একটু ভয়ে ভয়ে নিমাই বলল, কিছু কবুল করতে হবে নাকি?
যদি করে তাহলে ভাল হয়।
নিমাই এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল, একটা কথা বলে নিই কাকা। যদি এমন কিছু কবুল করতে বলেন যা করলে কারও ক্ষতি হয় তবে আমি কিন্তু মুখ খুলতে পারব না।
কাকা একটু হাসল, তাহলেই হবে।
এবার বলুন।
তোমার কি মনে আছে বনগাঁয়ে গা নামে একটা ছেলে খুন হয়েছিল?
বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা একটা পেল্লায় লাফ মারল নিমাইয়ের। দাতে দাঁত চেপে সে মৃদু গলায় বলল, আছে। বীণার সঙ্গে তার একটু খাতির ছিল। তাই না?
যে আজ্ঞে।
পগার কাছে অনেক ডলার আর পাউণ্ড ছিল। যে রাতে সে খুন হয় সেই রাত থেকেই টাকাগুলো হাওয়া।
সব জানি কাকা।
ভোলার কথা নয়। সেই ডলার আর পাউন্ডের জন্য আমার দলের দুজন খুন হয়, আমার ব্যবসা লাটে ওঠার অবস্থা হয়। মনে আছে?
আছে কাকা।
সেই ডলার আর পাউন্ডের হদিশ আজও আমরা পাইনি।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
নিমাই, তোমার কাছে আজ কথাটা জানতে চাই।
কী বলব কাকা?
সেই টাকাটার কী হল?
নিমাই মাথা নেড়ে বলল, জানি না।
কাকা তার দিকে একটু চেয়ে থেকে বলল, জানো না?
না কাকা।
কিন্তু টাকাটা কে নিয়েছিল, কার কাছে গচ্ছিত ছিল তা কি জানো নিমাই?
নিমাই চুপ করে থাকে।
এ কথাটার জবাব দেবে না?
না কাকা। এ কথাটার জবাব আমার কাছে চাইবেন না।
তবে কি তুমি জানো?
জানতাম।
শোনো, পল্ট আমাকে কয়েকদিন আগে বলেছে যে, ওর কাছে বীণাপাণি একবার ডলার ভাঙিয়েছিল। আর সনাতন গতকাল বলেছে যে, তোমাকে ও ঘরের ভিত খুঁড়ে ডলার আর পাউন্ড বার করতে দেখেছে। সত্যি?
নিমাইয়ের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল। গলায় কান্নার হেঁচকি তুলে সে কাকার দুখানা হাত ধরে বলল, কত বললাম ওকে, শুনল না। আমাকে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দিল। আজ ভাবি কোন পাপে সেদিন ইঁদুরের গর্ত বোজাতে গিয়ে ওই অলক্ষুণে পাপের টাকাগুলো টেনে তুললাম গর্ত থেকে।
কেঁদো না নিমাই, তোমার তো দোষ নয়।
কাঁদতে কাঁদতে নিমাই বলল, কতগুলো প্রাণ চলে গেল কাকা। কত পাপ হল!
কাকা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, বীণাপাণি তার ঘরের মেঝে বাঁধিয়ে নিয়েছে। তোমার কি মনে হয় যে ওর কাছেই টাকাটা আছে?
আমি কিছু জানি না কাকা।
কাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, দু-একজন সন্দেহ করছে যে, ওই টাকাটা বীণাপাণি তোমাকেই দিয়েছে। আর সেই টাকাতেই তুমি হোটেল খুলেছ। তোমাদের মধ্যে ঝগড়া ছাড়াছাড়িটা লোক দেখানো ব্যাপার।
নিমাই হাঁ করে কাকার মুখের দিকে তাকাল। তারপর কথা খুঁজে না পেয়ে চোখ বুজল। দুটো হাত মুঠো পাকাল, খুলল। তারপর হঠাৎ খুব শান্ত হয়ে গিয়ে বলল, যদি তাই হয় কাকা, তবে একটা কাজ করবেন? আমার যা আছে সব আপনি নিন। এই হোটেল, নগদ যা টাকা আছে আমার সব কালই লেখাপড়া করে দেবো আপনাকে। খুব কম হবে না কাকা। ঋণটা শোধ হয়ে যাবে।
কাকা তার কাঁধে হাত রেখে বলল, তুমি কি স্বীকার করছ যে, ডলার আর পাউন্ড তুমিই নিয়েছ?
কান্নার মধ্যেও হাসল নিমাই, আমাকে কবুল করতে বলছেন কেন? তার পাপের স্খলন হোক, আপনি আমার সব নিয়ে নিন।
তুমি কি ভাবে যে আমি ওসব কথায় বিশ্বাস করেছি?
নিমাই ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, অবিশ্বাসেরও ব্যাপার নয়। আমার মাথাতেই শুধু খেলেনি। ঠিকই তো, বীণাপাণির হাতে উনার আর পাউড এল আর নিমাইও হোটেল খুলল, এ তো দুইয়ে দুইয়ে চার কাকা। অবিশ্বাসের কিছু তো নয়। আপনার হাত দিয়েই তাকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছি, সেটাও তো সন্দেহজনক। তাই না?
হ্যাঁ নিমাই, খুবই সন্দেহজনক। নিমাই, তোমাকে আজ না বলে উপায় নেই। ব্যাপারটা এতই সন্দেহজনক যে আমার দলের ছেলেরা খুবই গরম হয়ে আছে। তারা হয়তো ভেবে দেখবে না, তুমি কতটা ভাল লোক বা সত্যবাদী। তারা বীণার ওপরেও রেগে আছে বটে, কিন্তু তাদের ধারণা টাকাটা তোমার কাছেই আছে। অবস্থাটা বুঝতে পারছ নিমাই?
নিমাই ঘাড় নেড়ে ফ্যাঁসাফ্যাঁসে গলায় বলল, পারছি কাকা। খুব পারছি। শুধু বলুন, আমাকে কী প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
প্ৰায়শ্চিত্ত? সেটা আবার কি রকম?
আমার যা আছে সব যদি দিয়ে দিই তাহলে কি হবে? নাকি আমাকে খুন করতে চায় তারা? তাহলেও আমার কোনও আপত্তি নেই কাকা। যখন যেখানে বলবেন আমি হাজির হয়ে যাবো, যা শাস্তি দেবেন তা মাথা পেতে নেবো। বীণাপাণিকে শুধু ছেড়ে দেন আপনারা। সে অসহায় মেয়েমানুষ।
কাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তুমি বড় গণ্ডগোলে ফেলে দিলে আমাকে। সোজা কথা বলো তো, টাকাটা কি তুমি নিয়েছ, না নাওনি?
হাতের পিঠে চোখ মুছে নিমাই বলে, আমি কিছু বলতে পারব না কাকা। মাপ করুন।
কাকা কিছুক্ষণ থম ধরে থেকে বলল, তুমি একবার বনগাঁয়ে যেতে পারবে?
এখনই!
না, এখন নয়। হুট করে হাজির হলে তোমার বিপদ হতে পারে। আমার ছেলেরা কেমন তা তো জানো।
জানি কাকা। তারা খারাপ তো নয়।
খুবই খারাপ। তারা ক্ষেপে আছে।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, একটা কথা বলি কাকা। আমাকে একটা ভিক্ষে দিতে হবে।
কী চাও নিমাই?
আপনারা বীণাপাণিকে কিছু করবেন না। তার প্রাণটা ভিক্ষে চাই।
কাকা হাসল, বলল, বীণাপাণির অনেক গুণ। আমি গুণের খুব সমঝদার। তাকে কিছু বলা হয়নি, শাস্তি দেওয়ার কথাও ওঠেনি এখনও। তবে ছেড়েও দেওয়া হবে না।
তার দায় যদি আমি ঘাড়ে নিই?
বলেছি তো, তুমি আজ আমাকে খুব গণ্ডগোলে ফেলে দিয়েছ। আমি কিছু ভেবে পাচ্ছি না। বনগাঁয়ে ফিরে গিয়ে অজ রাতেই দলের ছেলেদের নিয়ে বসব। তারপর যা হয় ঠিক হবে। ওই ডলার আর পাউন্ডের জন্য আমাদের কত ক্ষতি হয়েছে তা তুমি জানো না। আমার দুটো লোক খুন হয়েছে, তার ওপর টেনশন, মারদাঙ্গা।
