নিমাই দু হাতে মুখ ঢাকল।
বীণার যদি মনুষ্যত্ব থাকত নিমাই, তাহলে সে এসব চোখে দেখেও চুপ করে থাকত না। অথচ তার দুর্দিনে আমার অনেক অসুবিধে সত্ত্বেও তার জন্য কম করিনি। দুধকলা দিয়ে কালসাপ পোষা হয়েছে।
নিমাই দুহাত মুখ থেকে নামিয়ে কাকার হাত দুটো চেপে ধরে বলল, তাকে মারবেন না কাকা। প্রাণে মারবেন না।
কাকার মুখটা খুব থমথমে। বলল, আমি তোমাকে খবর পাঠাবো। খবর নিয়ে যে ছেলেটি আসবে তার সঙ্গেই বনগাঁয়ে চলে যেও। বুঝেছ?
আমি আপনার সঙ্গে আজ রাতেই যাই না কেন? আমার যে বড় উদ্বেগ হচ্ছে।
না নিমাই। বোকার মতো কাজ কোরো না। তোমাদের এক সময়ে ভাল চোখে দেখতুম, তাই তোমাদের ক্ষতি হোক তা চাই না। আগে আমাকে দলের ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে দাও।
যে আজ্ঞে। একটু দেখবেন দয়া করে।
কাকা চলে যাওয়ার পর মাঠের মধ্যে অন্ধকারে ভূতস্তের মতো অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে নিমাই। তারপর হঠাৎ একটা ইটের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে সজোরে নিজের কপালে মারল সে, প্ৰায়শ্চিত্ত! প্ৰায়শ্চিত্ত হোক ভগবান!
তারপর ফিরে এল নিমাই। কপাল ফেটে গাল বেয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে জামায়। চোখ মুখ উদ্ভ্ৰান্ত।
বিশে, বিলু ইত্যাদি তার কর্মচারীরা দৌড়ে এল, কে মারল আপনাকে বাবু? ওই লোকটা নাকি?
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, না না, সে বড় ভাল লোক। সে কত করেছে আমাদের জন্য। আমরাই নিমকহারাম। পড়ে গিয়ে চোট হল কপালে।
প্রায় সারা রাত কাঁদল নিমাই। এক ফেঁটা ঝিমুনি এল না তার গুদামঘরের গুমটিতে পাহারা দিতে বসে। সারা রাত ভগবানকে ডাকল, সারা রাত মনস্তাপে হাহাকার করল বুক। না, তার একটুও লোভ নেই। তার যা আছে সব সে দিয়ে দেবে কাকাকে। তারপর কাকা হোরা বা গুলি যাই দিয়েই মারুক শান্তভাবেই মরবে নিমাই। কৰ্মফল ক্ষয় হোক।
ওদিকে রাত নটা নাগাদ বনগাঁয়ে বীণার দরজায় ধাক্কা পড়ল, বীণা দরজা খোলো শিগগির। বিরক্ত হয়ে বীণা উঠে এল, এত রাতে জ্বালাতে এলেন বাবু। কী গো, কী চাই? সজলকে কিছু উদ্ভ্ৰান্ত দেখাচ্ছিল। বলল, বীণা, আমি ছুটতে ছুটতে আসছি। একটা কথা ছিল। বীণা মুখ টিপে হেসে বলল, রসের কথা তো! অনেক বলেছ। বীণা, কথাটা জরুরি। তোমার বিপদ! বিপদ!
০৯১. আপাতত একতলা
আপাতত একতলা। দোতলাটা পরে হবে, যদি প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই প্রয়োজনটা নিয়েই আবার মণীশ আর অপর্ণার মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিচ্ছে। মণীশ বলল, দোতলাটা একবারেই করে ফেলা দরকার। দোতলাটা হবে লিভিং কোয়ার্টার, একতলায় থাকবে বসবার ঘর, ডাইনিং রুম, রান্নাঘর।
অপর্ণা মাথা নেড়ে বলে, দোতলার এখন কোনও দরকার নেই। দু কাঠা জমি নিয়ে বাড়ি হচ্ছে। একতলাতেই অনেক জায়গা।
মণীশ আপত্তি করতে লাগল, একতলায় মশা বেশি। চোরের উৎপাত হবে খুব। জানালা দিয়ে লগি ঢুকিয়ে আলনার জিনিসপত্র টেনে নিয়ে যাবে।
অত সোজা নয়। জানালায় জাল থাকবে।
শোনো অপু, একতলায় আরও হ্যাজার্ড আছে। ক্ৰলিং ওয়ার্ম এসে ঢুকবে বর্ষাকালে। ব্যাঙ লাফাবে ঘরের মধ্যে, কেঁচো বেয়ে বেড়াবে, বিছে কিলবিল করবে।
হ্যাঁ গো, এরপর আমাকে ভয় দেখানোর জন্য রাক্ষস-খোৰূসের গল্পও ফাঁদবে নাকি? একতলায় কি মানুষ থাকছে না? সব একতলাই কি সুন্দরবন!
খুবই ব্যথিত হয়ে মণীশ বলল, একতলার হ্যাজার্ডস্ তুমি স্বীকার না করলেও, আছেই। বেশি বৃষ্টি হলে ড়ুবেও যেতে পারে ঘরদোর।
অনেক কিছু হলে অনেক কিছুই হতে পারে। তা বলে সেসব ভেবে গুটিয়ে থাকতে হবে নাকি?
তুমি ভীষণ অ্যাডামেন্ট অপু।
মোটেই নয়। আমি প্র্যাকটিক্যাল। এক গাদা টাকা খরচ করে দোতলা বানাবে। থাকবে কে বলো তো? মোটে তো পাঁচটি প্রাণী। অনু আর ঝুমকির বিয়ে হয়ে যাবে, বুবকা হয়তো পড়তে চলে যাবে হোস্টেলে, তখন অত বড় বাড়ি হাঁ হাঁ করবে না? তুমি তো ভাড়াটেও বসাতে দেবে না।
না, না, ভাড়াটের প্রশ্নই উঠছে না। কিন্তু দোতলা অনেক সেফ এটা তো মানো?
সাবধান থাকলে একতলাও সেফ। অত ভয়ের কিছু নেই।
আচ্ছা অপু, একটা কাজ করলে হয় না।
আবার কী?
ধরো, একতলাটা আমরা কমপ্লিট করলাম না, শুধু পিলার থাকল। শুধু পিলারের ওপর দোতলাটা করলাম। ডিজাইনটাও চমৎকার হবে আর দোতলায় থাকাও হবে।
মাথায় নতুন নতুন আইডিয়া এলেই তো হবে না। দোতলা মানেই দু দফা ছাদ ঢালাই। খরচ কাছাকাছিই পড়বে।
মণীশ খুবই হতাশ মুখে বসে থাকে। মুখে থমথম করে বাচ্চা ছেলের মতো অভিমান। তারপর বলে, ঠিক আছে, ছেলেমেয়েদের মতও নেওয়া হোক। লেট আস পুট ইট টু ভোট।
অপর্ণা সবেগে মাথা নেড়ে বলে, কখনও নয়। তোমার ডেমোক্র্যাসির চালাকি আমার জানা আছে। ছেলেমেয়েরা সবাই তোমার দলে। তোমার মতোই ইমপ্র্যাকটিক্যাল। ওরা যখনই বুঝবে যে, তুমি দোতলা করতে চাও তখনই ওরা তোমার পক্ষ নেবে। আমি তোমার ভোটাভুটি মানি না।
তুমি একনায়কতন্ত্র চালাচ্ছো অপু।
তাই চালাবো। তোমাদেরও মানতে হবে।
আবার ভেবে দেখো অপু। তুমি বড় কৃপণ।
আমাদের টাকা তো ছড় ফুড়ে আসে না!
প্রচুর আপত্তি, বাদানুবাদের পর ছেলেমেয়েদেরও চুপ করাতে পারল অপৰ্ণা। বাড়ি করার ব্যাপারে স্বপ্নশীল মণীশকে সে দূরে রাখল। ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও কোনও পরামর্শই করল না। সে ধরল চারুশীলাকে।
আপনার হাজব্যান্ড তো নামকরা মানুষ, যদি তার চেনাজানা কোনও ঠিকাদার বা রাজমিস্ত্রি ঠিক করে দেন তো ভাল হয়।
চারু অবাক হয়ে বলল, তা কেন? সুব্ৰত নিজেই করে দেবে আপনার বাড়ি।
