মণীশ একটু হেসে বলল, তোমার কথা আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে অপু। হয়তো তোমার পক্ষে তা সম্ভব।
ফ্ল্যাটের অন্য একটা ঘরে আর একজনও ভালবাসার যন্ত্রণায় বিদ্ধ হচ্ছিল বিছানায় শুয়ে। খুব শীত। কিন্তু এই ঠাণ্ডাতেও সে বার বার উঠে জল খাচ্ছিল। সমস্ত শরীরে কেমন একটা সিরসিরে ভাব। একটা উৎকণ্ঠা। সঙ্গে অচেনা ভয়।
কয়েকদিন আগেই দেখা হয়েছিল। কী আশ্চর্য উদাসীন, বিষণ্ণ, গম্ভীর হয়ে গেছে লোকটা! ও কি সত্যিই রশ্মিকে ততটা ভালবাসত? কোনওদিন বিশ্বাস হয়নি ঝুমকির।
অনেক লোক ছিল সেদিন চারুশীলার বাড়িতে। তবু ঘুরেফিরে তাদের দেখা হয়ে যাচ্ছিল। চোখাচোখি হচ্ছিল বারবার।
শেষ অবধি তাদের দেখা হল একটা নির্জন ঘরে। কারা ক্যারম খেলতে খেলতে ছিটোনো গুটি ফেলে চলে গেছে। একা একা হেমাঙ্গ স্ট্রাইকারে টোকা মেরে গুটি ফেলার চেষ্টা করছিল।
ঝুমকি ঢুকেই বেরিয়ে আসছিল লজ্জায়।
হেমাঙ্গ ডাকল, শুনুন।
ঝুমকি দাঁড়াল।
হেমাঙ্গ হঠাৎ বলল, আপনি আমাকে খুব অপছন্দ করেন না?
অবাক ঝুমকি বলল, কেন? অপছন্দ করব কেন?
মনে হয়।
ও।
০৯২. একটা মধ্যযুগীয় শাসনতন্ত্র
হেমাঙ্গদের বাড়িতে এখনও একটা মধ্যযুগীয় শাসনতন্ত্র বহাল আছে। এখনও এ বাড়ির ছেলেমেয়েরা যা খুশি করতে পারে না এবং করার কথা ভাবতেও পারে না। একটা অদৃশ্য শাসন এবং দৃশ্যমান জ-কুঞ্চন তাদের আতঙ্কিত এবং সতর্ক রাখে। প্ৰেমঘটিত বিয়ে অবশ্য একটা-দুটো ঘটেছে, কিন্তু তাও আবার বর্ণে মিললে তবেই। কাজেই এ বাড়ির ছেলেমেয়েরা প্রেমে পড়তে হলেও আগেভাগে হিসেব করে নেয়।
হেমাঙ্গ জানে, সেও স্বাধীন নয়। স্বাধীনতা একটা মনোভাব যা ব্যক্তিত্বের ব্যাপার। সেটা কেমন তা অবশ্য হেমাঙ্গ জানে না। হয়তো সেটা যথেচ্ছাচার বা উচ্ছলতাই হবে। যখন যা মনে এল করে ফেললাম, কারও তোয়াক্কা করলাম না। হেমাঙ্গ সেটা ইহজীবনে পেরে উঠবে বলে মনে হয় না।
এই যে গরচার বাড়িতে বসবাস বা মাঝে মাঝে গায়ের বাড়িটিতে যাওয়া কিংবা গায়ের প্রাকৃত মানুষের মতো জীবনযাপনের চেষ্টা, এর কোনওটাই মা বা বাবা সুনজরে দেখছে না বলে তার অস্বস্তি হচ্ছে, এটাই হয়তো মানসিক স্বাধীনতার মস্ত অন্তরায়। সে ইচ্ছে করলেই কি মা-বাবার মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যা করছিল তা করে যেতে পারে? পারে না। তার স্বাধীনতা এইখানেই মার খেয়ে যাচ্ছে।
হেমাঙ্গ অবশ্য কয়েক মাস ধরে মাকে বেশ কয়েকবার বোঝতে চেষ্টা করল। কিন্তু মা শেষ অবধি একটা কথাই বলল, গরচার বাড়ি তোকে লিখে দেবো, গায়ে গিয়েও যা-খুশি করতে পারি, কিন্তু শর্ত একটা। আগে বিয়ে কর। তারপর যা-খুশি করি।
ওরে বাবা!
তোর বাবারও একই মত। বিয়ে করলে সব মেনে নেবো।
হেমাঙ্গ তাই আজকাল একটু বিমর্ষ। একটু আনমনা। বিয়ে খুব সুখের ব্যাপার নয়। একটা মেয়ের সঙ্গে নিজেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলার মানেই হচ্ছে জীবনটা ভোগে চলে যাওয়া। প্রেম জিনিসটা কম দামী সেন্টের মতো, গন্ধ টপ করে উবে যায়। একজন চিন্তাশীল, কল্পনাপ্রবণ মানুষ বিয়ের পর হয়ে যায় শ্রমিকের মতো। প্রেমের সমাধির ওপরেই তো বিয়ের সৌধ।
প্রায় দুমাস ফোন করেনি রশ্মি। বোধ হয় লজ্জায়। তাকে বিব্রত করতে চায় না বলে হেমাঙ্গও করেনি। টেলিফোনের সম্পর্কটা বড় আনুষ্ঠানিক হয়ে যাচ্ছিল। কুশল প্রশ্ন এবং আলগা কিছু কথা ছাড়া কোনও গভীরতায় পৌঁছচ্ছিল না। বাড়ছিল শুধু টেলিফোনের বিল। সম্পর্ক আর জিইয়ে রাখার কোনও মানেই হয় না।
কিন্তু দু মাস বাদে একদিন রাতে রশিই টেলিফোন করল।
কেমন আছ?
ভালই। তুমি?
আমি ভাল নেই।
কেন রশ্মি?
মন ভাল নেই। তোমার জন্য।
আবার আমি কি করলাম?
তুমি কিছু করেনি। আমিই করেছি। কেবল ভাবছি কাজটা কি তোমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে গেল?
তা কেন রশ্মি? তুমি প্র্যাকটিক্যাল।
ঠেস দিলে না তো!
আরে না। আমি তোমার অসুবিধের কথা জানি।
এখন এখানকার অবস্থা তো খুব ভাল নয়। অনেক এথনিক গ্রুপ ঢুকে পড়েছে, রিসেশন শুরু হয়েছে, দাঙ্গা-হাঙ্গামা হচ্ছে। একা একটা মেয়ের পক্ষে থাকা খুব নিরাপদ নয়। অথচ আমাকে তো থাকতেই হবে।
জানি রশ্মি। তুমি কিন্তু অ্যাপোলাজাইজ কোরো না। আমি তো জানিই, একা তোমার পক্ষে ওখানে থাকার অসুবিধে আছে। পৃথিবী পাল্টে যাচ্ছে রশ্মি। এখন চারদিকে ভায়োলেন্স।
হ্যাঁ হেমাঙ্গ। ভীষণ ভায়োলেন্স। আর কত ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হচ্ছে, কত তাদের অভাব-অভিযোগ-দাবিদাওয়া তার সীমাসংখ্যা নেই। সবাই মিলিট্যান্ট, সবাই টেরোরিজমে বিশ্বাসী। ক্রমে ডিটোরিয়েট করছে। আমরা কী মনে হয় জানো? সব দেশেই গভর্নমেন্টগুলো এদের কাছে অসহায়। কিছুই করতে পারছে না।
ফিরে এসো রশ্মি।
ফিরে গিয়ে কী হবে বলো তো! আমাদের দেশে কোনও কাজ হয়? নাকি লোকে কিছু মাথার কাজ করতে চাইলে তা করতে পারে? একটা ভাল লাইব্রেরি অবধি নেই। কী হবে ফিরে গিয়ে? আমরা ভাবছি সুইজারল্যান্ডে সেটল করব। এখনও সুইজারল্যান্ড বোধ হয় কিছুটা ভাল। আমার হাজব্যান্ডটি অবশ্য আমেরিকা বেশি পছন্দ করছে। দেখা যাক।
তোমার বিদেশবাস ঘুচবে না, না রশ্মি?
আমার কাছে ইংল্যান্ড তো বিদেশ ছিল না কখনও। বরাবর ইংল্যান্ড আমার প্ৰিয় জায়গা। এটাই আমার দেশ। ছোট সুন্দর শান্ত পরিচ্ছন্ন সুশৃংখল একটা দেশ। হাতের কাছেই ইউরোপ। চারদিকে যত ইতিহাস আর ঐতিহ্য ছড়ানো। কিন্তু ধীরে ধীরে সব কেমন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডই আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সুইজারল্যান্ড বা আমেরিকায় সেটল। করতে আমার একটুও ইচ্ছে করে না। কিন্তু বুঝতে পারছি না কী হবে। হেমাঙ্গ খুব সন্তৰ্পণে একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করল। সে খুব ভাগ্যবান যে রশির প্রস্তাবে রাজি হয়নি। সে কিছুতেই বিদেশে থাকতে পারত না। নস্টালজিয়া তাকে টানত, তাকে টানত আত্মীয়তা, তাকে টানত শিকড়। বিদেশে থাকার কথা হেমাঙ্গ ভাবতেও পারে না।
