অনিন্দিতা বলল, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। কোনও ব্যাপারেই তোমার কোনও আগ্রহ নেই কনে বলো তো! নাক হোক, ফিল্ম হোক, পেইন্টিং হোক, কোনও না কোনও বিষয়ে তো মানুষের কণামাত্র ইন্টারেস্ট থাকবে! তোমার কিছুতেই নেই।
চয়ন মৃদু হেসে বলে, আছে।
কিসে আছে শুনি?
আমি পড়তে ভালবাসি।
ওটা কোনও কথা হল? পড়তে ভালবাসেই কি হয়? জীবন কত ছড়ানো। কত কী হয়ে যাচ্ছে আর্টে, কালচারে।
তাই নাকি?
তুমি কোনও খবরই রাখে না। বড্ড কুনো স্বভাব বাপু তোমার।
তা ঠিক। ঘরের কোণ আমার খুব পছন্দসই জায়গা। লোকজনের জমায়েত দেখলেই আমার অস্বস্তি হয়।
কী যে করি তোমাকে নিয়ে। এই স্বভাবের জন্যই তোমার কিছু হয় না। যদি একটা ঝাঁকুনি মেরে জড়তার ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারতে, তাহলে কিন্তু তুমি অনেক কিছু করতে পারতে।
তাই কি? সবাই কিন্তু সব কিছু পারে না। আর একটা কথা শোনো, আর্ট কালচারে আমাকে ইন্টারেস্টেড করে তুলে কী হবে বলো তো! কত মানুষ তো ও সব ছাড়াই দিব্যি বেঁচে আছে।
ওকে বেঁচে থাকা বলে না। তোমাকে এ পর্যন্ত আট-দশটা নাটক দেখালাম, তবু তোমার নাটকে আগ্রহ হচ্ছে না দেখে অবাক হচ্ছি। কেন হচ্ছে না বলে তো!
নাটক দেখতে তো আমার ভালই লাগছে।
মোটেই না। তুমি দেখতে হচ্ছে বলে দেখছো। জোর করে ধরে নিয়ে আসি, তাই।
না অনিন্দিতা, ঠিক তা নয়। নাটক বা ফিল্মে একটা কৃত্রিমতার গন্ধ থাকে। কিছুতেই সেটা আমি ভুলতে পারি না।
আচ্ছা পাগল যা হোক! এইজন্যই বলি তোমাকে আর মানুষ করা গেল না।
অ্যাকাডেমিতেও টিকিট নেই। অনিন্দিতা মুখ ভার করে বলল, আজ যে কী হল! কোথাও টিকিট পেলাম না। নিশ্চয়ই তুমি মনে মনে ও রকমটা চেয়েছিলে। বেরসিক কোথাকার!
আমার ইচ্ছাশক্তির কি এত জোর আছে অনিন্দিতা?
আছে বোধহয়।
চলো হাঁটি। বন্ধ ঘরে বসে ও সব দেখার চেয়ে ভোলা হাওয়ায় একটু হাঁটাহাঁটি করা বরং অনেক ভাল।
হাঁটা একটা বিচ্ছিরি একঘেয়ে ব্যাপার। তুমি এত হাঁটতে ভালবাসো কেন?
হাঁটতে ভালবাসি তার একটা কারণ আছে। হাঁটতে হাঁটতে খুব ধীরে ধীরে চারদিকটাকে খুব ভাল করে অবজার্ভ করা যায়। ডিটেলসে।
কি জানি বাবা, চারদিকটা তো রোজই একইরকম আর একঘেয়ে।
ঠিক বোঝতে পারব না। জানোই তো আমার কথাটথা ভাল আসতে চায় না। অনেক কথা বুঝতে পারি, কিন্তু বোঝাতে পারি না।
অনিন্দিতা মৃদু একটু রহস্যময় হাসি হেসে বলল, আচ্ছা তোমার আর আমার সম্পর্কটা নিয়ে কখনও ভেবেছো?
কী ভাববো?
এই সম্পর্কটা আসলে কি? প্রেম ভালবাসা, না বন্ধুত্ব?
চয়ন একটু অস্বস্তি বোধ করে বলে, এটাও আমি ঠিক বুঝতে পারি না, অনিন্দিতা। আমি জীবনে কারও সঙ্গে প্রেমট্রেম করিনি। আমার ভিতরে আবেগ এত কম!
দূর বোকা, প্রেম একটা বায়োলজিক্যাল ব্যাপার। ওর জন্য এক্সপেরিয়েন্স দরকার হয় না। তবে ভয় পেও না। তোমার আর আমার মধ্যে বন্ধুত্বটাই আছে। অন্য কিছু নয়। কি, শুনে স্বস্তির শ্বাস ফেললে তো!
চয়ন একটু হেসে বলল, তা হবে। তবে তোমাকে আমি কখনও অপছন্দ করিনি তো। তোমার সঙ্গ আমার বেশ ভাল লাগে।
সেটা আমারও লাগে। প্ৰেম জিনিসটা তার চেয়ে কিছুটা বাড়তি জিনিস।
তুমি কখনও কারও প্রেমে পড়েছে অনিন্দিতা?
অনিন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, একবার।
ও।
শুনবে সে কথা?
চয়ন একটু মিটিমিটি হেসে বলল, সেটা কি ব্যর্থ প্রেম?
তা তো বটেই! আমার মতো মেয়েকে তার পাত্তা দেওয়ার কথাই নয়। দেয়ঙনি কোনোদিন। কিন্তু তার কথা ভাবলেই আমার চোখে জল আসে।
ও।
তুমি কৌতূহল দেখাচ্ছে না তো!
না। এ সব ব্যাপারেও আমার আগ্রহ নেই।
কেন নেই?
প্ৰেমটাও একটা আবেগসর্বস্ব ব্যাপার। বিয়ে-টিয়ে করলে সেই আবেগটা অনেকটাই কেটে যায়।
উল্টোটাও আছে।
থাকতে পারে!
তুমি ভীষণ নেগেটিভ টাইপের লোক!
তা হবে।
মোড় অবধি এসে অনিন্দিতা থমকে দাঁড়িয়ে বলল, এবার কি করব বলে তো! কোনদিকে যাবো?
চলো চৌরঙ্গি ধরে ঘটি। এসপ্লানেড অবধি গিয়ে বাস ধরব।
উঃ, হাঁটতেও পারো বটে তুমি আমার কিন্তু হাঁটু ব্যথা করছে। আচ্ছা, ফুচকা খেলে কেমন হয়?
তোমার না খুব অম্বল হয়?
সে তো আছেই! চলো ভিক্টোরিয়ার সামনে খুব ভাল ফুচকা পাওয়া যায়।
আমি যে ও সব খাই না। সহ্য হয় না।
সহ্য হয় কি না আজ পরীক্ষা হয়ে যাক। আমার ব্যাগে অ্যান্টাসিড আছে, ভয় নেই।
চয়ন মৃদু স্বরে বলে, আমি বোধহয় ও সব খেলে অজ্ঞান হয়ে যাবো।
মোটেই না। ওসব ভাবলেই তোমার হয়।
অনিন্দিতার ফুচকা খাওয়ার দৃশ্যটা মোটেই ভাল লাগছিল না চয়নের। বড় লোভীর মতো খাচ্ছে। একটু বাদে ওর আইঢ়াই অম্বল হবে, কড়ার নিচে ব্যথা হবে। তবু কেন খাচ্ছে? চয়ন মাঝে মাঝে খুব ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে ঠিকই, কিন্তু সে কখনও যা-তা খেতে পারে।
তুমি শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে রইলে একটু ঝালমুড়ি অন্তত খাও।
না অনিন্দিতা। আমার সহ্য হয় না।
বড় সাবধানী, বড় গুডি গুডি তুমি।
চয়ন একটা শ্বাস মোচন করে বলে, আমি ঠিক আমারই মতো। অপদাৰ্থ, অচল।
তোমার ওসব অটো সাজেশনই তোমাকে খেয়ে ফেলছে।
তাও জানি। তুমি আর খেও না। অনেক হয়েছে।
আচ্ছা আচ্ছা। একজন শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকলে খেতে ভাল লাগে না।
ফুচকার দাম মিটিয়ে ফের দুজনে হাঁটতে লাগল। আজ রবিবার। ঈষৎ শীতল সন্ধেবেলায় ময়দানে মানুষের ঢল নেমে এসেছে। ভিড়ের জায়গা চয়নের ভাল লাগে না।
এবার বাসে উঠবে চয়ন?
চলো।
বাসায় নিজের চিলতে ঘরখানার নির্জনতায় ফিরে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচল চয়ন। ছুটির দিনে আজকাল অনিন্দিতা তাকে টেনে হিচড়ে নানা জায়গায় নিয়ে যায় বা যেতে চেষ্টা করে। এই আউটিংটা তার একদম পছন্দ নয়। বড় নিরর্থক আর ক্লান্তিকর মনে হয়। নাটক দেখে বেড়ানোতেও সে তেমন কোনও আকর্ষণ বোধ করে না। এ বার সে অনিন্দিতাকে বলবে, আমি আর এসব পারছি না। ছেড়ে দাও আমাকে। বলাটা খুব শক্ত। সে কিছুতেই দৃঢ়ভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেনি কখনও।
