জানি অপু। তুমি ভেবো না। আমাকে একটু সময় দাও, ঠিক সামলে উঠব।
তোমার যা অবস্থা দেখছি আমার তো চিন্তা হচ্ছে। আমি তো মা, তবু তোমার মতো অবস্থা তো আমার হয়নি।
মণীশ একটু চুপ করে থেকে বলল, কাউকে কাছ-ছাড়া করতে ইচ্ছে হয় না। কেবল মনে হয়, আমার সঙ্গে যদি আর দেখা না হয়?
ছিঃ! ও কি অলক্ষুণে কথা!
অলক্ষুণে হলেও মিথ্যে হয়তো নয়। জীবন এত অনিশ্চিত, আয়ুর ঘরে মস্ত এক প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে আছে, আর কতদিন?
তুমি কর ভবিষ্যতের কথা ভাবছে না কেন?
তাও ভাবি। খুব ভাবি। বুবকা একটি উজ্জ্বল ছেলে। পড়াশুনোয় ভাল, স্বভাবে ভাল, হৃদয়বত্তায় ভাল, ওর ভবিষ্যৎ ভালই হবে অপু। ওর জন্য কখনও আমাকে কোনও উদ্বেগ পোয়াতে হয়নি। বরাবর ওবিডিয়েন্ট ছিল, বিনীত ছিল, ভদ্র ছিল। সব ভাল, তবু একটু দূরে সরেই গেল কিন্তু। এই দূরত্বটা ক্ৰমে ক্ৰমে বাড়বে। তাই না?
উঃ, তুমি এত ভাবতেও পারো। আমার তো এ সব কথা একবারও মনে হয় না। ছেলে দূরে গেলেই কি পর হয়ে যায় নাকি?
মণীশ মৃদু হেসে বলে, ঘরে ঘরে কত ছেলে পর হয়ে যাচ্ছে তার হিসেব জানো?
সেও জানি। অত ভেবে না; পরই যদি হয় তো তার অনেক দেরি আছে। ছেলেরা পর হতে থাকে বিয়ের পর, তার আগে নয়। আগ বাড়িয়ে অত ভাবছে কেন?
ঠিক আছে, আর ভব না।
চলো, একটু সিনেমা থিয়েটার কিছু দেখে আসি।
মণীশ মাথা নেড়ে বলে, না। ওসব আমার ভাল লাগে না। তার চেয়ে ক্যামেরাগুলো বের করো। তোমাদের কিছু ছবি তুলি।
আবার আমাদের ছবি? তোমার মাথাটাই গেছে। বারো-চৌদ্দটা অ্যালবাম ভর্তি হয়ে আছে শুধু আমাদের ছবিতে।
তা হলে বরং এমনি ছবি তুলে বেড়াই কয়েকটা দিন।
পরিশ্রম আর ধকল সইতে পারবে তো? ভেবে দেখ।
মণীশ হাসল, পারব। ছবি তোলার একটা নেশা আছে। শুরু করলেই একটা টনিকের কাজ করবে।
যা ভারী তোমার ক্যামেরার ব্যাগ!
না, ব্যাগ নেবো না। দুটো ক্যামেরা নিলেই হবে। শুধু লেন্সের জন্য একটা ছোটো ব্যাগ হলেই হবে।
কয়েকটা ছুটির দিনে মণীশ বাস্তবিকই ছবি তুলে বেড়ালো। নিজেই ওয়াশ করল ফিল্ম। প্রিন্ট করিয়ে আনল। তারপর খুঁটিয়ে দেখল সব ছবি। অপর্ণাকে বলল, নাঃ, এখনও মরে যাইনি দেখছি। তবে অ্যাকশনের ছবি আর তুলতে পারব না। আর পারব না ছুটতে বা খুব উঁচু জায়গায় উঠতে।
পেরে দরকার নেই।
মণীশ বলল, না, সত্যিই দরকার নেই। ক্যামেরা তুলে রাখো।
শখ ফুরিয়ে গেল নাকি?
ঠিক তা নয়। মনের বিষণ্ণতাটা কেটেছে।
বাঁচা গেল। যা ভাবছিলাম।
বিষণ্ণতাটা সত্যিই কাটল কিনা তা বুঝতে পারল না অপৰ্ণা। শুধু বুঝল, মণীশ এখন আগের চেয়ে কম কথা বলে এবং মাঝে মাঝে অদ্ভুত শূন্য এক চোখ মেলে ভাষাহীন চেয়ে থাকে।
মাস দেড়েক বাদে রবকা তিন দিনের ছুটিতে বাড়ি এল। কী যে হইচই হল তা বলার নয়। মণীশের এমন উত্তেজনা হচ্ছিল যে আবার তার হাৰ্ট না বিগড়ে বসে ভয় হল অপর্ণার।
ছুটির দ্বিতীয় দিনটায় তারা একটা পার্টির ব্যবস্থা করে রেখেছিল আগে থেকেই। পার্টি যেমন হয় তেমন নয়। রাতে তারা একটা বড় হোটলে গিয়ে খেল। মাত্র পাঁচজনের জন্য খরচ হল তিন হাজার টাকার ওপর।
অপর্ণা বলল, টাকা কি তোমাকে কামড়ায়? ওগো, আমরা কিন্তু শেঠজী নই। আমাদের লক্ষ লক্ষ টাকার ব্ল্যাকমানি নেই, তোমাকে বছরে পঞ্চাশ হাজার টাকার ওপরে ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়, মনে রেখো।
জানি অপু। এর পর তুমি মেয়েদের বিয়ে আর বুকার পড়ার খরচের কথাও তুলবে। অত ভেবো না, এই একটা দিন। বুবকা বাড়ি এসেছে।
আর নয় কিন্তু। ফের এরকম পাগলামি করলে আমি ভীষণ রেগে যাবে। ইস, গালে থাপ্পড় মেরে পয়সা নিয়ে নিল।
বুবকা বলল, মা, দাম বেশি ঠিকই, কিন্তু খাওয়াটা ফ্যান্টাস্টিক হয়েছে।
অনু বলল, ঠিক মা, এরকম পসিন্দা কাবাব আর দম পুখত, কখনও খাইনি। মুখের মধ্যে যেন গলে গেল।
সমর্থক পেয়ে মণীশ বলল, তোমার ভাল লাগেনি অপু?
ভাল? আমি হোটেল দেখেই দামের কথা ভেবে এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে, খাবারের স্বাদই বুঝতে পারিনি।
মণীশ বলল, এই ঝুমকি, তুই চুপ কেন রে?
ঝুমকি করুণ মুখ করে বলল, আমারও কিন্তু মার মতোই মনে হচ্ছে। খাবারগুলো খুব ভাল, কিন্তু দামটা বড্ড বেশি।
তুই স্বভাবে ঠিক তোর মায়ের মতোই হয়েছিস। দাম নিয়ে অত ভাবিস কেন? একদিন তো!
না, ভাবছিলাম, দামটা একটু কম হলে আবার আসা যেত।
আবার আসব। তাতে কি?
না বাবা, আর আসতে আমার লজ্জা করবে।
তোর খাবারগুলো ভাল লেগেছে তো!
দারুণ।
বুবকা দিদির কাঁধে একটু দাদাসুলভ চাড় মেরে বলল, তুই একটু কিপটে আছিল কিন্তু দিদি।
কাল আমি তোকে একটা জিনিস বেঁধে খাওয়াবো, দেখিস এদের চেয়ে মোটই খারাপ হবে না।
বুবকা হঠাৎ বলল, আচ্ছা দিদি, সবাই একরকম আছে, কিন্তু তোকে একটু অন্যরকম লাগছে কেন রে?
ঝুমকি অবাক হয়ে বলল, অন্যরকম! যাঃ, অন্যরকম লাগবে কেন?
ঠিক ডিফাইন করা যাবে না। কিন্তু তোকে ঠিক আগের মতো দিদি-দিদি লাগছে না।
কিরকম লাগছে? পিসিপিসি?
আরে নাঃ। মনে হচ্ছে তুই একটু পাল্টে গেছিস।
মাত্র এই কদিনে? তুই তো সবে এই সেদিন হস্টেলে গেলি!
তাই তো ভাবছি হোয়াট ইজ ডিফারেন্ট অ্যাবাউট মাই ডিয়ার দিদি?
অপৰ্ণা বলল, ঝুমকি তা হলে নিশ্চয়ই আরও বোগা হয়ে গেছে। হবে না! খাওয়া নিয়ে ওরকম বাছাবাছি যাদের থাকে তাদের শরীর শুকোবেই।
বুবকা বলল, না মা, দিদি আর শুকোবে কি করে? ও তো সম্পূর্ণ ডিহাইড্রেটেড। তা নয়, কিন্তু একটা অন্যরকম লাগছে, ধরতে পারছি না।
