মাথায় একখানা ঠাণ্ডা হাত এসে পড়তেই সে বলে উঠল, কে, মা নাকি?
না গো, আমি।
ওঃ, তুমি! কাকে বলল তা নিজেও বুঝল না হেমাঙ্গ। কিন্তু খুব চেনা একজনকেই বলল যেন। ফের একটা ঘোরের মতো এসে কোথায় যেন নিয়ে গেল তাকে।
অনেক রাতে ঝড়বাদল একটু কমতেই এসে হাজির হল বাকা আর ফজল।
বাঁকা বলল, ওঃ, কী লণ্ডভণ্ড কাণ্ডই হয়ে গেল। গাঁয়ের বহু বাড়ি পড়ে গেছে। আপনারটা কী করে দাঁড়িয়ে আছে তাই ভাবছি। কপালের জোর বটে আপনার। আমি তো ঝড়ের গতিক দেখে ভাবছিলাম, গেল এবার বাবুর বাড়ি। আসার উপায় ছিল না। উড়িয়ে নিয়ে যেতে। আজ নিৰ্ঘাৎ কয়েকটা নৌকা ড়ুবেছে।
হেমাঙ্গ একটু ক্ষীণ হাসল। বলল, এ ঝড়টা আমার দু চোখ ভরে দেখা হল না।
ওঃ, কী যে আপনার সব বাই চাপে! খুপরিতে আজ ফজল থাকবে। বিছানা নিয়ে এসেছে। বলে দিয়েছি রাত জেগে পাহারা দেবে।
কোনও দরকার নেই। ও ঘুমোক। না না, ঘুমোলেই ও মড়া। জেগে বসে থাকবে।
হেমাঙ্গ ঘুমোলো। তারপর ঘুমের মধ্যেই ফের আধো-জাগা একটা ঘরের ভিতরে চলে এল। বারবার একখানা আবছায়া মেয়ের মুখ চলে আসছে চোখের সামনে। মেয়েটা মাঝে মাঝে তার মাথার কাছটিতে এসে বসছে। চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।
ঠিক চিনতে পারছে না সে। আবার চেনা-চেনা লাগছে। কে মেয়েটা।
আমি।
আমি কে?
একটু হাসির শব্দ হল, আমি তো।
ওঃ তুমি!
হেমাঙ্গ বুঝতে পারল না। তবু যেন বুঝল। হাসল। ঘুমিয়ে পড়ল।
০৯৩. পুত্রকন্যা শব্দগুলির অর্থ
বিষ্ণুপদ কদিন যাবৎ পুত্রকন্যা শব্দগুলির অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে মনে মনে। তার চেয়েও বড় কথা সম্পর্কটা কিসের, কেন সম্পর্ক সেইটে—এত কিছু জানার পরও নতুন করে জানতে চায় সে। এ বাড়িতে তেমন কোনও শাস্ত্রটাস্ত্র নেই, ভাল। ডিকশনারি নেই, নাগালের মধ্যে তেমন কোনও পণ্ডিত ব্যক্তি নেই যার কাছে নতুন করে এ বিষয়ে পাঠ নেবে। তাই সারাদিন শুয়ে শুয়ে মনে মনে মানে খুঁজে যাচ্ছে সে। সব বিশ্বাস, সব বলভরসা পুরনো ইমারতের মতোই ধসে পড়ে গেল যে সেদিন, যেদিন বামাচরণ তার বাপান্ত করে গেল।
প্রায় দু-তিন ঘন্টা বিষ্ণুপদর জ্ঞান ছিল না। প্ৰেশার ঠেলে উঠেছিল দুশোর ওপরে। পুলিন তেমন দরের ডাক্তার না হতে পারে কিন্তু ঠেকা সে-ই দিয়েছিল। শোরের ওষুধ দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, হাতের শিরা কেটে খানিক রক্তমোক্ষণ করে দিয়েছিল। বলেছিল, ওরে বাবা, আমরা সেকেলে তোক। আধুনিক চিকিৎসা না জানতে পারি, কিন্তু পুরনো চাল এখনও ভাতে বাড়ে।
দুদিনের মধ্যেই খবর পেয়ে কৃষ্ণজীবন কলকাতা থেকে একজন বড় ডাক্তারকে এনে দেখায়। ডাক্তার মেলা ওষুধপত্র দিয়ে গেছে। বলেছে, শুয়ে থাকতে হবে কিছুদিন। তেমন ভয়ের নাকি কিছু নেই।
মানুষের অসুখটা যে কোথায় তা ডাক্তাররা কি ঠাহ পায়? এই যে শরীরটা কাটা কলাগাছের মতো পড়ে গেল সেদিন, তার কারণ কি শুধু শরীর? মন নয়? বামাচরণের ওইসব কথা শোনার পর থেকেই শরীরের ভিত কেঁপে গেল। সেই থেকে ভাবছে আর ভাবছে। শরীর হয়তো সারবে, মন সারায় কে!
ধাঁ ধাঁ করে বাড়িটা প্রায় উঠে গেল। মেঝেতে টালি বসানোর কাজ চলছে। জানালা দরজা বসানো হচ্ছে। ইলেকট্রিক মিস্ত্রি লাইন বসাচ্ছে। এলাহি ব্যাপার। জানালা দিয়ে সব দেখতে পায় বিষ্ণুপদ। জীবনের বারো আনা কেন, পনেরো আনাই কেটে গেল ভাঙা ঘরে। বাকি আর কটা দিন! তাও আয়ু ফুরোনোর আগে যদি বাড়ি শেষ হয় তবে পাকা ঘরে মরার সুখটা অন্তত পারে। সারাদিন চেয়ে চেয়ে কাণ্ডটা দেখে বিষ্ণুপদর মনটা যেন কেমন হয়ে যায়। বাড়িতে সুখ নেই, টাকায় সুখ নেই, সংসারে সুখ নেই। সুখ যে কোথায় আছে কে জানে!
রামজীবন আর কিছু পারেনি তবে মাসটাক আগে হঠাৎ একটা দুধেল গাই বাছুর সমেত কোত্থেকে কিনে এনেছে। এনেই বলল, এখন আপনার একটু ছানাটানা খাওয়ার দরকার।
গরু দেখে বিষ্ণুপদর চোখ চড়কগাছ। বলল, ও বাবা, এ মরা পেটে দুধ ছানা সইবে নাকি?
খুই সইবে। আপনার শরীরে তো সারবস্তু কিছু নেই। দুধ সহ্য না হোক, ছানা খাবেন। এ খুব তেজী গাই, দিনে দুবেলা মিলিয়ে পাঁচ সের দুধ দেয়।
বিষ্ণুপদ খুশি হয়ে বলে, তা হলে পটল আর গোপালও দুধ খেতে পারবে। ওদের বাড়ের বয়স, কচু-ঘেঁচু খেয়ে থাকলে কি বাড় হয়?
আমরা কচু-ঘেঁচু খেয়েই বড় হয়েছি। বাড়ের বয়সে এমনিতেই বাড়ে। তা খাবেখন ওরাও।
বিষ্ণুপদ বলল, গরুর পিছনে খাটুনি আছে বাবা। বড় সুখী জীব। যত্ন করতে হয়। তুই তো আলায় বালায় ঘুরিস, গরু দেখবে কে?
রাখাল রাখব।
তবেই হয়েছে। এ কি ভাড়াটে লোকের কাজ? নিজে হাতে করতে হয়।
তাই করব। আপনি বললে তাই করব।
গো-সেবা করলে অনেক শেখা যায়, জানা যায়। অবোলা প্রাণী। কিন্তু তারও বলার মতো কথা আছে। বুঝবার চেষ্টা করতে হয়।
সেই থেকে রামজীবন গরু নিয়ে খুব মেতে আছে। ঘাসের মাঠে বেঁধে দিয়ে আসে। দুবেলা জাবনা দেয়। স্নান করায় নিয়মিত। খোল ভূষি কিনতে হাটে যায়। ভেটেরিনারি ডাক্তার দেখিয়ে এনেছে। গরুটা যত্ন-আত্তি পেয়ে বেশ তেল চুকচুকে হয়ে উঠেছে। দুধটাও দেয় খাসা। সকালে বাতাসার গঁড়ড়া দিয়ে বেশ খানিকটা ছানা খায় বোজ।
সেই দৈনিক বরাদ্দটা নিয়ে রাঙা এসে ঘরে ঢুকল। হাতে গরম ছানার প্লেট।
বাবা, আপনার ছানা।
বিষ্ণুপদ উঠে বসে বলল, এটা থেকে তোমার শাশুড়ি মায়েরটা কি তুলে রেখেছো?
তাঁর জন্য আছে। আপনি খান।
বিষ্ণুপদ প্রসন্ন মনে প্লেটটা হাতে নিয়ে রাঙার দিকে চেয়ে বলে, আচ্ছা মা, আমি কি খুব লোভী মানুষ?
