সারাদিন একটা ঘোরের মধ্যে রইল চয়ন। যন্ত্রের মতো সকালের টিউশনিগুলো সেরে এল। ভাল বঁধল, খেল। তারপর বিকেলে গেল চারুশীলার বাড়ি। সবই ঘটছিল যেন স্বপ্নের মধ্যে। তাকে এই কঠিন বাস্তব যেন স্পৰ্শই করছে না।
চারুশীলা তাকে দেখেই বলে উঠল, এই চয়ন, তোমার কী হয়েছে বলে তো!
চয়ন এই সামান্য প্রশ্নেই ভীষণ থমত খেয়ে বলে উঠল, না না, কিছু হয়নি তো?
না মানে? তোমার মুখ যে ভীষণ শুকনো। চোখ অমন লাল কেন?
চয়ন যেন ধরা-পড়ে গেছে এমন আতঙ্কের সঙ্গে প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে, না, কিছু হয়নি আমার। কিছু হয়নি।
টেম্পারেচার নেই তো! সিজন চেঞ্জের সময়, খুব জ্বর হচ্ছে চারদিকে।
না, জ্বর নয়। রাতে ঘুম হয়নি।
কেন হয়নি।
এমনিই।
আমার ভীষণ ঘুম, তা জানো? লোকে বলে ব্রেনলেসদের নাকি ভাল ঘুম হয়।
চয়ন এবার একটু হাসল। কিছু বলল না।
শরীর খারাপ লাগলে আজ পড়াতে হবে না। আজ ছুটি। বসে, তোমাকে একটা নতুন জিনিস খাওয়াবো।
আজ আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।
শোনো, আমি কিছু অফার করলে কখনও না বলবে না। নেগেটিভ জবাব আমার একদম পছন্দ নয়। একটু হলেও বে। এসো তো, ডাইনিং টেবিলে এসে বোসা।
অগত্যা একটা অচেনা ঝাল-নোনতা হালুয়া গোছের জিনিস অনিচ্ছের সঙ্গে খেতে হয় চয়নকে।
চারুশীলা জিজ্ঞেস করল, এক রাতেই তোমার চেহারাটা অন্যরকম হয়ে গেল কেন বলো তো!
চয়ন লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিল।
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, ইউ আর ইন এ শক।
না তো! কিছু হয়নি।
বলতে না চাইলে বোলো না। কিন্তু খুব শকিং কিছু নিশ্চয়ই হয়েছে। আচ্ছা, তুমি কি ওজন নাও?
না তো!
কেন নাও না? রেগুলার ওজন নিলে বুঝতে পারবে তোমার স্বাস্থ্য ভাল হচ্ছে কি না।
চয়ন বলল, আমার ভাল কিছু হবে না।
আমার তো মনে হচ্ছে উল্টোটাই। ইদানীং তোমার ওজন একটু বেড়েছে বোধহয়। চলো তো, তোমার ওজনটা একটু দেখি।
চয়নকে তাও করতে হল। ডাইনিং হল-এর কোণে দামী একটা ওজন নেওয়ার যন্ত্রে তাকে তুলে চারুশীলা স্কেলটা দেখে বলল, এখনও তুমি বেশ আন্ডারওয়েট। আরও দশ কেজির মতো বাড়লে তবে হয়।
চয়ন খুব লজ্জিত মুখে চুপ করে থাকে।
রাতে নিজের ঘরে যখন চয়ন ফের একা হল তখন একটা হতাশা আর বিভ্রান্তিতে সে কয়েক টুকরো হয়ে আছে। কিছু করতে ইচ্ছে করছে না।
শুয়ে থেকে থেকে সে অনেক ভাল। অনেক, অনেক ভাবল।
অনিন্দিতার সঙ্গে দেখা হল আরও তিনদিন বাদে।
সন্ধের পর অনিন্দিতা উঠে এল ছাদে।
ক্ষমা করো চয়ন।
চয়ন চুপ করে রইল।
তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি, ভুল করেছি।
কেন করলে?
তোমাকে শক দেওয়ার জন্য। ভেবেছিলাম ধাক্কাটা তোমার উপকার করবে।
০৯৫. পালপাড়ায় গিয়ে একদিন
পালপাড়ায় গিয়ে একদিন বাবাকে প্রায় জোর করেই ধরে নিয়ে এল নিমাই। আসতে চাইছিল না, বলল, ও বাবা, আমি ভিটে ছেড়ে কোথাও যাব না।
নিমাই বলল, উপায় থাকলে কি নিয়ে যেতাম! আপনাকে একটু কাজ করবার বুঝে নিতে হবে যে, আমার কবে কি হয়ে যায়।
তোর আবার কী হবে?
সে আপনি বুঝবেন না, চলুন।
অনিচ্ছুক বাবাকে নিয়ে এসে দোকানে বসাল নিমাই, বলল, কাজকারবার একটু বুঝে নিন।
বাবা তো অবাক, আমি কাজকারবার বুঝব কি রে? এ বয়সে এসব আমার মাথাতেই ঢুকবে না।
নিমাই থমকে যায়। কথাটা ন্যায্য। তার বাবার পক্ষে হোটল চালিয়ে রোজগার বজায় রাখা অসম্ভব ব্যাপার। মাথা আর শরীর দুটোতেই মরচে ধরেছে। নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে হতাশ গলায় বলল, আপনার জন্য যে কী করি!
পরদিন নিমাই তার ইনসুরেন্স পলিসি বের করে বাবার হাতে দিয়ে বলল, এটা হচ্ছে পলিসি। পলিসি বোঝেন তো!
তা বুঝি। মরলে তার আত্মীয়রা টাকা পায়।
ব্যস, সেটুকু বুঝলেই হবে। আমার যদি ভাল-মন্দ কিছু হয়, তাহলে সিদ্ধিনাথ দাসের কাছে কাগজখানা নিয়ে যাবেন। ত্ৰিশ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। বুঝলেন?
বাবা একটু রেগে গিয়েই বলে, ভাল-মন্দ হবে কেন রে? বুড়ো তুই, না আমি।
বাবা, আপনাকে সব কথা বুঝিয়ে বলা যাবে না। আমার একটা বিপদ হতে পারে। যদি-র কথাই বলছি। দোকানটার একটা বিনিব্যবস্থা করে রাখতে হবে। অবশ্য যদি শেষ অবধি দোকানটা রাখতে পারি। হয়তো বা বেচে দিয়ে। আক্কেলসেলামী গুনতে হবে। বড় বিপদ যাচ্ছে বাবা।
বাবা ভ্যাবলা চোখে চেয়ে বলে, কিসের বিপদ বুঝিয়ে বলবি তো? অমন ভাসা-ভাসা বলতে কি বুঝতে পারি?
সে অনেক কথা। বলতে গেলে মহাভারত। মরতে আমার তেমন ভয় করে না। শুধু ভাবি, আমি মরলে আপনার কী হবে। কে দেখবে আপনাকে! টাকাটা হাতে পেলেও কি রাখতে পারবেন?
তুই তো আমাকে গণ্ডগোলে ফেলে দিচ্ছিস বাপ! আমার মাথাটা কেমন করে!
তাহলে আর বুঝে কাজ নেই। যা হওয়ার হবে। ভগবানকে ডাকুন।
নিমাই ভিতরে ভিতরে বড় উচাটন। বনগাঁ থেকে আর কোনও খবর বার্তা নেই। কাকা এসেছিল দিন পাঁচেক আগে। এর মধ্যে সেখানে যে কী হচ্ছে, কে জানে। কাকা তাকে যেতে পইপই করে নিষেধ করে গেছে। নইলে সে গিয়ে ঠিক হাজির হয়ে যেত। কাকা লোক পাঠাবে, তার সঙ্গে যেতে হবে।
বাঁচার কোনও পথ দেখছে না নিমাই। বীণাপাণি যে গণ্ডগোল পাকিয়ে রেখেছে তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনও উপায়ও দেখছে না সে।
নিমাইয়ের আজকাল ঘুম হয় না, সব সময়ে বুক কাঁপে, মাথাটা পাথরের মতো ভার হয়ে থাকে দুশ্চিন্তায়, বীণাপাণির ওপর কাকার বড় রাগ। দলের ছেলেরাও ক্ষেপে আছে। মেরে-টেরে ফেলল না তো! একটা লোভর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারল না বীণা। আর সেই লোভই ডেকে আনল সর্বনাশ। আবহমান কাল ধরে এই লোভ আর তার পরিণাম নিয়ে কত কত রামায়ণ মহাভারত লেখা হল, তবু মানুষ আজও কিছু শিখ না, পাঠ নিল না।
