তোকে আর পণ্ডিতী করতে হবে না। এই আপার খবর কি রে? পাশ করে তো দেখা করতে এল না!
পাশ করাটা ওর কাছে আবার একটা ব্যাপার নাকি? ও তো ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছে।
সে তো জানি।
পড়ছে। পাশ-টাশ করে কোথাও সেবায় লেগে যাবে। ওর তো আমাদের মতো ক্যারিয়ারের ব্যাপার নেই, ওর হল মিশন।
কিরকম রেজাল্ট করেছিল?
ও বাবা, ও ছিল টুয়েলভথ। ভাল করে পড়লে ফার্স্ট হত।
তোর সঙ্গে আর তো দেখা হয় না।
না। তবে একটা চিঠি দিয়েছে।
কী লিখেছে?
হাই ফিলজফি। চিঠিটা আমি বাবার জন্য রেখে দিয়েছি। ওর ওই সব ফিলজফি বাবার খুব পছন্দ হবে।
মণীশ মৃদু হেসে বলে, ও মেয়েটাকে আমার খুব ভাল লাগে। বড় কিছু করবে দেখিস।
অপর্ণা বলল, বড় সাহস। মেয়েদের অত সাহস ভাল নয়।
বাড়ি ফিরে যখন সবাই এক প্রস্থ আড্ডায় বসল তখন বুবকা ফের বলল, দিদি, ইউ রিয়েলি লুক ডিফারেন্ট। তাকে আগে একটু কাঠখোট্টা লাগত, এখন লাগছে না।
ঝুমকি একটু নার্ভাস হাসি হেসে বলল, যাঃ, আমি বুঝি কাঠখোট্টা ছিলাম।
ছিলি একটু।
আমি বদলাইনি মোটেই। বরং তুই একটু বদলেছিস। আগে কো-এড়ুকেশনে পড়তিস, একটু নরম ভাব ছিল। এখন হুমদো হুমদো ছেলেদের মধ্যে থাকিস, তাই তুই কাঠখোট্টা হয়েছিল।
বুবকা হাঃ হাঃ করে খানিকক্ষণ হেসে বলল, কথাটা কিন্তু ঠিক। আমি এখন টোটাল ম্যাসকুলিন সারাউন্ডিংস-এ থাকি। মা নেই, অনু নেই, দিদি নেই, মেয়ে-বন্ধুরা নেই। কিন্তু ভালই লাগে।
অপর্ণা হঠাৎ বলল, তোর কার জন্য সবচেয়ে বেশি মন খারাপ লাগে?
বাবার জন্য অফ কোর্স। কিন্তু সকলের জন্যই। তবে কি জানো মা, এত বন্ধু আর অত পড়ার চাপ যে মন খারাপটারাপ সব উড়ে যায়। তারপর খেলাধুলা আছে, আচ্ছা আছে।
মণীশ বলল, ইজ ইট থ্রিলিং?
ভেরি মাচ।
একটু গভীর রাতের দিকে যখন সবাই শুতে গেল তখন ঝুমকি এসে বুবকাকে ডাকল, এই ভাই, ঘুমিয়েছিস নাকি?
না রে। আজ এতদিন পরে বাড়ি এসে এত অদ্ভুত লাগছে যে ঘুম আসছে না। আয় না, গল্প করি।
ঝুমকি আলো না জ্বেলে চেয়ার টেনে বিছানার মুখোমুখি বসে বলল, আমাকে তোর অন্যরকম লাগছে কেন বল তো!
কি জানি রে দিদি, বুঝতে পারছি না।
তুই এমনভাবে বলছিলি যে আমার ভয় করছিল।
কেন, ভয়ের কি আছে?
কেমন মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি কোনও অন্যায় করে ফেলেছি।
যাঃ, তোকে সেরকম লাগছে না মোটেই। মনে হয় তুই বোধহয় একটু ওয়েট গেন করেছিল। ওজন নিয়ে দেখি তো।
তা হতে পারে।
সেটাই হবে।
ঝুমকি একটা শ্বাস ফেলে বলল, বাবা তোর জন্য খুব ভেঙে পড়েছিল, জানিস?
জানি, মা বলেছে। কিন্তু বাবা সামলেও গেছে। জীবনটা যে কত বড় তা বাড়িতে থাকলে বোঝা যায় না। হস্টেলে থাকলে বোঝা যায় খানিকটা।
কত বড় রে?
ঠিক আন্দাজ করা মুশকিল। এখানে তোরা আছিস, তুই, মা, বাবা, অনু সবাই মিলে কেমন একটা ঘেরটোপ। নিজেকে ঠিক স্বাধীনভাবে ফিল করা যেত না। আমি হয় কারও ছেলে, নয়তো ভাই, নয়তোে দাদা। কিন্তু ওখানে তো তোরা নেই। হঠাৎ মনে হল অথৈ জলে পড়ে গেছি। তারপর ধীরে ধীরে মনে হতে লাগল, এই পৃথিবীটা অনেক বড় এবং এখানে তোরা ছাড়াও অনেক মানুষ আছে ঠিক বোঝাতে পারব না। হোয়েন আই অ্যাম অন মাই ওন তখন অন্যরকম ফিলিং হয়।
তোর ভাল লাগছে ওখানে?
খুব।
আমাদের ভুলে যাচ্ছিস না তো!
আরে না। দিদি, দাবা খেলবি?
এত রাতে?
আজ ঘুম আসবে না। আয় এক পাট্টি খেলি।
ঠিক আছে।
দাবায় দুবার হেরে যখন মাঝরাতে ঘুমাতে গেল ঝুমকি তখন তারও ঘুম এল না। আজকাল মাঝে মাঝে এটা হয়। বুকের ভিতরে একটা হায়-হায়, শূন্য ভাব ভর করে থাকে। সে কি ধরা পড়ে গেছে বুবকার চোখে? তার গভীর গোপন একটা অন্তর্জগতের ঘটনা কি ছায়া ফেলছে তার মুখে বা শরীরে?
অনেকক্ষণ জেগে শুয়ে রইল ঝুমকি। কাউকে সে কখনও বলতে পারবে না। মরে গেলেও না। চারুমাসি বিদেশে চলে যাবে, তারপর আর ও বাড়িতে যাওয়া হবে না। আর হয়তো দেখাই হবে না হেমাঙ্গর সঙ্গে।
না হোক। দেখা হয়েই বা কী হত? হেমাঙ্গ এখনও ড়ুবে আছে আকণ্ঠ রশ্মির প্রেমে। রশ্মি বিয়ে করেছে শুনে প্রায় বিবাগী হয়ে গ্রামে গিয়ে থানা গেড়ে ছিল। আবার ফিরেছে বটে, কিন্তু মেয়েদের আর লক্ষই করে না সে। হয়তো মেয়েদের ঘেন্নাই করে মনে মনে।
করুক, তাতে আর ঝুমকির কী?
পরদিন বুবকা সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখা করে এল। রাতের বেলা আড্ডা হল একটু। ভোর হতে না হতেই চলে গেল খড়গপুর। বাড়ি ফের ফাঁকা। এই ফঁকাটা আর ভরাট হবে না সহজে। ফাঁকাই থেকে যাবে।
ঝুমকি চাকরি ছেড়েছে। কম্পিউটার শেখা শেষ হয়েছে। মাঝে মাঝে প্র্যাকটিস করতে চাবুশীলার বাড়ি যায়। চারুশীলা গোছগাছ শুরু করেছে। বলে, জানিস, আমার আর এ দেশ ভালই লাগছে না।
তুমি তো সুব্রতদার সঙ্গে বিদেশেই থাকতে পারো।
বিদেশেও কী বেশি দিন ভাল লাগে আবিস? আমার মনটাই একটু চঞ্চল ধরনের। যখন ভাল নালাগে তখন কোথাও ভাল লাগতে চায় না। আর নিজের ইচ্ছেয় জায়গা বদল করলে তো হবে না। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনো আছে।
ওদের বিদেশেই পড়াও না কেন?
সুব্রত সেটা পছন্দ করবে না। মেয়েটাকে এবার আমেরিকায় ভর্তি করে দেবো ভাবছি। সুব্রতর খুব ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু এখন বলছে, নাঃ, ওসব দেশে না রাখাই ভাল। কী যে করব বুঝতে পারছি না।
তোমার যে কত সমস্যা। আমিই আমার সমস্যা।
আর একদিন ঝুমকি গিয়ে কম্পিউটার খুলে বসেছে, চারুশীলা এসে হঠাৎ বলল, হা রে, তুই বিয়ে করছিস না কেন বল তো!
