চুপ করে আছ যে! তোমার খবর তো কিছু বললে না।
আমার খবর কিছু নেই রশ্মি।
গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছ এখনও?
মাঝে মাঝে।
আমার কিন্তু তোমার নদীর ধারের বাড়িখানার কথা খুব মনে পড়ে। ভারি কিউট, সুন্দর বাড়িটি তোমার। যদি আমাদের বিয়ে হত তাহলে আমি তোমাকে ওখানেই হানিমুন করতে বলতুম।
একটু হাসল হেমাঙ্গ। বলল, থ্যাংক ইউ।
তুমি এখানে বেড়াতে আসবে বলেছিলে। সত্যিই আসবে।
হেমাঙ্গ বলে, কী হবে বেড়াতে গিয়ে বলো তো! প্লেনের যা ভাড়া হয়েছে তাতে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছেটাই চলে যায়। আর কী জানো, ভেবে দেখেছি বেড়ানোর কোনও মানে হয় না। দেশ দেখে বেড়ানো একটা পণ্ডশ্ৰম মাত্র। বরং এই যে কাছেপিঠে যাই, নিজের দেশটাকে বুঝবার চেষ্টা করি, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করি এতে অনেকটা গভীরতা খুঁজে পাই।
তুমি বরাবরই একটু অন্যরকম। অলওয়েজ ইন সার্চ অফ সামথিং। সেই জন্যই তুমি সবসময়ে ইন্টারেস্টিং।
কী যে বলো! আমার মনের ভিতরটা যদি দেখতে পেতে!
দেখার চেষ্টা কি করিনি? সেই যে গাঁয়ের স্কুলে অডিট করতে গিয়েছিলে সেই প্রথম দিনটি থেকেই তোমাকে লক্ষ করে আসছি। প্রথম দিন থেকেই মনে হয়েছিল তুমি নরম মনের মানুষ। তোমার খুব একটা স্ট্রং পারসোনালিটি নেই ঠিকই, কিন্তু তোমার ভিতরে একটি কৌতূহলী শিশু আছে। পৃথিবীটা তোমার কাছে সহজে পুরনো হবে না। এটা কিন্তু একটা মস্ত কমপ্লিমেন্ট, বুঝেছ?
হয়তো ঠিকই বলেছ। বিয়ে করার কথা ভাবছ নাকি?
না তো!
ভাল থেকো।
তুমিও ভাল থেকো।
এইভাবে শেষ হল টেলিফোন পর্ব। কিন্তু রেশ থেকে গেল। টেলিফোন রেখে দেওয়ার পর রশ্মিকে নিয়ে অনেক ভাবল হেমাঙ্গ। ভাবল প্রেম-ভালবাসা ইত্যাদি নিয়ে। ভাল মানুষে মানুষে সম্পর্ক নিয়ে। তারপর তার মনে হল, দুটি কাঁটা যেমন ক্ৰমাগত উল বুনে বুনে তৈরি করে সোয়েটারের প্যাটার্ন, দুটি মানুষ কি তাই পারে? সম্পর্ক কি ওইরকম, উলের মতো নানা নকশা সৃষ্টি করে যাওয়া?
বিয়ে, প্রেম ইত্যাদি তামাদি হয়ে যাচ্ছে দুনিয়ায়। ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ায় রোমান্টিক প্রেম কবেই নির্বাসনে গেছে। আছে কেবল দগদগে যৌন সম্পর্ক। ওই সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ছে মানুষ। বিয়ে করছে না, একসঙ্গে থাকছে, ছেলেপুলে হচ্ছে, বাঁধা পড়ছে না। পৃথিবীর ভবিতব্য কি তাহলে ওটাই? কুকুর বেড়ালের মতো শুধু দেহের প্রয়োজনে একসঙ্গে হওয়া এবং ফের আলাদা হয়ে যাওয়া, ইচ্ছে হলেই?
হেমাঙ্গ কিছুটা অস্থির বোধ করতে থাকে। মাঝে মাঝেই জীবন থেকে বিষধর সাপের মতো নানা প্রশ্ন উঠে এসে তাকে ছোবল দিয়ে যায়। বিষ অনেকক্ষণ জর্জরিত রাখে তাকে।
আজকাল মা নিয়ম করে দিয়েছে, শনি আর রবিবার বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে। নিয়মটা যে মানতেই হবে, এমন নয়। কিন্তু মা তার জন্য ইদানীং এত বেশি চিন্তিত আর উদ্বিগ্ন যে, সে না গেলে বা যেতে না চাইলে। প্রেসার বাড়ে, হার্টে প্যালপিটিশন হয়।
উইক এন্ডটা মায়ের কাছে বিডন স্ট্রিটে যেতে ইচ্ছে করছিল না। গাঁয়ের বাড়িটা তাকে ডাকছে। দু মাস যায়নি। বিডন স্ট্রিটে মাকে ফোন করে জানিয়ে দিল, শনিবার বাইরে যাচ্ছে। কোথায় তা অবশ্য বলল না। না বললেও বাঁকা মিঞার কাছ থেকে মা ঠিকই পরে খবর পেয়ে যাবে। কিন্তু পরের কথা পরে। এখন যে তার হাফ ধরে যাচ্ছে।
প্রচণ্ড শীত, মেঘলা আকাশ, টিপটিপ বৃষ্টি আর উত্তাল নদী পেরিয়ে যখন ভটভটি তার ঘাটে লাগল তখন মনটা ভাল লাগছিল বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে হাঁচি এবং শারীরিক অস্বস্তি টের পাচ্ছিল সে। পিছল ঘাট বেয়ে ওপরে উঠেই বৃষ্টির সহস্র শরে বিদ্ধ হতে হতে সে ভাবল, মেরেছে। জ্বর হয়ে পড়ে থাকলে যে সব মাটি।
বাসন্তী এল, বাঁকা মিঞা এল, ফজল এল। অনেক দিন বাদে যেন আপনজনদের কাছে ফেরা।
বাসন্তীই টের পেল সবার আগে, ও দাদাবাবু, তোমার চোখ অমন ছলছল করছে কেন? মুখখানাও যে একটু লাল মতো! জ্বর বাঁধিয়েছ নাকি?
বাঁকা মিঞা নাড়ি ধরে কিছুক্ষণ নিবিষ্ট হয়ে থাকার পর বলল, একশর ওপর। এখন কী হবে বলুন তো! এখানে না পাবেন বদ্যি, না ওষুধ। এর জন্যই তো বলি এখানে ঘাটি করার দরকার নেই।
কেন বাঁকা, এখানে কি মানুষের জ্বরটর হয় না? তারা যা করে আমিও তাই করব।
তাদের শরীরের ধাত আর আপনার শরীরের ধাত কি একরকম? এখানকার ডাক্তার কে জানেন? ওই বিশু মুদি। অসুখ হলে লোকে গিয়ে বিশুর কাছে ওষুধ চায়। বিশুর সাত পুবুষে কেউ ডাক্তার নয়, তবু ওই বিশুই ওষুধ বেচে। এমন কি পেনিসিলিন অবধি।
জানি।
আপনাকে বিশু ওষুধ দিলে পাবেন?
হেমাঙ্গ হাসল। বলল, সামান্য সর্দিজ্বর। অত ঘাবড়াচ্ছ কেন? বিশুর দোকানে যে ওষুধ পাওয়া যায় তাই ঢের। বিও না জানুক, আমি তো খানিকটা জানি। দরকার হলে ওষুধ আনিয়ে নেবো।
বাসন্তী বলল, এর আগে একবার কিন্তু তুমি কিছু ওষুধ এনে রেখে গিয়েছিলে। সেগুলো বের করে এনে দেবো?
না, থাক। তুই খুব গরম চা খাওয়া আমাদের। দুপুরে আজ রুটি করিস আর সন্ধের পর ঘরে একটু তুষের আগুন করে দিয়ে যাস।
বাঁকা মিঞা মাথা নেড়ে বলে তা হবে না। আমার একটা দায়িত্ব আছে। নদীর ধারের ঘরে থাকলে আপনার নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। আমার পাকা ঘরখানায় থাকবেন। আমি গিয়ে সব ব্যবস্থা করছি। ফজল, দৌড়ে গিয়ে তোর মাকে বল তো, ঘরটা তৈরি রাখতে।
অত ভেবো না বাঁকা। আমি এখানেই থাকতে পারব। ঘরের জানালা-দরজা এঁটে দিলে হাওয়া লাগবে না।
