বুকটা বড় ফাঁকা, বড় উদাস, বেঁচে থাকার রসটাই যেন মরে গেল মায়ের সঙ্গে সঙ্গে। বীণাপাণির সঙ্গে বনগাঁ চলে গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতে অনেকটা ফাঁক পড়ে গিয়েছিল। মায়ের জন্য কত কী করার ছিল তার, কত কী করেনি, সেসব উল্টোপাল্টা হয়ে বারবার মনে পড়ে আর চোখ জলে ভাসতে থাকে।
বাবা একদিন খরখরে গলায় জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ রে, বীণাপাণি যে এল না!
তাকে খবর দিইনি। বাবা।
বাবা একটু স্তম্ভিত হয়ে বলে, খবর দিসনি? এ খবর তো দিতেই হয়।
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, ঠিক কথা। কিন্তু সে তো আর আমাদের জন্য নেই বাবা। তার এখন অন্য রকম জীবন।
বুড়ো মানুষ এসব হেঁয়ালি বুঝতে পারে না। গম্ভীর মুখে খানিকক্ষণ বসে থেকে বলল, ঘরের বউ তো, তাকে না। জানানো কি ঠিক হল?
ঘরের বউ কি আর বাধা আছে বাবা? সে যুগ আর নেই। এখন সব অন্যরকম হয়ে গেছে।
বুড়ো মানুষটি তবু ঠিক বুঝতে চায় না। বলে, যাত্ৰা-টাত্রায় নামা ভাল কথা নয়। ওটাই একটা ভুল হয়ে গেছে।
নিমাই ফেলে বলে, বাঁচতে গেলে কত কী করতে হয়! তার কী দোষ বল? সে তো আমাকে বাঁচাতেই রোজগার করতে নেমেছিল। দোষ তার নয়। বাবা।
বাবা কিছুই তেমন বুঝতে পারে না। চুপ মেরে যায়। মনটা ভাল লাগে না বোধ হয়।
নিমাই বলে, এবার পালপাড়ার পাট তুলে দিলে হয় বাবা।
তুলে দিবি?
মা যখন নেই তখন আর এ-বাড়িতে থেকে তোমার কাজ কী? কাচরাপাড়ায় দিব্যি থাকতে পারবে।
বাবা কিছুক্ষণ তোম্বা মুখে বসে থাকে। তারপর বলে, ওই যে সব গাছপালা ওসব তোর মায়ের লাগানো, ওই যে কাপড় শুকুতে দেওয়ার দড়ি, ওটি সে টাঙিয়েছিল। সারা বাড়িতে এখনও ম-ম করছে তার গন্ধ। এ বাড়ি বেচিতে পারবি? আমার তো কোথাও যেতে ইচ্ছে হয় না। মনে হয়, মরেনি, কোথাও পাড়া-বেড়াতে গেছে। এখুনি এসে পড়বে।
নিমাই এ কথা শুনে হাউ-মাউ করে কেঁদে ওঠে, না বাবা, থাক তাহলে। এ বাড়ি থাক।
শ্ৰাদ্ধ ভালরকমই করল নিমাই। গায়ের সব লোককে নেমন্তন্ন দিল, খুব খাওয়াল। নিয়মভঙ্গের পরদিন বাবাকে বলল, তাহলে কি আমি আসব বাবা? কাঁচরাপাড়ায় অনেক কাজ পড়ে আছে।
এসো গিয়ে।
একা লাগবে না তো তোমার?
না না, একা কেন? তোর মুম্ তো আছেই। চারদিকে ছড়ানো রয়েছে স্মৃতি। বেশ থাকব, মাঝে মাঝে আসবি।
সে তো আসবই। ভাবি, শরীর-টরীর হঠাৎ খারাপ করলে দেখবে কে? আমাদের তো জনের অভাব।
আমাকে নিয়ে ভাবিস না। পাড়ার লোক আছে। ভুরো রইল।
ভুরো একজন বয়স্কা বিধবা। ইদানীং সে-ই রান্নাবান্না করে দিয়ে যায়। তবে তার ঘরসংসার আছে বলে এ বাড়িতে থাকে না। নিমাইয়ের চিন্তাটা তাই গেল না।
হ্যাঁ রে, বীণাপাণি কি আর ফিরবে না?
না বাবা।
ছাড়ান কাটান হয়ে গেছে নাকি?
সেরকমই ধরে নাও।
আমি ভাবি তোকে তাহলে দেখবে কে? তোরও তো বয়স হচ্ছে।
তোমাকে যে দেখবে, আমাকেও সে-ই দেখবে। ভয় কি?
কাঁচরাপাড়ায় ফিরে এল নিমাই একটা শ্মশান-বৈরাগ্য নিয়ে। সবই করে যাচ্ছে, কিন্তু যন্ত্রের মতো। মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে একটা শাঁখ শুধু বেজে উঠছে, মা!
একদিন সন্ধেবেলা কাকা এসে হাজির।
নিমাই কেমন আছ?
নিমাই তটস্থ হয়ে উঠে দাঁড়াল, ভাল আছি কাকা।
তোমার মায়ের গত হওয়ার খবর পেয়েছি।
বসুন কাকা, কিছু খেয়ে যেতে হবে আজ।
তোমার কেবল খাওয়া আর খাওয়া। আজকাল খাওয়া অনেক বাদ দিতে হয়েছে। প্ৰেশার দেখা দিয়েছে। এখন আর আমদা খাওয়া-দাওয়া করি না।
তবু কিছু মুখে না দিলে ছাড়ছি না। তবে এসেছেন?
আজই। রাতের বাস ধরে ফিরে যাবো। শোনো, অনেক মিথ্যে কথা-টথা বলে বীণাপাণিকে সেই পাঁচ হাজার টাকা গছিয়েছি।
বড় ভাল লাগল শুনে। তাকে আরও কিছু দিতে পারলে হত। কিন্তু মায়ের কাজ গেল, অনেক খরচ হয়ে গেছে।
অত অস্থির হচ্ছ কেন? তার তো অভাব নেই।
জানি কাকা। তবে আমি বড় ঋণী হয়ে আছি।
স্বামীর জন্য স্ত্রী করলে কি ঋণ হয়?
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, তা ঠিক। তবে আমাদের সম্পর্ক তো জানেন। ঠিক স্বামী-স্ত্রীর মতো নয়। সে আমাদের প্রতিপালন করেছে। কষ্ট করেই করেছে।
শাশুড়ি মারা গেল, কিন্তু অশৌচটুকুও তো মানল না দেখলাম।
নিমাই জিব কেটে বলল, তাকে খবরই দেওয়া হয়নি।
কাকা অবাক হয়ে বলল, কে বলল খবর দেওয়া হয়নি? খবর সে সময়মতোই পেয়েছে। কিন্তু মানল না।
নিমাইয়ের মুখটা বিষণ্ণ হয়ে গেল, খবর পেয়েছে?
নিশ্চয়ই। কুসুম নিজে তাকে খবর দিয়েছে।
নিমাই একটু চুপ করে থেকে বলে, না মানুক, সম্পর্ক তো আর নেই যে মানতে হবে।
কাকা একটু হাসল। বলল, তা বটে। তবে সম্পর্ক না থাক, এক সময়ে ঘর তো করেছে। সেই সুবাদে হবিষ্যি বা শ্ৰাদ্ধের বাবদ কিছু টাকাও তো পাঠাতে পারত।
নিমাই হাসল, ভগবানের দয়ায় তার আর দরকার কী? বীণাপাণির টাকায় আমার মা-বাপ একসময়ে খেয়েছে পরেছে, সেটাই যথেষ্ট।
কাকার মুখটা কিছু গম্ভীর হল। তারপর হঠাৎ গলা পাল্টে গেল। একটু থমথমে গলায় বলল, আজ তোমার কাছে একটা বিশেষ প্রয়োজনে আসা।
গলাটা শুনে আর একবার তটস্থ হল নিৰ্মাই। বলল, আজ্ঞে, বলুন। গুরুতর কথা নাকি? খুবই গুরুতর। একটু আড়ালে বলতে চাই। বাইরে চলো। নিমাই চটিজোড়া পায়ে দিয়ে কাকার সঙ্গে বেরিয়ে এল। কাছেই একটা ফাঁকা জায়গা। লোক চলাচল নেই।
নিমাই, তোমাকে আমি সত্যবাদী বলে জানি। মিথ্যে কথা বলতে বোধ হয় তুমি জানোই না। আজ তোমার কাছে একটা কথা জানতে চাইলে বলবে?
নিমাইয়ের বুকটা একটু কেঁপে গেল। লক্ষণ সে ভাল বুঝছে না। কাকা যখন ভাল তখন অতিশয় ভদ্রলোক। কিন্তু কাকা যদি ক্ষেপে ওঠে তাহলে কুরুক্ষেত্র হয়ে যায়।
