অপর্ণা শিহরিত হয়ে বলে, কী যে বলেন। আমাদের বাড়ি নিতান্তই ছোট আর সাদামাটা। ওঁর মতো মস্ত মানুষ কেন ওরকম বাড়ি করতে যাবেন?
তাতে কী? সাদামাটা বাড়ি করলে কি ওর জাত যাবে?
তা নয়। আসলে উনি ব্যস্ত মানুষ। আমার তো ওঁকে দরকার নেই। একজন ভাল রাজমিস্ত্রি পেলেই আমার হয়ে যাবে।
চারুশীলা অবশ্য এত সহজে ছাড়ল না। সুব্রতর সঙ্গে দেখা করিয়ে দিল অপর্ণার। বলল, ওঁর বাড়িটা তোমাকেই করে দিতে হবে।
অপর্ণা তো লজ্জায় মরে।
কিন্তু সুব্রত এতটুকু বিব্রত বা বিরক্ত হল না। মিটিমিটি হাসিমুখে অপর্ণার বাড়ির প্ল্যানটা খুব খুঁটিয়ে দেখল। দু একটা প্রশ্ন করল। তারপর বলল, বাড়ির প্ল্যান ভালই হয়েছে। সয়েলটা একটু টেস্ট করিয়ে নিলে ভাল হত। জলা বা পুকুরটুকুর ছিল না তো ওখানে।
তা তো জানি না।
তাহলেও একটু ডীপ ফাউন্ডেশন করবেন। আমি মিস্ত্রি ঠিক করে দিচ্ছি। তাকেই বুঝিয়ে বলে দেবো সব।
উঃ, বাঁচালেন। আপনি কি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ি করাবেন, না কি কান্ট্রাক্টে?
যদি নিজে করাই?
সুব্রত মিস্টি হেসে বলল, করতে পারলে তো ভালই। কিন্তু প্রবলেমও আছে। মেটিরিয়াল চুরি হয়ে যাবে। চৌকিদার রেখেও সেটা আটকাতে পারবেন না। লোকাল মস্তানরা চাঁদা চাইবে। তারপর আপনার ফিজিক্যাল কষ্টটা তো আছেই। অনেকে বাড়ি করাতে গিয়ে শেষে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
তাহলে কন্ট্রাক্ট দেওয়াই কি ভাল?
কলকাতায় সেটাই ভাল। একটু দেখাশুনো করলেই হবে।
তাতে কি টাকা একটু বেশি লাগবে?
সুব্রত মিটমিটি, হেসে বলে, যে টাকাটা বেশি লাগবে সেটা নিজে করলেও লেগে যাবে। চুরিটুরি গেলে তো সেটাও এস্টিমেটের মধ্যে চলে আসবে কিনা।
তাহলে দয়া করে আমাকে একজন ঠিকাদার ঠিক করে দিন। আমার কর্তাটি কোনও কাজের নন।
কোনও সমস্যা হবে না। কাল বা পরশু সকালেই ঠিকাদার গিয়ে আপনার বাড়িতে দেখা করবে।
আপনাকে বিব্রত করলাম। আরে না। এ তো সামান্য ব্যাপার।
চারুশীলা এসব কথায় মোটেই খুশি হল না। বলল, তোমাদের কথার মাঝখানে কথা বলিনি। কিন্তু বাড়িটা তুমি করলেই পারতে।
সুব্রত একটুও বিব্রত না হয়ে বলল, পারতাম। কিন্তু আমাকে তো পরশুই আবার দিল্লি যেতে হবে। সময় কি হবে?
অপর্ণা বলল, না না, আপনাকে একটুও বিব্রত হতে হবে না। একজন ভাল ঠিকাদার পেলেই আমার হবে।
পরদিন সকালে যে লোকটি সুব্ৰতর রেফারেন্সে এসে অপর্ণার সঙ্গে দেখা করল তাকে দেখে অপর্ণা তটস্থ। লোকটা এসেছে একখানা ঝকঝকে মারুতি গাড়িতে। তার পোশাক আশাক এবং চেহারা এতই অভিজাত যে, ঠিকাদার কথাটা এর পরিচয়ের সঙ্গে মেলে না।
কিন্তু খুবই আশ্চর্যের বিষয়, লোকটি বিনয়ী এবং ব্রতর প্রতি খুবই শ্ৰদ্ধাশীল। সে ইউ পি-র লোক তবে বাংলা বলতে পারে। বলল, কোনও চিন্তা করবেন না। মিস্টার রায় যখন বলেছেন তখন দেয়ার উইল বি নো প্রবলেম।
লোকটা প্ল্যান খুঁটিয়ে দেখল। একটা পকেট ক্যালকুলেটারে হিসেব করল। আর বুক কাঁপতে লাগল অপর্ণার, এস্টিমেট যা দেবে তা সে সইতে পারবে তো?
লোকটা যা এস্টিমেট দিল তাতে খুবই অবাক হল অপৰ্ণা। সে যা ভেবে রেখেছিল তার চেয়েও কম। ভুল শুনেছে কিনা তা বুঝতে না পেরে বারকয়েক জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নিল। তারপর বলল, আপনি কাজ শুরু করে দিন। কত টাকা দিতে হবে এখন আপনাকে?
লোটা হাত তুলে বলল, নো মানি নাউ। পেমেন্ট করবেন আফটার কমপ্লিশন।
কমপ্লিশন! ভূস্তের মতো চেয়েছিল অপর্ণা। বিশ্বাস হচ্ছে না।
লোকটা বলল, টাকা তত বেশি নয়, সামান্যই। ওদিকে আমার কাজও হচ্ছে। আপনি ভাববেন না। আপনি ভূমিপূজা করে নিন, তারপর আমাকে একটা খবর দেবেন। কাজ শুরু হয়ে যাবে।
লোকটা তার কার্ড রেখে চলে গেল।
অপর্ণা একটু অভিভূত হয়ে বসে রইল। চারুশীলা আর তার বরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় বুকটা ভরে উঠছিল তার। প্রতিদানে চারুশীলার জন্য কিছুই করার নেই তার। ওরা এত বড়লোক, এত ওদের ক্ষমতা, অপৰ্ণা কী করতে পারে ওদের জন্য।
সে চারুশীলাকে ফোন করে বলল, ভাই, আপনি যে আমার কী উপকার করলেন তো বোঝাতে পারব না। কন্ট্রাক্টর আজ এসে দেখা করে গেছে।
চারুশীলা বলল, উপকার আবার কিসের? জানেন তো, ঝুমকি আমার খুব বন্ধু। মাসি বলে ডাকে, কিন্তু আসলে আমরা বন্ধুই। আমার ইচ্ছে ছিল বাড়িটা সুব্রত করে দিক।
আপনি বড্ড বাড়াবাড়ি করেন। আমার বাড়ি উনি করলে কি ওঁর মান থাকে? আমিও যে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারব না।
এস্টিমেট বেশি দেয়নি তো?
না। বরং আমি যা ভেবে রেখেছিলাম তার চেয়েও কম।
লোকটা কে বলুন তো! শৰ্মা নাকি?
না। এঁর নাম এ পি সিং।
চিনি না। ওর তো অনেক চেনা। আজ আসুন না বিকেলে আপনার বাড়ির সম্মানে ডিনার হোক।
উঃ, আপনাকে নিয়ে পারা যায় না।
আসবেন তো? সবাইকে নিয়ে কিন্তু।
দুপুরে আগে কেউ বাড়িতে থাকত না। অপর্ণা একা। আজকাল ঝুমকি সকালে বেরিয়ে দুপুরে ফিরে আসে। চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। একটু আনমনা, কিন্তু খুব যেন হতাশ নয়।
ঝুমকি আজ ফিরতেই অপর্ণা সুসংবাদটা তাকে দিয়ে বলল, জানিস, একটা পয়সাও আগে দিতে হবে না, বাড়ি কমপ্লিট হলে টাকা।
খুব একটা খুশি হল কি ঝুমকি? খবরটা যেন তাকে স্পর্শ করল না। শুধু একটু হেসে বলল, তাই নাকি? বাঃ, বেশ ভাল তো!
চারুশীলার বর পোটা খুব ভাল, না রে? একটা কথায় সব ঠিক করে দিল। হ্যাঁ, খুব ভাল। সুব্রতদার কোনও তুলনাই হয় না। তুই ওকে দাদা ডাকিস নাকি? এই যে শুনলাম, চারুশীলাকে মাসি ডাকিস।
