অনিন্দিতার ফুচকা খাওয়ার দৃশ্যটা কেন বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার? উর্ধমুখ, মস্ত হ, ফুচকাটা টপ করে হাঁয়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া, তারপর চিবোনো এবং মুখে আহ্রদ ও উত্তেজনা ফুটে ওঠা-সবটাই তার কাছে এত খারাপ লাগছে!
একটু রাতের দিকে অনিন্দিতা ফের ছাদে উঠে এল। চয়ন তখন স্টোভ জ্বেলে রাঁধতে বসেছে।
এই, শুনেছো। তোমার দাদা আর বউদি আজ বাড়ি নেই। কোন্নগর না কোথায় বেড়াতে গেছে, আজ ফিরবে না। তাই আড্ডা মারতে চলে এলাম।
চয়ন একটু হাসল। দাদা বউদি থাকলেও আজকাল অনিন্দিতা প্রায়ই আসে। তবে সন্ধের পর বেশিক্ষণ থাকে না। সে বলল, ভালই তো! কিন্তু খোলা ছাদে ঠাণ্ডা লাগতে পারে।
কিছু হবে না। রান্না তাড়াতাড়ি শেষ করা। একটু গল্প করি।
তাদের গল্প করাটা কিন্তু অদ্ভুত। চয়নের কথা বিশেষ থাকে না। অনিন্দিতার অনেক থাকে। ও বক্তা, সে শ্রোতা। সম্পর্কটা যে কোনদিকে গড়াবে তা ভেবে পায় না চয়ন।
তার পাশে উবু হয়ে বসে অনিন্দিতা বলে, কী রাঁধছো?
ভাত আর সেদ্ধ আজ আর বেশী কিছু নয়।
আহা, কবেই বা তুমি পঞ্চব্যঞ্জন রাধো! মা আজ মাংস বেঁধেছে, একটু নিয়ে আসব?
না না, মাংস আমার সহ্যই হয় না।
ওঃ, কী নিরামিষ লোক।
চয়ন মৃদু একটু হাসে।
আচ্ছা, তুমি ডিম খাও না কেন?
এ কথার জবাব দিলে তুমি আমার ওপর বিরক্ত হবে।
ও মা, কেন?
একই কথা বারবার বলতে হয় যে! আমার সহ্য হয় না।
মাছ তো খেতে পারো।
তা পারি। কিন্তু ঝামেলা। খাওয়াটা আমার কাছে উপভোগ্য ব্যাপার নয়। খেতে হয়, তাই খাই। খাওয়া না থাকলে আমার খুব ভাল হত।
কিম্ভূত আছো। আমি কিন্তু খেতে ভালবাসি।
সেটাই স্বাভাবিক। আমি তো স্বাভাবিক নই!
স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে শুরু করলেই দেখবে তুমি আর পাঁচটা মানুষের মতো সব কিছুই ভালবাসবে।
হয়তো ঠিকই বলেছো।
আমার কী ইচ্ছে করে জানো? তোমাকে জোর করে স্বাভাবিক জীবনে টেনে আনি।
আমাকে নিয়ে কেন ভাবো অনিন্দিতা? দুঃখ পাবে।
অনিন্দিতা তার সুন্দর দাঁত ঝলসে হাসল, তবু ইচ্ছে করে।
চয়ন মৃদু একটু হেসে বলল, ইচ্ছেটাকে আর প্রশ্রয় দিও না। তাহলে তোমাকে আমার ভয় করবে।
ও মা! কী কথা দেখ! আমাকে আবার ভয়ের কি?
ওই যে, জোর করতে চাও!
যাকে ভালবাসা যায় তার ওপরেই তো জোর করা যায়। তাই না?
চয়ন মৃদুস্বরে আত্মবিশ্বাসহীন গলায় বলে, তা বটে।
তা হলে?
আমার ওপর জোর খাটাতেও হয় না। আমি সবসময়ে অন্যকে খুশি রাখতে চেষ্টা করি। অনেক সময়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে। করি না, বলো।
হ্যাঁ, তা করে। যেমন ইচ্ছে না হলেও আমার সঙ্গে নাটক দেখতে যাও, বেড়াতে যাও। শুধু ফুচকাটা খাওনি।
আরও একটু জোর করলে তাও হয়তো খেতাম। তারপর সারা রাত জেগে থাকতাম অস্বস্তিতে। তাই বলি, আমার ওপর জোর করার দরকার নেই।
তাই বুঝি?
বলে আচমকা যে কাণ্ডটা করে বসল অনিন্দিতা তার কোনও যুক্তিসিদ্ধ অর্থ হয় না, না হয় তার কোনও ব্যাখ্যা। খুবই অকস্মাৎ সে দুই হাতে চয়নের দুটো কাঁধ ধরে নিজের শরীরের দিকে টেনে নিল তাকে। খোলা, বিপজ্জনক ছাদে তার দুখানা ঠোঁট চেপে বসে গেল চয়নের ঠোটে। কয়েকটা অদ্ভুত মুহূর্ত। তারপরই তাকে ছেড়ে দিল অনিন্দিতা।
বেসামাল চয়ন পড়েই যাচ্ছিল ছেড়ে দেওয়ার পর। সামলে নিল। কি হল কাণ্ডটা সে বুঝতেই পারল না প্রথমে। কি করল এটা অনিন্দিতা? কেন করল?
অনিন্দিতা উঠে দাঁড়াল। তারপর অস্ফুট কণ্ঠে বলল, যাচ্ছি।
সিঁড়িতে তার পায়ের শব্দ যখন নেমে যাচ্ছিল তখন কাঁধে আর ঘাড়ে একটা ব্যথা টের পায় চয়ন। বড় হঠাৎ তাকে জাপটে ধরেছিল। বেকায়দায় লেগেছে।
হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁটদুটো মুখে ফেলে চয়ন। কিন্তু ঘটনাটা তো ও ভাবে মুছবে না। এর যে গভীর দাগ থেকে যাবে তার স্মৃতিতে। এটা কী করল মেয়েটা!
চারদিকে কাছাকাছি ছাদগুলোর দিকে চেয়ে দেখল চয়ন। না, কেউ কোথাও নেই। হয়তো কেউ দেখেনি। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, এই ঘটনাটা ঘটিয়ে অনিন্দিতা কী বলতে চাইল তাকে?
স্টোভটা নিবিয়ে দিল চয়ন। তার ভিতরটা গুলিয়ে উঠছে। অদ্ভুত লাগছে। তার জীবনে এরকম অভিজ্ঞতা এই প্রথম। কিন্তু অভিজ্ঞতাটা ভাল না মন্দ তা সে বুঝতে পারছে না। তার ভাল লাগছে না। তার শরীর খারাপ লাগছে।
আধাসেদ্ধ ভাত স্টোভের ওপরেই পড়ে রইল। ঘরে ঢুকে বাতি নিবিয়ে শুয়ে পড়ল চয়ন। তার শরীর কাঁপছে থরথর করে। মনটা অস্থির। মাথাটা পাগল-পাগল লাগছে। শুয়ে থেকে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল চয়ন। কিন্তু কেবলই মনে হচ্ছে, একটা অঘটন তার অস্তিত্বের ভিত বড় নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ভীষণ।
অথচ একটি চুম্বন তো এমন কিছু দোষের ব্যাপার নয়। তার জীবনে হয়তো প্রথম। কিন্তু এ রকম তো হয়। অনিন্দিতার কাছ থেকে ব্যাপারটা অপ্রত্যাশিত ছিল বলেই কি তার একটুও ভাল লাগছে না?
অনিন্দিতা এ ভাবে কিছু কি বলতে চাইল তাকে?
কি বলতে চাইল, তা চয়ন জানে না। কিন্তু তার শরীর জেগে উঠল না এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়। বরং তার চোখে জল এল। প্রেমহীন চুম্বন কত কষ্টকর হতে পারে। এমন কি যেখানে কামনাটুকু অবধি নেই।
প্রায় সারা রাত জেগে রইল চয়ন। যখন ঘুম এল না তখন চাঁদর মুড়ি দিয়ে ছাদে ঘোরাফেরা করল। রেলিং ধরে উদাস চোখে চেয়ে রইল দূরের দিকে। মানে হয় না, কোনও মানেই হয় না।
ধীরে ধীরে ভোর হয়ে গেল। আর কি কখনও অনিন্দিতার সঙ্গে সহজে মিশতে পারবে সে? পারবে ওর চোখের দিকে তাকাতে?
