবনের নানা স্রোত ফেনা, ঘটনা বা ঘটনাহীনতার ভিতর দিয়ে হেমাঙ্গ বহু বহুদূর সরে যাচ্ছে। সে কি কখনও জানবে বা টের পাবে যে একজন হৃদয় তার জন্য অপেক্ষা করে।
মুখ ফুটে কখনও বলতে পারবে না ঝুমকি। কখনও নয়। কাউকে নয়। কিন্তু হৃদয়ের কথা কি পৌছয় না তবু?
০৯৭. পৃথিবীর রূপের জগৎ
সে বুঝতে পারছে ধীরে ধীরে এই পৃথিবীর রূপের জগৎ তার চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে! খুব ধীরে ধীরে। অফিস আর বাড়ি, টুর আর টাকা তাকে ক্রমে ক্লান্ত করে দিচ্ছিল। টাকার কুমিরদের সঙ্গে দিন-রাত ফন্দি-ফিকির করতে করতে নিজেকে প্রায় কবর দিয়ে ফেলছিল হেমাঙ্গ। সেই কবর থেকে জীবনের ভার সরিয়ে সে কি একটু একটু করে উঠে আসছে রােদে আর হাওয়ায়? এ কি তার উত্থান ? লোকে বলছে, এ তার অধঃপতন, লোকে বলছে, এ তার পাগলামি ! একটা লম্বাটে ক্যাটারপিলর গোত্রের সরীসৃণ পোকাকে পেয়ারা গাছের ডালে আর পাতায় অনেকক্ষণ ধরে অনুসরণ করছিল তার। চোখ। সবুজ রঙের পােকাটার শুধু দেহযন্ত্রটা লক্ষ করতে করতে বিস্ময়ে বুদ হয়ে যাচ্ছিল সে। কত সূক্ষ্মাতিসূম ইন্দ্রিয়ের সমাবেশ কত স্বচ্ছ ও শৌখিন তার চামড়া। শুধু শরীরই তো নয়, ও তুচ্ছ পোকাটারও আছে বিপদ আঁচ করার অ্যান্টেনা, আছে জৈব অনুভূতি, আছে ক্ষুধা ও প্রজনন, হয়তো আছে সন্তান পালন করার মতো দায়। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এইসব পােকামাকড়কে যত দেখে সে ততই সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর এই জগৎ তাঁর কাছে উন্মােচিত হয়। এর পরও আছে জীবাণুরা, অনুবীক্ষণ ছাড়া যাদের দেখাই যায় না। অথচ জীবাণুরও আছে ইন্দ্রিয়সকল, আছে বংশবিস্তার, আছে নিজস্ব জগতের অনুভূতি। কি করে এটা হয় ? কে ঘটায় এই সময় ? কে আছে এই মরকোচ বা মেকানিজমের পিছনে ? এই রহস্যের কুলকিনারা না পেয়েই কি মানুষ অবশেষে ঈশ্বর নামক অলীককে কল্পনা করে নিয়েছিল ?
অলীক! হবেও বা। তবে হেমাঙ্গ আজকাল এত সহজে কিছুই উড়িয়ে দিতে পারে না। আজকাল সে নদীর ধারে বসে কত ভাবে। কত আকাশ-পাতাল চিন্তা করে। কোথাও পৌঁছায় না তার চিন্তা, কিন্তু হেমাঙ্গর তাড়া নেই। পৌছানাে কি একান্ত দরকার ? থাকুক না কিছু অধরা!
আজকাল আসতে হয় উইক এন্ডে। গাঁয়ে বেশি পড়ে থাকলে বিপদ আছে। মা রাগ করে। ছেলে বিবাগী হয়ে যাচ্ছে এই ভয়ে মা কোমর বেঁধে লেগেছে তাকে গৃহবাসী করতে। পাত্রী দেখা চলছে খুব।
হেমাঙ্গ মাঝে মাঝে একা একা হাসে। তাকে পাত্ৰীস্থ করে কোনও লাভ হবে কি ? বরং বউ হয়ে যে আসবে সেই মেয়েটা কষ্ট পাবে। হেমাঙ্গ কি সংসারী হতে পারবে কখনও? জগতের বিশালত্বে সে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে, এই ছড়ানাে হেমাঙ্গকে কি আর গুটিয়ে এনে ছােট্টো কৌটোর মতো সংসারে পুরে রাখা যাবে ? তা হলে কি বাচবে হেমাঙ্গ ?
বাঁকা মাঝে মাঝে তার কাছে এসে বসে থাকে। খুব ঠাহর করে লক্ষ করে তাকে। সতর্ক চোখে তাকে জরিপ করতে করতে বলে, সন্নিসী হওয়াই কপালে লেখা আছে আপনার।
তাই নাকি? তা নয় তো কি ?
এ ঠিক সন্ন্যাস নয় বাঁকা মিঞা। নৌকো বার-দরিয়ায় গিয়ে পড়েছে। সহজে ফিরবে না। সেটা সন্ন্যাস নয়, বাউণ্ডুলে হয়ে যাওয়া বলতে পারাে।
সেটাই কি ভাল?
জীবনটা যে কত বড় তা বােঝা?
আমাদের বােঝায় কেডা?
