তা বললে হয়? নদীর ধারে হাওয়ার নানা চক্কর। তার ওপর শীতের বাদলা, এ বড় ভয়ংকর খারাপ জিনিস। এ ঘটা ড্যাও বটে। শেষে অসুখ গাড়িয়ে গেলে জবাবদিহিটা করব কি?
বাসন্তী তেমন না ভেবেচিন্তে হঠাৎ বলে উঠল, আমি রাতে এসে থাকবখন।
কথাটা মুখ ফসকা, বলে ফেলেই বোধ হয় লজ্জা পেয়েছিল। বাঁকা চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি, না?
বাসন্তী খুব মিইয়ে গেল এ কথায়।
বাসন্তীর ওপর একটু মায়া হল হেমাঙ্গর। বেচারা! কথাটার যে গৰ্হিত দিক আছে তা তো বোঝেনি। হেমাঙ্গর প্রতি টান থেকেই বলেছে। হেমাঙ্গ বলল, তাহলে বরং ফজল এসে থাকুক। পাশের খুপরিটায় তো চৌকি আছে। বিছানা আনলেই হবে।
বাঁকা বলল, ফজল থাকবে? থেকে লাভ আছে কিছু? ওরা যা ঘুম গায়ের ওপর দিয়ে মোষ হেঁটে গেলেও টের পায় না। ওর থাকাও যা না থাকাও তাই।
মাথাটা টিপটিপ করছিল হেমাঙ্গর। গা ভরে জ্বর আসছে। জ্বরটা সম্ভবত একটু ভোগাবে। আবহাওয়া আরও খারাপ হচ্ছে। বাতাসের জোর বাড়ছে, বৃষ্টি বাড়ছে। ঘরে এসে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ল সে। একটু কাঁপুনি হল। বাসন্তী তুষের আগুনটা দুপুরের আগেই এনে দিল ঘরে। বলল, বাঁকা চাচা তোমার জন্য কী একটা ব্যবস্থা করতে গেল গো দাদা। তুমি ওর বাড়িতেই চলে যাবে?
হেমাঙ্গ বলল, ওর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এত যত্ন করবে যে তাতে আমার হাফ ধরে যাবে। কিন্তু কী করব বল! বাঁকা যদি নিয়ে যেতে চায় তো যেতেই হবে।
মাথাটা টিপে দেবো?
না, এখন থাক।
তাহলে পায়ের তেলোয় গরম তেল মালিশ করে দিই?
দে। তার আগে ওষুধের স্টকটা বের কর। দেখি কী আছে।
বাসন্তী একটা টিনের বাক্স নিয়ে এল। জ্বর আর ইনফ্লুয়েঞ্জার চার-পাঁচ রকম ওষুধ থেকে বেছে নিয়ে দুটো একসঙ্গে খেয়ে নিল হেমাঙ্গ। ওষুধ তার ভাল লাগে না।
বাসন্তী তার পায়ে খুব যত্ন করে গরম তেল মালিশ করে মোজা পরিয়ে পা কম্বলে ঢেকে দিয়ে গেল রুটি করতে।
আধঘন্টা বাদেই বাকা এসে বলল, কপালটাই খারাপ। এই শরীরে আপনি আমার বাড়িতে যাবেন, তা ভ্যানগাড়ি একটাও নেই এখন। কোথায় ধান তুলতে গেছে, বিকেলের আগে ফিরবে না। থাকলেও লাভ ছিল না। এ বৃষ্টিতে ছাতার আড়াল দিয়ে তো আর নেওয়া যাবে না। ভিজবেনই। তার চেয়ে ওবেলা বৃষ্টিটা ধরলে বরং নিয়ে যাওয়া যাবে। ফজলকে বলেছি, জানালার দিকটা আড়াল করে একটা ত্রিপল টাঙিয়ে দিতে। ফাঁকফোকর দিয়ে বাতাস না এসে ঢোকে।
হেমাঙ্গ শুধু অসহায়ভাবে হাসল।
বৃষ্টি আর বাতাস বাড়তে লাগল। রীতিমতো ঝড়ের গতিতে বাতাস বইতে লাগল দুপুরের পর। চারদিক অন্ধকার। এই চমৎকার প্রাকৃতিক ব্যাপারটি হেমাঙ্গ দেখতে পাচ্ছে না। তার ঘরের দরজা-জানালা এঁটে বন্ধ। নদীর দিকের জানালা ঢেকে ত্রিপল টাঙিয়ে দিয়ে গেছে ফজল। ওষুধের গুণে এবং ঘর গরম থকায় একটু হাসফাস লাগে হেমাঙ্গর।
বাসন্তী গরম রুটি আর তরকারি খাইয়ে বাসন-টাসন ধুয়ে রেখে একবার বাড়ি গিয়েছিল। আবার চলে এসে ঘরের একধারে বসেছে।
কেমন লাগছে এখন তোমার।
একটু ভাল। ওষুধের গুণটা কেটে গেলে অবশ্য আবার জ্বর উঠবে।
কী হবে গো দাদা?
মরব না, তোর ভয় নেই।
ছিঃ, মরার কথা মুখে আনতে আছে? আমি বুঝি সে কথা বলেছি?
অত ভাবছিস কেন? ঠাণ্ডা লেগে সর্দি-জ্বর। তুই আর বাঁকা এমন করি যে আমার এখানে আসতে এখন ভয় করে।
আচ্ছা বলো তো, আমি কী করলুম আবার? এখানে তোমার যত্ন-আত্তি করে করে বলো! তুমি শহুরে মানুষ, আমাদের। মতো কি তোমার সয়।
একটু বিরক্ত হয়ে হেমাঙ্গ বলে, আমি আর শহুরে লোক নেই। দেখছি না কেমন লাঙ্গল চালাতে পারি, নৌকো বাইতে শিখেছি। আমার শরীর অনেক পোত্ত হয়েছে আজকাল।
বাসন্তী খুব হাসল। তারপর বলল, তোমার মতো কিম্ভূত মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। একখানা আস্ত পাগল।
দেশে পাগলের অভাব কি? কত পাগলই তো দেখেছিস?
আহা, তুমি কি তাদের মতো নাকি? কী বললাম, কী বুঝলে। তুমি হচ্ছ ভাবের পাগল।
হেমাঙ্গ একটু অস্থিরতা বোধ করে বলল, ওরে বাসন্তী, অসুখে না হোক, দম বন্ধ হয়েই মরতে হবে দেখছি। জানালা। হোক, দরজা হোক একটা কিছু একটু খুলে দে। ঘরে অকসিজেনের অভাব হচ্ছে।
অকসিজেন? ওঃ, হ্যাঁ। দাঁড়াও। কিন্তু কী বৃষ্টি দেখেছে? চতুর্দিক থেকে ছাঁট আসছে।
উঠোনের দিকটায় একটা জানালা সামান্য ফাঁক করল বাসন্তী। বাইরে তুমুল ঝড়। জানালা ফঁক হতেই হিম ঠাণ্ডা হাওয়া আর বৃষ্টির ঝাঁপটা দাওয়া পেরিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরে। ভয়ে পিছিয়ে এল, ও মা গো!
জানালাটা দড়াম করে খুলে ফের দড়াম করে বন্ধ হয়েই ফের খুলল। বাসন্তী ঝাঁপিয়ে পড়ে জানালা টেনে বন্ধ করে বলল, হবে না।
ঘরে একটা প্রদীপ জ্বলছিল। হাওয়ায় সেটা নিবে গেছে।
বাসন্তী হাতড়ে হাতড়ে দেশলাই খুঁজে সেটা জ্বালাল, হ্যারিকেনটা জ্বালাই দাদা?
খবরদার না। হ্যারিকেনের গ্যাসে কত লোক মারা গেছে।
ও বাবা, তাহলে থাক।
শোন, খুপরির দিকটার দরজাটা খুলে রাখ। আর খুপরির ঝাঁপের জানালাটা একটু ফাঁক করে রেখে আয়, তাহলে ভেন্টিলেশনটা হবে।
তাই করল বাসন্তী। এসে ফের খাপ পেতে বসে বলল, এখন কেমন লাগছে?
হ্যাঁ। ফ্রেশ বাতাস পাচ্ছি। খুব দুর্যোগ, না রে?
ভীষণ। ভটভটি বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর সাজাতিক ঢেউ দিচ্ছে। যা ঝড় আর বৃষ্টি! চারদিক ঘুঘুটি অন্ধকার।
ঝড়বৃষ্টি চলতে থাকল। সন্ধের পর জ্বর ফিরে এল হেমাঙ্গর। শীত করে কাঁপুনি দিয়ে। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। আর তার মধ্যেই বাস্তব আর ঘোর মিলেমিশে যেতে লাগল।
