বিষ্ণুপদ একটু হাসল, এ সবও শুনতে হচ্ছে। তা ভাল। একটু শুনে নাও।
তা শুনছি। তা সত্যি কথা বলতে কি, আমার একটু দেমাকও হয়েছে বাপু। কী করব বলো তো!
বিষ্ণুপদ বলল, কখনও-সখনও একটু অহংকার করতে ভালই লাগে। কখনও তোকরোনি।
সেই কথাই বলছি। অহংকার করার মতো তো কিছু ছিল না। এই হল। তা হঁ গা, গৃহপ্রবেশ করতে হবে না? সাই যে খুব ধরেছে ভালরকম ভোজ খাওয়ানোর জন্য। আমরা তো তেমন করে কাউকে কখনও নেমন্তন্ন করে খাওয়াইনি। ছেলেমেয়েদের বিয়ে নমো-নমা করে সারতে হয়েছে। তা এবার কি একটু ভাল করে করবে নাকি?
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, লোককে খাইয়ে হবেটা কি? পয়সা উড়িয়ে দেওয়া বই তো নয়! লোকে পাত পেড়ে খেয়ে যায়, গিয়ে নিন্দেমন্দ করে—এটা ভাল হয়নি, ওটা বাদ গেছে। তার চেয়ে একটু পূজোটুজো দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়লেই হয়।
নয়নতারা হেসে বলে, তা হলে আমার অহংকারের কি হবে? লোকে যে বাড়ির কথা বলাবলি করছে তাদের কাছে মুখ দেখাব কি করে? দুয়ো দেবে যে! কৃষ্ণ যে মাস মাস পাঁচশো টাকা করে দিচ্ছে তা তো জমেই যাচ্ছে। আমরা তো অত টাকা খরচ করার পথই পাই না। তা সেই টাকায় হয় না?
বিষ্ণুপদ একটু ভেবে বলল, ইচ্ছে হলে দাও লাগিয়ে।
আমার বড় ইচ্ছে, একটা উপলক্ষ ধরে সবাই আবার একজোট হোক, সরস্বতী আর বীণাপাণিও আসুক।
আর বামা?
তাকে ডাকব? পাগল হলে নাকি! তোমাকে তো প্রায় মেরেই ফেলেছিল! ও ছেলেকে যে পেটে ধরেছিলাম সেইটে ভাবতেই লজ্জা হয়। কী কাণ্ডই করে গেল দুজনে!
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, যদি বামাকে নেমন্তন্ন না করে তা হলে আবার একটু খোঁচ থেকে যাবে। পাঁচজনের কাছে বলে বেড়াবে নানা কথা।
সে বলে বেড়াবেই। তাছাড়া ব্যাপার-বাড়িতে এসে সে যদি চেঁচামেচি করে, তাহলে তো সব পণ্ড হবে!
বিষ্ণুপদ একটু ভেবে দেখল, কথাটা ঠিকই। বামাচরণের মাথার ঠিক নেই। শ্যামলীও সুবিধের মানুষ নয়। দুজনে মিলে কী যে করবে তার ঠিক কি? বিষ্ণুপদ বলল, তাহলে থাক।
তাহলে মত দিচ্ছে তো? গৃহপ্ৰবেশ একটু ভাল করেই হচ্ছে তাহলে।
তোমার যখন ইচ্ছে তখন আর অমত করি কি করে? গৃহপ্রবেশের কথায় তোমার মুখখানা একেবারে ঝলমল করে উঠল যে!
নয়নতারার মুখ সত্যিই ঝলমল করছিল। হাসি আর ধরে না। বলল, দেমাকটা বড্ড চকমক করছে ভিতরে।
তাই দেখছি।
বামাচরণ এল আরও দুদিন বাদে, সন্ধেবেলায়। বিষ্ণুপদ নতুন বাড়ির দালানে বসে ছিল। একখানা ড়ুম জ্বলছে মাথার ওপর। তাতে দালানখানা ঝকমক করছে। ওপরতলায় মেশিন চালিয়ে মেঝে পালিশ করছে মিস্তিরিরা। এমন সময়ে শ্যামলীকে নিয়ে এসে হুড়মুড় করে ঢুকল বামা।
একটু আঁতকে উঠেছিল বিষ্ণুপদ।
বামা পায়ের ওপর একেবারে উপুড় হয়ে পড়ে বলল, বাবা, মাপ করে দিন। বড় অপরাধ হয়েছে।
বিষ্ণুপদ ব্যস্ত হয়ে বলল, ওরে, ওঠ ওঠ।
বামাচরণ উঠল না। হাপুস কাঁদতে লাগল।
শ্যামলী বলল, কদিন ধরেই কান্নাকাটি করছে। আমিও খুব বকাঝকা করেছি।
ওকে উঠতে বলো বউমা। আমার শরীর ভাল নয়। এ সব তেমন সহ্য হয় না।
শ্যামলী হাত ধরে টেনে বসাল বামাচরণকে। বল, তোমার জন্যই যত অশান্তি। বাবা তো বলেছিলেন দোতলাটা আমাদের দিয়ে দেবেন। তা হলে ওরকম করতে গেলে কেন?
বিষ্ণুপদর বুকের মধ্যে একটা হাঁচোড়-পাঁচড় হচ্ছিল। হাঁফ ধরে যাচ্ছিল। বলল, তোমরা বসে। শান্তভাবে কথা কও। বেশি উত্তেজক কিছু হলে আমার কেমন হাঁফ ধরে যায়।
পরিষ্কার মেঝের ওপর দুজনে পাশাপাশি বসল। বামা চোখের জল মুছে বলল, আমি মহা পাপী, আমাকে জুতো মারুন। নইলে নরকেও ঠাঁই হবে না।
বিষ্ণুপদ হাঁধরা গলায় বলে, একটু দম নিতে দে বাবা। বড় চমকে দিয়েছিল।
দুজনে ভয় পেয়ে চুপ করে গেল। সাড়াশব্দে টের পেয়েই বোধহয় নয়নতারা কোথা থেকে উড়ে এল যেন।
এ কি, তোরা এখানে কেন? কি করতে এসেছিস?
বামাচরণ তাড়াতাড়ি মায়ের পায়ের ওপর পড়তে গেল, মা! মা গো! মাপ করে দাও।
নয়নতারা দু হাত পিছিয়ে গিয়ে বলল, ওরে বাপ রে, মাপ চাওয়ার কি ঘটা কেন রে মুখপোড়া, হঠাৎ মাপ চাইতে এসে হাজির হলি কেন? মতলবখানা কি তোর?
বামাচরণ উঠে বসল। বলল, একটা অপরাধ হয়ে গেছে মা, তা বলে কি আর তার মাপ নেই?
শ্যামলী বলল, আমাদের তো তাড়িয়ে দিয়েছেন মা, নতুন করে আর কী শাস্তি দেবেন?
নয়নতারা বলল, শোনো বউমা, কথাটথা যা আছে সব আমার সঙ্গে আর রেমোর সঙ্গেই বলো। ওঁর সঙ্গে নয়। ওঁর শরীর ভাল নয়। আগের বার এসে তোমরা যা করে গেছ তাতে ওঁর কি অবস্থা হয়েছিল, তা পাঁচজনে জানে। এসো তোমরা ওপাশের পুরনো ঘরে গিয়ে বসো। আমি আসছি।
শ্যামলী একটা ঠেলা দিয়ে বামাচরণকে তুলে দিল। বিষ্ণুপদ দেখল, বামাচরণের চেহারাটা আরও খারাপ হয়েছে। রোগা পাশুটে, কেমনধারা যেন।
বাবা, আসি তাহলে?
বিষ্ণুপদ ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাল।
ওরা চলে যাওয়ার পর বিষ্ণুপদ কাঁপা বুক নিয়ে বসে রইল চুপটি করে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। শরীর কি আর দেবে। গৃহপ্রবেশের আগেই ফট হয়ে যাবে নাকি!
তা কামনা-বাসনা রাখতে নেই। গৃহপ্রবেশের আগেই হোক, পরেই হোক, শরীর যখন ছাড়ে ছাড়ুক, ভেবে কেন ব্যস্ত হওয়া?
উঠতে গিয়ে বিষ্ণুপদ টের পেল, হাঁটুতে বল নেই। ওঠা যাচ্ছে না। তাই ফের গা ছেড়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে চুপ করে রইল। পুত্ৰ শব্দটার অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না সে।
০৯৪. হেমন্তের স্নিগ্ধ বিকেল
হেমন্তের স্নিগ্ধ বিকেল। রবীন্দ্রসদনের দিক থেকে ডানহাতি ফুটপাথ ধরে দুজনে উত্তর দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। রবীন্দ্রসদনের টিকিট পায়নি তারা। সম্ভবত অ্যাকাডেমিরও পাবে না। টিকিট না পেলে অবশ্য তাদের কিছুই যায় আসে না। টিকিট বা নাটক দেখো একটা ছুতো মাত্র।
