নিমাই মাথা নেড়ে বলল, আসবে। ঠিক আসবে।
কি করে বলছো।
ডলার আর পাউণ্ডের লোভে আসবে ঠিকই। তবে দিনের আলোেয় নয়, রাতের অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে আসবে। আমার ভয় তখন যদি আপনার দলের ছেলেরা তাকে ধরতে পারে তো বিপদ ঘটবে।
কাকা মাথা নেড়ে বলে, না। আমি বারণ করে দেবো। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।
আর সজলবাবুকে সে যদি বিয়ে করতে চায় তো করতে পারে। যদি দেখা হয় তো বলে দেবেন।
এত বড় কথাটা বলতে বলছো!
বলছি। সে যাতে খুশি হয় তাই করুক। আমার আর কিছু এসে যায় না। আমি আসি গিয়ে কাকা?
চলো, তোমাকে বাসে তুলে দিয়ে আসি।
চলুন।
বাস স্ট্যান্ডে এসে নিমাই বাস ধরে ফিরে এল।
মনটা ভাল নেই। মানুষ পাপের জঞ্জাল জমিয়ে তোলে। একটা জঞ্জাল সাফ হয়, তারপর ফের জমে যায়।
ফিরে এসে কাজেকর্মে মন দিল নিমাই।
বাবা বলল, ওরে, আর কতকাল আমাকে এখানে ধরে রাখবি? আমার এখানে মন বসছে না।
নিমাই বলল, চলুন, আজই পালপাড়ায় রেখে আসি আপনাকে।
সন্ধেবেলা ফিরে এসে দেখল দোকানে রামজীবন বসে আছে।
আরে, আপনি কখন এলেন, বলে পায়ের ধুলো নিতে গেল নিমাই।
তাকে ধরে ফেলে রামজীবন বলল, বিকেল থেকে বসে আছি। সামনের সপ্তাহে আমাদের গৃহপ্ৰবেশ। বাবা তোমাকে নেমন্তন্ন করতে পাঠাল।
আমাকে বলে নিমাই অবাক।
তোমাকেই। বড়দা বিরাট বাড়ি বানিয়ে দিয়েছে। মা বাবা থাকবে, দেখলে তাজ্জব হয়ে যাবে।
কিন্তু বলে নিমাই ঘাড় চুলকোলে।
ওজব আপত্তি শুনতে আসিনি। তোমাকে যেতে হচ্ছে।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বীণাপাণি কি এখন ওখানে আছে?
আছে।
আপনাকে একটা কথা বলব?
বলেই ফেল।
তাকে বলবেন বনগাঁয়ে গণ্ডগোল মিটে গেছে।
কিসের গণ্ডগোল।
ছিল একটা। সে ইচ্ছে করলে ফিরে যেতে পারে।
রামজীবন একটু ভেবে বলল, হ্যাঁ। বীণাও বলছিল বটে, ওর একবার বনগাঁয়ে যাওয়া দরকার।
বলবেন যেন নিৰ্ভয়ে যায়। কেউ কিছু বলবে না।
আচ্ছা বলব। তাহলে আসি। তারিখটা মনে রেখো।
যে আজ্ঞে। মনে থাকবে। তবে একটু বসে যান।
বেশ কারবারটি ফেঁদেছো তো! ভালই চলছে দেখছি। সন্ধে থেকে তো খদ্দেরের কামাই দেখছি না।
চলে যাচ্ছে।
আমিও দোকান করছি। কিরকম চলবে কে জানে। গায়ে গঞ্জে দোকান চালানো কঠিন।
নিৰ্মাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, যে আজ্ঞে।
রামজীবনকে মাংস পবোটা ঠেসে খাইয়ে দিল নিমাই। রামজীবন মহা খুশি। বলল, ওঃ, অনেকদিন এরকম ভাল বঃ খাইনি। তাই বলি, দোকান এত চলে কেন?
রামজীবন চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল নিমাই। গৃহপ্ৰবেশে সে যাবে না। সম্পৰ্কই চুকে গেছে যাবে কেন? তবে শ্বশুর লোকটা বড় ভাল।
০৯৬. মণীশের বাক্যহীন চেয়ে-থাকাটা
মণীশের বাক্যহীন চেয়ে-থাকাটা আজকাল সহ্য করতে পারে না অপৰ্ণা। মণীশ রোগা হয়ে যাচ্ছে, চোখের নিচে কি কালিও পড়ছে? দুর্বল হৃদযন্ত্র নিয়ে মণীশের বেঁচে থাকা, আর ওপর যদি ওরকম বিষণ্ণতা চেপে বসে মাথায় তা হলে কি ভাল?
এ কথা ঠিক। যে বুবকা আই আই টি-তে চলে যাওয়ার পর সকলেরই মন খারাপ। বাড়িটা হাঁ-হাঁ করছে ফাঁকা। তবু লোকে সব অবস্থাই তো সামলে নেয়। মণীশ পারছে না কেন?
জয়েন্ট এন্ট্রান্স পাশ করে বুবকা যখন হস্টেলে গেল তখন আর এক উদ্বেগ পেয়ে বসেছিল মণীশকে। আই আই টিতে ভীষণ র্যাগিং হয়। মণীশ উদ্বেগে প্রায় পাগল হয়ে বুকার সঙ্গে চলে গেল খড়গপুরে। হোটেলে রইল কয়েকদিন, যাতে বিপদে পড়লে বুবকা তার কাছে পালিয়ে আসতে পারে। বুবকা অবশ্য পালিয়ে আসেনি। র্যাগিং সহ্য করেছে এবং তারপর সকলের সঙ্গে মিশে গেছে। ছেলের র্যাগিং নিয়ে এমন চিন্তায় পড়েছিল মণীশ যে, ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল। র্যাগিং-এর ভয় গেছে, কিন্তু মণীশ এখনও বুবকার অভাবটা সামলে উঠতে পারছে না।
হ্যাঁ গো, ছেলে কি কারও বিদেশে যায় না। সবসময়ে বুকে আগলে থাকা যায় বুঝি? ছেলের ভবিষ্যৎ বলে কি কিছু থাকবে না?
মণীশ এ কথার সরাসরি জবাব দেয় না, কিন্তু চেয়ে থাকে শূন্য চোখে। তারপর বলে, নাউ হি ইজ অ্যান অ্যাডাল্ট। বড় হয়ে গেল!
সেটা কি কোনও ট্র্যাজেডি? ছেলে বড় হচ্ছে এটা তো আনন্দের কথাই গো!
মণীশ মাথা নেড়ে বলে, ঠিকই তো। বড় হওয়ারই তো কথা। কিন্তু এই যে আলাদা হয়ে গেল, এই কিন্তু ছাড়াছাড়ি শুরু।
সে আবার কী কথা! ছাড়াছাড়ির কী আছে? পাশ করে চলে আসবে।
না অপু, পাশ করে চাকরি করবে, হয়তো বিদেশে যাবে, তারপর বিয়ে করবে, তারপর আমার বুবকা আরও অনেকের বুবকা হয়ে যাবে। কথাটা স্বাৰ্থপরের মতো শোনাচ্ছে হয়তো, ঠিক বোঝাতেও পারব না। তবে বুবকা যেমন আমার এক্সকুসিভ ছিল ঠিক তা তো আর থাকবে না। নিজস্ব মতামত হবে, ব্যক্তিত্ব হবে, চরিত্র হবে। এ জেন্টলম্যান অফ হিজ ওন।
সেই জন্য তুমি মন খারাপ করে আছে? আচ্ছা পাগল তো! তুমি নিজেও তো বড় হয়েছে, আলাদা হয়েছে, তাতে কী অসুবিধে হল শুনি!
মণীশ মৃদু একটু হাসি মুখে টেনে বলে, বুবা আমার এত ক্লোজ ছিল বলেই বোধহয় বড় কষ্ট হচ্ছে।
তুমি বাপু বড় নরম। যা ভেবেছিলাম তোমাকে তার চেয়েও অনেক বেশি নরম।
দুর্বল, তাই না?
তাও।
হার্ট অ্যাটাকটা হওয়ার পর থেকেই আমার এরকম একটা ব্যাপার হয়েছে। ঝুমকির বিয়ের কথা মনে হলে বা বুবকা। চাকরি করতে বাইরে যাবে ভাবলে কেমন যেন রি-অ্যাকশন হতে থাকে। মনে হয় ওদের দূরে কোথাও যেতে না দেওয়াই বোধহয় ভাল।
তোমার এ সব কথা বুকার কানে গেলে ও কিন্তু পড়াশুনো ছেড়ে দিয়ে চলে আসবে। হস্টেলে যাওয়ার সময় লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে, তা জানো?
