মাঝে মাঝে নিমাই একা একা কাদে। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে করে এই পাপ পৃথিবী ছেড়ে স্বেচ্ছায় বিদায় নেয়, রেললাইনে কাটা গিয়ে কিংবা গলায় দড়ি দিয়ে স্কুলে। কিন্তু সেটা আর এক দফা পাপ হবে বলে চিন্তাটা পুষে রাখে না সে। তার খাওয়া ঘুচে গেছে, মুখে কিছু রোচে না। শরীরটাও বেশ দুর্বল।
কাঁচরাপাড়ায় তার বন্ধুবান্ধব মেলাই হয়েছে। নিমাইয়ের কখনও বন্ধুর অভাব হয় না। সিদ্ধিনাথ একদিন বলল, ওহে নিমাই, ব্যাপারটা কি বলো তো! কাজকারবার মন্দা যাচ্ছে নাকি? মুখ শুকনো কেন।
না, কাজকারবার ঠিকই আছে। নানা কথা ভেবে মনটা ভাল নেই।
সিদ্ধিনাথ ইনসিওরেন্সের দালালি করে। লোক ভাল। নিমাইয়ের তাকে খুব পছন্দ। সিদ্ধিনাথ বলল, নানা কথা ভাবো, সে জানি। ঘরের বউকে যাত্রায় নামিয়েছে, কাজটা ভাল করোনি। এ হল গিয়ে ঘোমটার নিচে শ্যামটা নাচ। তা তোমাদের সম্পর্কটা কোথায় দাঁড়িয়েছে বলে তো?
সম্পর্ক আর কোথায়?
আইনে যদি না আটকায় তো একটা কথা বলি।
কি কথা?
অমন শুকনো মুখে থাকো বলেই বলছি। আবার সংসার করো। হাতে ভাল মেয়ে আছে। গোত্রে বর্ণ একেবারে ঠিকঠাক।
নিমাই ম্লান মুখে একটু হেসে বলে, পেরে উঠব না ভাই। এক বিয়ের নাকে খত এখনও চলছে। তা হ্যাঁ হে সিদ্ধিনাথ, তুমি তো মাঝে মাঝে বনগাঁয়ে যাও, তাই না?
যাই মানে? হস্তায় দু-তিনবার তো বটেই। আমাকে পেটের দায়ে চরকিবাজি করতেই হয়।
টাপোটোপে একটা খবর এনে দেবে?
কিসের খবর? তোমার বউয়ের নাকি?
হ্যাঁ! তারই।
কী খবর চাও বলো।
শুধু জেনে এসো সে কেমন আছে।
ব্যস।
হ্যাঁ। বেঁচে আছে কিনা, সেইটেই জানা দরকার।
তার আবার মরার কি হল?
শুনেছিলাম তার বিপদ যাচ্ছে। খবরটা টাপেটোপে নিও। সে যেন টের না পায়।
আরে না। গোবিন্দ ঘোষ আমার বন্ধু মানুষ। চেনো তো তাকে!
খুব চিনি। বাজারে মুদির দোকান আছে তো!
সে-ই সে হল ওখানকার গেজেট। কালই খবর পেয়ে যাবে। তবে একটু রাত হতে পারে।
হোক। খবরটা রাতেই দিও। বড় অশান্তিতে আছি।
রাতটা আর দিটা খুবই উদ্বেগের মধ্যে গেল নিমাইয়ের। পরদিন রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ যখন দোকান ধোলাই হচ্ছিল সেইসময় সিদ্ধিনাথ এসে হাজির। তাকে দেখে হৃৎপিণ্ডটা একটা ডিগবাজি খেয়ে গেল।
কী খবর সিদ্ধিনাথ?
সিদ্ধিনাথের মুখটা কিছু গম্ভীর। মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে বলল, তোমার বউ ওখানে নেই, কিছুদিন হল বাপের বাড়ি গেছে। তবে পালিয়েই যেতে হয়েছে। কাকার দল নাকি তাকে খুঁজছে।
পালিয়ে গেছে?
কী করেছিল বলে তো তোমার বউ? কি সব টাকাপয়সা চুরির কথা শুনলাম।
ঠিকই শুনেছো। পরে বলব সব।
আর সজল বলে কে একটা ছেলে আছে শুনলাম, তোমার বউয়ের সঙ্গে ভাব ছিল। তাকে খুব মেরেছে দলের ছেলেরা।
কেন, সে কী করেছিল?
ঠিক জানি না, বোধহয় বীণাকে সে-ই পালানোর পরামর্শ দিয়েছিল। তবে বীণা রেহাই পাবে না। তুমি বরং ওদিকে আর যে না, বুঝলে?
নিমাই কথাটা শুনতে পেল না। কাঁপা কাঁপা বুক নিয়ে শুকনো মুখে বসে রইল।
পরদিন দোকানটা সকালে চালু করে দিয়ে, বাবাকে ক্যাশে বসিয়ে, ঠাকুর চাকরকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। যা হওয়ার হবে, এ উদ্বেগ আর সহ্য হয় না।
বাস ধরে বনগাঁ পৌঁছাতে বেশী সময় লাগল না। বাস থেকে নেমে সে একটু দাঁড়িয়ে চারদিক দেখে নিল। এই বনগাঁ জায়গাটাই তার বন্ধু ছিল একসময়ে। আজ এই শহরে কি তার লাশ পড়বে।
বাস-আড্ডার কাছেই কাকার ডেরা। রাস্তায় মেলা লোকজন যাতায়াত করছে। একটু দ্বিধায় জড়িত পায়ে সে বাজারে পিছন দিকটায় কাকার ঘরে গিয়ে উঁকি দিল।
কাকা আর দুটো ছেলে বসে আছে মুখোমুখি।
কাকা, আমি নিমাই।
কাকা তার দিকে তাকাল। মুখে হাসি নেই, চোখেও নেই অভ্যর্থনা। কাঠ গলায় বলল, এসো নিমাই।
নিমাই জড়সড় হয়ে ঘরে ঢুকল।
তোমাকে আসতে নিষেধ করেছিলাম না?
নিমাই তার শুকনো গলায় একটা টোক গিলে বলল, আসতে হল, মনে শান্তি পাচ্ছি না বলে।
বসো নিমাই।
নিমাই লক্ষ করল, ছেলেদুটো নতুন। খুব মস্তান মার্কা চেহারা। তাকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছে।
কাকা ছেলেদুটোকে বিয়ে করে দিল। তারপর তার দিকে চেয়ে বলল, বীণা পালিয়েছে, জানো?
শুনেছি।
ডলার আর পাউন্ড সব নিয়ে গেছে সঙ্গে করে।
কি করে বুঝলেন?
আমরা ওর ঘরে হানা দিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি ঘরের মেঝে ভেঙেছে শাবল দিয়ে। বেশ বড় গর্ত হাঁ হয়ে আছে। চিড়িয়া উড়ে গেছে।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তাকে মুখোমুখি পাননি? জিজ্ঞেস করেননি সব কথা?
তোমার কাছ থেকে ঘুরে আসার পর একটা জরুরি কাজ পড়ে গিয়েছিল। তবে ছেলেদের বলেছিলাম বীণার ওপর নজর রাখতে। তারা নজর রেখেছিল বটে, কিন্তু পালিয়েছে ভোর রাতে।
এখন কী হবে কাকা?
তাকে পেলে তো বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে। বীণা পালিয়ে বাঁচবে না, বরং তুমি তার কাছে যাও। গিয়ে বলো, ডলার আর পাউন্ডগুলো সে যদি ভালয় ভালয় ফেরত দিয়ে দেয়, তাহলে এখনও তাকে বাঁচিয়ে দেওয়া যায়।
নিমাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, এ কাজ আমার দ্বারা হবে না কাকা। সে আমাকে মানবে না।
তাকে বাঁচানোর ওইটেই একমাত্র পথ।
আমি একটা পারব না কাকা। এই নিয়েই বীণাপাণির সঙ্গে আমার বনিবনা হয়নি। সে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
কাকা এবার একটু হাসল। বলল, তোমাকে একসময়ে আমার সন্দেহ হয়েছিল নিমাই। কিন্তু ভেবে দেখলাম, সন্দেহটা অমূলক। তুমি ঠিক সেরকম ফেরেব্বাজ বোধহয় নও।
