নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বাঁচালেন কাকা, কলঙ্ক নিয়ে মরতেও বড় জ্বালা। তবে বীণার পাপের জন্য প্ৰায়শ্চিত্ত করতে আমি রাজি।
তা কি হয়? একজনের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আর একজনকে দিয়ে হয় না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে নিমাই। তারপর বলে, আমি বীণার ঘরখানা একটু দেখে আসতে পারি?
যাও না। পাশের বাড়িতে চাবি আছে।
আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন?
আমি গিয়ে কি করব?
চলুন একটু ঘুরে সব দেখে আসি।
চলো তাহলে। বলে কাকা উঠল।
রিকশা করে দশ মিনিটের মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে গেল তারা।
বাড়িখানা ভালই করেছে বীণা। দেওয়াল দিয়ে ঘর তুলেছে নতুন করে। পাকা মেঝে। একখানা দাওয়া হয়েছে। বেশ দেখাচ্ছে। শুধু সুখটা তার সইল না।
কাকা চাবি আনিয়ে ঘরে ঢুকল। পশ্চিম-উত্তর কোণে গর্তটা দেখিয়ে বলল, দেখ কাণ্ড!
গর্তটা ভাল করে দেখল নিমাই। একখানা শাবল পড়ে আছে পাশে। গর্তের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে নিমাই কিছু একটা খুঁজছে।
কি খুঁজছো।
মাপটা দেখছি।
কিসের মাপ?
গর্তের মাপ।
কেন বলো তো!
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আগের গর্তটা এখানে ছিল না। মাপটাও বড় ছিল।
কোথায় ছিল গর্তটা?
ওই দিকটায়। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। ওদিকটা আমি একটু খুঁড়ে দেখব কাকা?
তোমার কি ধারণা মালটা এখানেই ফেলে গেছে বীণা? তাহলে গর্ত খুঁড়ল কেন? ও জিনিস ওর সঙ্গেই আছে।
নিমাই খুব বোকার মতো মুখ করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, সঙ্গেই থাকার কথা। তবে কিনা আপনার ছেলের নজর রাখছে টের পেয়ে সে জিনিসটা সঙ্গে নাও নিতে পারে। ধরা পড়লে তো হয়েই গেল। তাই হয়তো বুদ্ধি খাঁটিয়েছে। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না।
সেটা কিরকম?
ঘরে যে খানাতল্লাসি হবে সেটা বীণা জানে। তাই গর্তটা করে রেখে গেছে যাতে আপনার মনে হয় যে, মাল হাদিস হয়েছে।
ও বাবা! এ যে সাঙ্ঘাতিক কথা বলছো।
লোভ মানুষকে দুষ্টবুদ্ধি জোগায়। তাহলে ওদিকটা খুঁড়েই দেখ।
যদিও আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি, তবু দেখ।
নিমাই শাবলটা নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মেঝেটা আগে ভাল করে দেখে নিল। তার চোখ খুবই ভাল। দেখতে পেল, একটা জায়গায় একটা টিপ ছাপ আছে। খুব হালকা, প্ৰায় চোখেই পড়ে না। গাঁথনি খুবই কাঁচা। সামান্য সিমেন্ট আর মেলা বালি দিয়ে সস্তায় কাজ সারা হয়েছে। নিমাই অল্প পরিশ্রমেই গর্ত করে ফেলতে পারল। তারপর ভিতরে হাত ঢুকিয়ে টানা-হ্যাচড়া করে প্লাস্টিকে জড়ানো স্টেনলেস স্টিলের কৌটোটা বের করে আনল। তার হাত-পা থরধর করে কাঁপছে। বুক কঁপছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
কাকা অবিশ্বাসের চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল নিমাইয়ের দিকে। মুখে বাক্য নেই।
নিমাইও কথা কইতে পারল না কিছুক্ষণ। তারপর খখিত গলায় বলল, এই নিন। বোধ হয় এটাই।
দুহাতে জিনিসটা বাড়িয়ে ধরল নিমাই। চোখে জল।
কাকা হাত বাড়িয়ে নিল। তারপর চৌকিতে বসে ধীরে ধীরে প্লাস্টিকের মোড়ক খুলল। কৌটোর ঢাকনা খুলে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। কৌটোটার ভিতরে প্লাস্টিকে মোড়া ঠাসা ডলার আর পাউন্ডের নোট। কাকা নোটগুলো বের করল, নীরবে গুনল। তারপর নিমাইয়ের দিকে চেয়ে বলল, সব ঠিক আছে নিমাই।
ঠিক আছে? বলে নিমাই মাথা নেড়ে বলল, কিছুই ঠিক নেই কাকা। মানুষ ঠিক নেই। মতলব ঠিক নেই। বুদ্ধি ঠিক। নেই।
তুমি বড্ড ভেঙে পড়েছে নিমাই। বসে, দম নাও!
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, কটাই বা টাকা বলুন। তার জন্য গুনোগার কত দিতে হল! মানুষ খুন হল, স্বামী-স্ত্রী ছাড়াছাড়ি হল, উদ্বেগ অশান্তি সন্দেহ কত কী দেখা দিল! তবু বীণাপাণি লোভ ছাড়তে পারেনি। হিসেব করে বলবেন তো, এই বিলিতি টাকায় আমাদের কত টাকা হয়।
হিসেব করতে হবে। তবু অনুমান পঞ্চাশ হাজারের মতো হবে।
ব্যস! বলে চোখ বুজল নিমাই।
কাকা একটু হাসল, আজ সত্যি করেই বলছি, তোমার মতো মানুষ আমি আর দেখিনি। আমি পাপীতাপী লোক বটে, কিন্তু যে ভাল, তাকে ভাল বলতে জানি।
হাত জোড় করে নিমাই বলল, দোহাই কাকা, আমার প্রশংসা করবেন না। ও শুনলেও পাপ হয়। কাজ হয়ে গেছে, এবার তবে আসি গিয়ে আমি।
আরে পাগল? এত সহজে ছাড়ব নাকি তোমায়? চলো, আমার ওখানে বসে একটু চা-মিষ্টি পেয়ে যাবে।
এসব আমার গলা দিয়ে নামবে না কাকা। আজ মাথাটা বড্ড চক্কর দিচ্ছে। বুকটাও হালকা। এখন বীণা আমাকে শত শাপশাপান্ত করলেও কিছু না।
বাক্সটা আবার প্লাস্টিকে মুড়ে নিল কাকা। তারপর বলল, বীণার একটা ছেলের সঙ্গে নঘট ছিল, জানোই তো! তাকে খুব মারধর করা হয়েছে। ছোকরা হাসপাতালে পড়ে আছে। এসব কাণ্ডের পর বীণাকে আর বনগাঁয়ে থাকতে দেওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়াল।
নিমাই কাকার হাত দুটো চেপে ধরে বলল, ওকে মাপ করে দিতে হবে কাকা। আপনি যদি রক্ষে করেন তো কেউ ওর ক্ষতি করবে না, প্রাণটা রক্ষে করুন।
কাকা হাসল, তুমি কি বীণাকে এখনও এত ভালবাসা।
ভালবাসা জিনিসটা কিরকম তাই জানি না। আমার ওর ওপর কোনও দাবিদাওয়া বা লোভ নেই কাকা, তবে সে আমাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। রোগভোগে যখন মরতে বসেছিলাম, তখন বীণা না বাঁচালে বাঁচা যেত না। সেই ঋণটা শোধ হওয়া দরকার।
কাকা একটু ভেবে বলল, আজ দলের সবাইকে ডেকে ঘটনাটা বলব, তারপর একটা কিছু স্থির করতে হবে। যাত্রার দলে বীণাকে আর রাখতে চাই না। তার বদনাম হয়ে গেছে।
সে আপনি যা ভাল বুঝবেন, করবেন। শুধু প্রাণে মারবেন না।
না, সে ভয় আর নেই। বীণাও শিগগির এদিকে আসবে বলে মনে হয় না।
