ঝুমকি ক্ষীণ হাসল, কি করব? চারুমাসি নিজেই আমাকে মাসি ডাকিয়েছে। সুব্রতদাকে মেসেস ডাকতে হয়নি, রক্ষে। আত্মীয় তো নয়, ডাকে কী আসে যায়?
ঝুমকির আনমনা ভাবটা অপর্ণার পছন্দ হয় না। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে একমাত্র ঝুমকিই ভীষণ চাপা। তার পেট থেকে কখনও কথা বের করতে পারে না অপৰ্ণা। ঝুমকিকে ঠিক বুঝতেও পারে না। তবু চেষ্টা করে।
বলল, হ্যাঁ রে, তোর কী হয়েছে বল তো! এত আনমনা কেন?
জবাবে সাধারণত রেগে যায় ঝুমকি। কিন্তু আজ রাগল না। হেসেই বলল, কত কী ভাবছি।
কী ভাবছিস, চাকরির কথা?
চাকরির কথাও। এই বিংশ শতাব্দীকে বুঝতে পারো মা?
কেন পারব না। আমি তো এ যুগেরই মেয়ে।
এই যুগটা খুব অদ্ভুত। কত নতুন ভ্যালুজ জন্মাচ্ছে।
আবার কেন ভ্যালুজ জন্মল যা নিয়ে তুই এত চিন্তা করছি।
আছে মা! সব কথা কি বলতে হয়?
তুই তো কিছুই বলিস না আমাকে।
যারা সব বলে দিতে ভালবাসে তারা কি ভাল? তারা সরল হতে পারে, কিন্তু বোকা।
থাকগে বাবা, মতে চাই না।
ঝুমকি আলগোছে নিজের ঘরে চলে গেল।
সন্ধেবেলা আজ পারিবারিক মিটিং বসিয়ে সগৌরবে অপর্ণা কন্ট্রাক্টরের কথা ঘোষণা করল। মণীশকে বলল, বুঝলে মশাই, এখন তোমাকে একটি পয়সাও ডাউন পেমেন্ট করতে হচ্ছে না।
মণীশ একটু অবাক হয়ে বলল, লেকটা তোমার প্রেমে পড়েনি তো অপু?
অপর্ণা চোখ পাকিয়ে বলল, ছিঃ ছিঃ, ছেলেমেয়ের সামনে ও তোমার কেমন ঠাট্টা?
বুবকা বলে উঠল, কিন্তু মা, বাবা তো ঠিক কথাই বলেছে। এ যুগে কেউ এত লিনিয়েন্ট হয়?
অনু বলল, মম ইজ স্টিল বিউটিফুল অ্যান্ড ইয়ং অ্যান্ড ভেরি অ্যাট্রাকটিভ।
অপর্ণা রাঙা হয়ে বলল, ছিঃ ছিঃ, তোরা যে বাপের পাল্লায় পড়ে গোল্লায় গেছিস!
বুবকা বলল, যুগ পালটে গেছে মা, এখন এত লজ্জা পেতে হবে না। ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।
মণীশ মিটিমটি হাসছিল। বলল, যুদ্ধে হেরে যাচ্ছো অপু। এখন সন্ধি করাই ভাল।
তোমার আর তোমার ছেলেমেয়েদের মতো অসভ্য আমি জন্মে দেখিনি বাবা। তোমাদের সঙ্গে সন্ধি নয়।
আহা, বলোই না, লোকটাকে কি করে জাপালে। হিপনোটিজম প্র্যাকটিস করছে নাকি?
ওসবের দরকার হয়নি। মিস্টার সিং খুব ভাল লোক। তাছাড়া সুব্রত রায়ের চেনা।
মণীশ একটু অবাক হয়ে বলে, ব্রত মানে চারুশীলার বর নাকি? তুমি তাকে কনট্যাক্ট করেছিলে? সে তো মস্ত আর্কিটেক্ট।
তাতে কি?
না, তাতে কিছু না। তবে বলতেই হবে তোমার বুদ্ধি আছে। বাচ্চারা তোমার তোমাদের মায়ের নামে জয়ধ্বনি দাও। বলো, মাতাজীকি জয়।
অনু, বুবকা আর ঝুমকি এমন হুল্লোড় করে উঠল যে, কানে হাত চাপা দিতে হল অপর্ণাকে।
প্রাথমিক উত্তেজনা আর আনন্দ রইল কয়েকদিন। সিং-এর সঙ্গে আরও দুবার দেখা এবং টেলিফোনে কয়েকবার কথা হল অপর্ণার। একদিন সিং এসে ডিনার খেল এবং সকলের সঙ্গে পরিচয় করে গেল।
বাড়িটা শুরু হল পুজোর আগে। ডিসেম্বরে ছাদ ঢালাই হয়ে বাড়িটা যখন একটা সম্পূর্ণতার চেহারা পেয়ে গেল তখন বড় অবাক লাগতে লাগল অপর্ণার। স্যাংশন করা প্ল্যানের মধ্যেই বাড়িটাকে চমৎকার একটা আধুনিকতার ডিজাইন-যুক্ত করে দিয়েছে সিং। তার দক্ষ মিস্ত্রিরা টপাটপ কাজ করে ফেলছে। শূন্যতার মধ্যে একটা বাড়ি গজিয়ে ওঠার ঘটনাটা যেন অপর্ণার কাছে এক অষ্টম আশ্চর্য!
এক রাতে অপর্ণা লেপের তলায় মণীশকে আঁকড়ে ধরে বলল, কেমন করে ফেললাম বাড়িটা, বলো।
হ্যাটস্ অফ। কিন্তু অপু, দোতলা হল না।
প্রভিসান তো রইল। দোতলাটা আমরা নিজেরাই দেখেশুনে করিয়ে নিতে পারব।
এ লোকটিকে দিয়েই তো করাতে পারতে।
ওগো, বড় বাড়ি করলেই তো হবে না। পরিস্কার রাখতে হবে যে! আর বড় বাড়িতে বড় ফাঁকা লাগবে।
তোমার কৃপণতাটা আর কিছুতেই গেল না। দোতলা করতে দাওনি ঠিক আছে। কিন্তু এবার আমার একটা কথা রাখো।
আবার কী কথা?
এসব ফার্নিচার, খাটফাট সব বেচে দেবোর নতুন বাড়িতে খুব মডার্ন ফার্নিচার দিয়ে সাজাবো।
পাগল নাকি? আমার ফার্নিচারগুলো দেখেছো? কী দারুণ মজবুত ভাল জিনিস! বেচলে আর পাবো এরকম? কত খুঁজে খুঁজে ঘুরে ঘুরে ঝুল কাঠের সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস কিনে পালিশ করিয়ে তবে সাজিয়েছি। প্রাণ গেলেও বেচতে পারব। না। হা গো, তোমার কি পুরনো জিনিসের ওপর মায়া হয় না?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মণীশ বলে, তোমার ওপর হয়। তুমি যে পুরনো ধ্যানধারণা কেমন আঁকড়ে ধরে থাকতে ভালবাসো! তুমি কেন আর একটু আধুনিকা হলে না, বলো তো!
আমাকে বুঝি আজকাল আর পছন্দ হচ্ছে না?
না হচ্ছে না। আমি পাত্ৰী দেখছি।
দেখাচ্ছি। বলে এমন জড়িয়ে ধরল মণীশকে যে, মণীশ হাঁফসে পড়ল।
বলল, আচ্ছা, আচ্ছা, পাত্রী দেব না।
খুব শখ, না? এই প্রাচীনপন্থীকে নিয়েই এ জীবনটা কাটাতে হবে, বুঝলে?
আর পরের জন্ম?
যদি পরজন্ম থাকে তবে পরের জন্মেও।
ও বাবা, পরের জন্মেও তুমি?
হ্যাঁ, বরাবর আমি। আমি ছাড়া আর কেউ নয়। শোনো, তুমি একবার একটা খুব খারাপ কথা বলেছিলে, মনে আছে?
কী কথা?
তুমি বলেছিলে পঁচিশ হাজার বছর বেঁচে থাকলে আমরা কেউ কাউকে সহ্য করতে পারতাম না। বলেছিলে?
ঠিকই তো বলেছি অপর্ণা। পঁচিশ হাজার বছর যদি আমরা বেঁচে থাকতাম তাহলে কি সত্যিই আমরা দুজনে দুজনের কাছে পুরনো হয়ে যেতাম না?
বলছি তো, না।
মণীশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ভাগ্যিস সেই পরীক্ষাটা আমাদের দিতে হবে না।
ভাগ্যিস কেন? পঁচিশ হাজার বছর ধরেই আমি তোমাকে ভালবাসতে পারি। একটুও কমবে না ভালবাসা।
