রাঙা অবাক হয়ে বলে, ও কি বলছেন!
বিষ্ণুপদ খুব হেসে বলে, বলেই না! আমাকে তোমার খুব লোভী বলে মনে হয় না?
না না, সে কী কথা!
বিষ্ণুপদ খুব হেসে মাথা নেড়ে বলে, স্বীকার কর বা না কর, আমি কিন্তু খুব লোভী মানুষ। সারা জীবন পেটে খিদে নিয়ে কেটেছে। ভরপেট বড় একটা থাকিনি, ভালমন্দ তো দূরের কথা। জিভ তাই শেষ জীবনে শোধ তুলতে চায়। বুঝলে?
আপনি খান তো। ওসব ভাববেন না।
বলতে নেই, রাঙা আজকাল খাতির করে খুব। করারই কথা। সংসারে বাতিল শ্বশুর-শাশুড়ির কল্যাণেই তারা এত বড় দোতলা বাড়িটা ভোগ দখল করবে। কাজেই এখন সে শ্বশুর আর শাশুড়িকে একটুও কথা-টথা শোনায় না। সেবাটেবাও খুব করে।
পাতিলেবুর গন্ধওলা ছানার একটুখানি মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বিষ্ণুপদ বলল, বড্ড দেরিতে সব হল, বুঝলে, তবু হল তো!
কিসের কথা বলছেন?
এই সব যা হচ্ছে। বাড়ি হল, গরু হল, ভোগসুখ হল। সবই হল, তবু গলায় যেন একটা কাঁটা খচখচ করে।
কিসের কাঁটা বাবা?
গলার কাঁটা ওই বামা। যখনই ওর কথা ভাবি, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
ও সব ভাববেন না বাবা। মেজদাদার মাথাটাই গেছে।
সেটার কথাও ভাবি। মাথাটাই বা গেল কেন? আমাদের বংশে কেউ পাগল ছিল না। তোমার শাশুড়ির বংশেও না। আগের দিনে বিয়ের সময়ে এ সব দেখা হত। আজকাল আর হয় না।
মেজদার পাগলামি তো বংশগত নয়। লোভর তাড়সে আর মেজদিদির জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে হয়েছে।
তাই হবে। সে কি আর আসে-টাসে?
না। আপনার সেজো ছেলে তাঁকে খুব শাসিয়ে দিয়েছে।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ যেন ছানাটা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মুখের ছানাটা একটু জিত দিয়ে নেড়েচেড়ে বলল, আমাদের সকলেরই বড় খিদে, না বউমা? বিষয়সম্পত্তি, খাবারদাবার, যশ-প্রতিষ্ঠা, খিদের যেন শেষ নেই।
রাঙা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলল, আমি ভাবি কি জানো? মনে হয় সারা জীবন আমার যে সব খিদে চাপা ছিল তা ওই বামাচরণের ভিতরে ফুটে বেরিয়েছে। ভগবান ওকে সন্তান দেননি, সেটাও একটা কথা। ওরটা কে খাবে বলো তো! বসো বউমা, আমার কাছে একটু বসে।
বসছি বাবা, কিন্তু রান্না পড়ে আছে।
তোমার শাশুড়ি কোথায়?
শীতলাবাড়ি গেছেন।
তাঁর খুব পুজোআচ্চার বাই। বলে বিষ্ণুপদ হাসে।
রাঙা কাঠের চেয়ারটায় বসে বলে, আপনি আজ কিন্তু ছানাটা খাচ্ছেন না, নাড়ছেন শুধু।
এক একদিন রুচিটা থাকে না। রোজ কাঁচা ছানা না দিয়ে এক একদিন ছানা দিয়ে ডালনা বেঁধে তো মা। বোধহয় ভালই লাগবে। ছানার ডালনার কথা শুনেছি, খাইনি কখনো। জানো রাঁধতে?
সোজা তো। দেবোখন বেঁধে। আজ কষ্ট করে খেয়ে নিন।
বউমা, আজকাল আর রাতে রেমোর চেঁচামেচি শুনি না। জিজ্ঞেস করতে ভয় করে, সে কি মদ ছেড়ে দিয়েছে?
রাঙা একটু জিব কেটে বলে, একরকম তাই। গরুটা আনার পর থেকে খায় না।
কেন বলো তো?
তা জানি না বাবা। মনের কথা তো আর খুলে বলেন না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষ্ণুপদ বলে, বটতলার বন্ধুরাও আসে না, না?
আজকাল আসে না। উনি তো দেখছি সন্ধেরাতেই বাড়ি চলে আসেন।
তোমাকে কিছু বলে না?
দুঃখ করেন, ওঁর তো খুব ইচ্ছে ছিল পাকা বাড়ি করে আপনাদের রাখবেন। উনি পারেননি, বড়দাদা করে দিলেন। এইজন্যই দুঃখ।
জানি। আমিও চেয়েছিলাম আমার হেরো ছেলেটা বাড়িটা করে দেখাক।
উনি পারতেন না বাবা। ওর টাকা নেশায় আর জুয়ায় খরচ হয়ে যাচ্ছিল। টাকা উপার্জনও তো ভাল পথে করত না।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, আমারও সেই সন্দেহ ছিল।
বড়দাদা বলেছেন একটা দোকান করে দেবেন।
বলেছে? বলে আগ্রহে অঁকে বসে বিষ্ণুপদ, কী বলেছে?
বটতলায় একখান সাইকেলের দোকান করে দেবেন।
সাইকেলের দোকান? মানে সাইকেল সারাই নাকি?
না। সাইকেল আর সাইকেল পার্টসের দোকান। এ দিকে নাকি সাইকেলের দোকান নেই।
কথাটা এগিয়েছে?
হ্যাঁ। শুনেছি, দোকানঘর হচ্ছে। প্লাস্টিকের জিনিস, স্টিলের বাসন, কেরোসিন স্টোভ এ সবও নাকি থাকবে দোকানে।
রেমো বলেনি তো আমাকে! এ তো গুরুতর খবর।
বড়দা বলতে বারণ করেছেন। আমি তো পেটে কথা রাখতে পারি না, তাই আপনাকে বলে ফেললাম।
বেশ করেছে। অনেক জ্বালাপোড়ার মধ্যে এই একটা ভাল খবর। বুকটা ঠাণ্ডা হল। আমার মনে হয়, মদ ছাড়লে রেমো অনেক কিছু পারবে। তোমার কি ধারণা?
কে জানে বাবা! তবে ওঁর কথা তো কিছু বলা যায় না। আজ ভাল তো কাল খারাপ। মদের নেশা ছাড়া নাকি শক্ত। বেশির ভাগ লোকই পারে না।
নেশা জিনিসটাই শক্ত জিনিস। তোমার শাশুড়ি কি পারবে দোক্তাপাতা ছাড়তে?
কষ্টেসৃষ্টে ছানাটা শেষ করল বিষ্ণুপদ। তারপর ওষুধ খেল। তারপর বসে রইল। মিস্ত্রিরা কাজে এল সব। আজকাল মিস্ত্রির সংখ্যা কমে গেছে। বাইরে প্লাস্টারিং হবে বলে তোড়জোর হচ্ছে। ছাদে ট্যাংক বসেছে। বাড়িটা যেন বুক ফুলিয়ে হাসছে এখন।
জানালা দিয়ে সম্মোহিতের মতো চেয়ে থাকে বিষ্ণুপদ। এত বড় পাকা বাড়ি তাদের দেশেও ছিল না। জমিজমা ছিল। কিছু, বাড়ির চৌহদ্দিও বড়ই ছিল। কিন্তু সবই কাঁচা ঘর। বলতে কি, এই প্রথম তারা পাকা বাড়িতে বাস করবে।
নয়নতারা ঘরে ঢুকে বলল, শুনলে তো, লোকে বলছে আজকাল নাকি অহংকারে আমার মাটিতে পা পড়ছে না।
বিষ্ণুপদ আচমকা গলার স্বর শুনে একটু চমকে গেল। বাড়ির দিকে চেয়ে এমন মজে ছিল যে, নয়নতারার আসাটা টের পায়নি। বলল, কেন?
এই সবাই বলছে। এ গায়ে তো এত বড় বাড়ি কারও নেই, তাই।
