নিমাই কৃতজ্ঞতায় ছলছলে চোখে বীণাপাণির দিকে চেয়ে বলে, তোমার বড় দয়া বীণাপাণি! তোমার জন্যই বুড়োটা আর বুড়িটা এখনও বেঁচে আছে। কত আশীৰ্বাদ করে তোমাকে! তবে তাদের তো বুদ্ধি নেই, বড় লোভী, কখন কি বলে, কি করে তার ঠিক নেই! তুমি ওদের ওপর রাগ কোরো না।
তোমাকে অত গদগদ হতে হবে না। ওরকম গদগদ হও বলেই তো তোমার সঙ্গে আমার পট খায় না। বউয়ের সঙ্গে অত হাত-কচলানো ভদ্রতা কিসের? তোমার ভাবখানাই এমন যেন পরের বউ চুরি করে এনেছো।
নিমাই আবার নিরাশ-হওয়া গলায় বলে, আমি বড় বোকা মানুষ। খুব বুদ্ধি করে কিছু কইতে বা করতে পারি না।
আজ তোমাকে বোকা মানুষ পেয়েছে। শুধু বোকা বলে বসে থাকলেই হবে! বোকাদেরও তো বাঁচতে হবে, না-কি? আচ্ছা বলো তো, এই বাক্সটা গুছিয়ে রওনা হচ্ছিলে কোথায়? আমার কাছে লুকিও না।
নিমাই ভারি লজ্জায় পড়ে গেল। মাথা নিচু করে মাটির ওপর আঙুল দিয়ে একটু আঁক কাটতে কাটতে বলল, বসন্তপুরের গোকুল একটা যোগালির কাজ দিয়েছিল। আজ সেইখানেই যাচ্ছিলুম।
যোগালির কাজ! সে কিরকম?
বিয়েবাড়িতে গোকুল রান্না করে। তার বেশ নাম-ডাক। বড় একটা বসে থাকে না। দুতিনজন যোগালি লাগে। মাছ কাটা, পেষা, জল তোলা—এইসব আর কি।
মা গো! তুমি ওইসব করতে যাচ্ছিলে?
দোষের কি? কাজ অত গায়ে মাখতে নেই। গোকুল একটু খাতিরও করে। তবে পাকাঁপাকি করতুম না। দুচারটে বড় জোর। পলের দোকানটাই ফেরি করব একদিন।
সে তো এখানেও করতে পারো। করবে?
এখানে একটা অসুবিধে। তোমায় সবাই চেনে। দোকান দিলে তোমার অপমান হবে না তো!
শোনো কথা! আমার আবার সম্মানটা কিসের? আর দোকানদারই বা কোন খারাপ?
বাঁচালে! আমি শুধু তোমার কথা ভেবেই এতদিন কথাটা মাথায় রাখিনি।
শোনো, খোলা রোদে হাওয়ার স্টল দিয়ে বসলে হবে না। মাথার ওপর ছাউনি না থাকলে বড় কষ্ট। তুমি রোগা মানুষ, ওসব সাইবে না। দিলে ঘর ভাড়া নিয়ে দোকান দিও।
ও বাবা! সে যে বেজায় ভাড়া চাইবে। বাজারের দোকান, সেলামিও চেয়ে বসবে নির্ঘাৎ।
ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না! যা লাগে তা আমি দেবো।
তুমিই তো দিচ্ছে। শরীর পাত করে দিচ্ছে। দরকার কি ওসব বাবুগিরির? মনোেহারী দোকান তো আর নয়! ফলের দোকান খোলামেলাই ভাল।
মনোহারীই বা নয় কেন?
ও বাবাঃ! পাগলী বলে কি?
ওসব পরে ভাবা যাবে। আজ বাদলা দিনে খিচুড়ি আর পোপর ভাজা খাবে?
বসন্ত যে বসে থাকবে বটতলায় আমার জন্য!
তোমাকে আজ বেরোতে দিচ্ছে কে?
তাহলে অন্তত তাকে খবরটা দিয়ে আসতে হয়! লোকটা অপেক্ষা করবে। কাল সকাল থেকে যজ্ঞিবাড়ির রান্না, আজ বেলাবেলি গিয়ে সব ব্যবস্থাপত্তর যোগাড়-যন্তর করার কথা।
ওই অলক্ষুণে বাক্সটা খুলে জামাকাপড় সব নামিয়ে রাখো। তারপর ছাতাটা নিয়ে এক দৌড়ে তাকে জানিয়ে এসো গে যে, যেতে পারবে না।
কথার খেলাপ হবে না। তাতে?
মোটেই হবে না! মাঝে মাঝে বাঁচার জন্য কথার খেলাপ করতে হয়। তাতে দোষ নেই। আর যোগালির কি অভাব নাকি? চারদিকে কত বেকার লোক!
তা বটে।
দোকান থেকে একটু ঘি এনো। রসময়ের দোকানে পাওয়া যায়। আর পঁচিশ পয়সার তেজপাতা।
ও বাবা! আজি তো দেখছি ভোজবাড়ি?
যাও, দেরি কোরো না।
উঠে পড়ল নিমাই। ছাতা মাথায় সে বেরিয়ে যেতেই দরজা। এঁটে দিল বীণাপাণি। না, এখন নিমাইকে তাড়ালে তার চলবে না। নিমাইকে তার দরকার।
তোরঙ্গটা বের করার আগে সে জানালাগুলো বন্ধ করে নিল। সাবধানের মার নেই! তোরঙ্গটা যখন খুলছে তখন বুক কাপিছিল ভীষণ। মস্ত ভারী প্যাকেটটা সে অস্থির হাতে টেনে হিঁচড়ে মোড়কটা ছিঁড়ে খুলল। যা দেখল তাতে তার চক্ষুঃস্থির। ডলার আর পাউন্ডের কয়েক কেতা নোট। মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছিল তার। তাড়াতাড়ি উল্টেপাল্টে যতদূর দেখল। কয়েকটা একশ ডলারের নোটও আছে। তোরঙ্গের নিচে জামাকাপড়ের তলায় জিনিসটা আবার চাপা দিয়ে রেখে তালা বন্ধ করল। সে।
একটু আগে নিমাই যখন চলে যাচ্ছিল তখন মনটা বিষ হয়ে ছিল বীণার। যাচ্ছে যাক। বেঘোরে কোথায় মরে পড়ে থাকবে হয়তো! তাই থাক! বীণা আর ভাববে না। ওর কথা। মনটা শক্ত হয়ে ছিল। যেই পগার খুন হওয়ার খবরটা পেল অমনি সব ওলট পালট হয়ে গেল কেন? মনটা নরম হল। কেন যেন মনে হতে লাগল, নিমাই ছাড়া সে একা থাকতে পারবে না! সে কি এই এত এত পড়ে পাওয়া টাকার জন্য? সে জানে, এ টাকার কথা জানলে নিমাই কিছুতেই তাকে এ টাকা ছুতে দেবে না। বড্ড ধর্মভীরু মানুষ।
বীণাপাণিকে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। সব দিক যাতে বজায় থাকে।
০০৯. আই সি এস ই পরীক্ষায়
আই সি এস ই পরীক্ষায় অনীশ পেয়েছিল শতকরা একাশি নম্বর। আর আপা পেয়েছিল। তিরাশি। সেই থেকে খুব গোপনে এবং গভীরে অনীশের একটা হীনম্মন্যতা দেখা দিয়েছে। হায়ার সেকেন্ডারিতে সে ওকে টপকে যেতে পারে, আবার নাও পারে। আপা ভাল মেয়ে এবং তার খুব ভাল বন্ধু। আপা তাকে সব বিষয়ে সাহায্য করতে চায়, যদিও অনীশের সাহায্য লাগে না। কিন্তু আপা এতই ভাল যে, অনীশের হীনম্মন্যতার কথা জানতে পারলে নিজের বাড়তি শতকরা দু নম্বর এখনই তাকে দিয়ে দিতে চাইবে। সেটা অসম্ভব জেনেও চাইবে। আপা একটু ও ধরনেরই। তামিলরা বেশ श বলে শুনেছে অনীশ। কিন্তু ব্যতিক্রম তো থাকেই! আপা সেই ব্যতিক্রম। এই কালো, রোগা, নিরহঙ্কারী, এবং সবসময়ে একটু ঘোরের মধ্যে থাকা মেয়েটি মোটেই বাস্তববাদী নয়। আঠারো বছর বয়সেও এই ছোটখাটো মেয়েটিকে মোটেই যুবতী বলে মনে হয় না, বরং বালিকা বলে ভ্ৰম হয়। আপা পুরোপুরি বালিকাও নয়, মনের মধ্যে এখনও অনেকটাই শিশু।
