সেটা বুঝি ভাল হল!
খারাপটা কিসের বলো তো! আমাদের আর কি আসে যায়? কে মাথা ঘামাবে আমাদের নিয়ে?
তোমার নিজের আবার বিয়ে বসার ইচ্ছে হয়েছে, সে কথাটা কবুল করলেই তো হয়।
নিমাই জিব কেটে বলে, ও কথা বোলা না।
কেন বলব না? গরজ তো তোমারই বেশী দেখছি!
নিমাই দুঃখিত মুখে বলে, আমার আর্ষ নেই। অধিকারী না হলে কি হয়? তোমার মতো মানুষ পেয়েও কি হল কিছু। আর আমার জন্যই না তোমার এত আপদ-বিপদ-কষ্ট। অত বড় অসুখটা থেকে বাঁচিয়ে তুললে, খাওয়া পরার জোগাড় করলে। কিছু কম তো করোনি। আমার মা-বাবা বড় অভাবী, বড় লোভী। তারাই নামিয়ে দিল তোমাকে। সবই বরাত। এখন ভাবি, কিছু যদি শোধরানো যায়।
আমাকে বোধহয় আজকাল তোমার সন্দেহ হয়!
নিমাই সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, তা সে দোষও আমার আছে। মনে কত পাপ লুকিয়ে থাকে মানুষের
কার সঙ্গে সন্দেহ হয়? কাকা তো?
সে বড় ভাল লোক। স্মাগলার হোক, কি আর যাই হোক, সে একটা জিনিস নিয়েই পড়ে আছে। পালা ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবে না। অমন যার ধ্যান সে সহজে এসব দিকে ঝোঁকে? তাকে আমি খানিক চিনেছি। সে ঠিক ওরকম নয়। তবে যদি তোমার তাকে ভক্তি করতে ইচ্ছে করে তো মন্দ কী? কাকাকেই বিয়ে করতে পারো।
সম্প্ৰদানটা কি তুমিই করবে নাকি?
বড্ড রেগে যাচ্ছে। আমি হিংসুটে কথা বলিনি। আমার আর ওসব হয় না। বড় কষ্ট দিয়েছি তোমাকে। কোথায় একটা শক্ত গিঁট পড়ে গেছে, খুলছে না। আমি অত গুছিয়ে কথা বলতে পারি না।
বেশ গুছিয়েই বলেছে। শোনো, যদি কাউকে বিয়ে করতে চাই তবে কি এতদিন তোমার অনুমতির জন্য বসেছিলাম? অনুমতি বা আদেশ দরকার হত নাকি? বরং নিজেকে বাঁচাতেই তোমাকে জোর করে ধরে এনেছিলাম। ভুলে গেছ সব?
ভুলব? আমি কি তেমন নিমকহারাম?
তুমিই তো সবচেয়ে বেশী নিমকহারাম। নাহলে ওকথা কেউ মুখে উচ্চারণ করে। বেইমান নও তুমি!
নিমাই ফের মাথা নিচু করে। অনেকক্ষণ নিচু করে রাখে মুখ।
বীণা দেখতে পায়, নিমাইয়ের চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে মাটির মেঝের ওপর।
আমি মেয়েমানুষ, আমার অত বুদ্ধি নেই। মেয়েমানুষ চলে পুরুষের বুদ্ধিতে। কিন্তু পারলে তুমি আমাকে চালিয়ে নিতে? আমাকে নষ্ট বলে ধরে নিচ্ছে, কিন্তু যদি সত্যিই নষ্ট হই তার জন্য দায়ী কে থাকবে শুনি! তুমি ছাড়া আর কে? বউকে ফেলে চলে যাওয়ার মধ্যেই বুঝি তোমার সব বাহাদুরি? আর ভাবছো আমাকে আবার বিয়ে করার কথা বলে খুব উদারতা দেখানো হল।
পুরুষমানুষের কান্না দুচোখে দেখতে পারে না বীণাপাণি। তার বুক জ্বলছে। সে মুখ ফিরিয়ে নিল। বাইরে অজস্র সুতো ঝুলছে। ঝুলেই আছে। টিনের চালে মিঠে মিহিন বৃষ্টির শব্দ। একটা ব্যাঙ লাফ মেরে নিমাইয়ের সুটকেসটা ডিঙিয়ে চৌকির তলায় ঢুকে গেল।
নিমাই ধরা গলায় বলল, আমরা একটু বোকাসোকা মানুষ। তোমাকে দেওয়ার মতো বুদ্ধিই কি আমার আছে! ভেবেচিন্তে একটা কথা হয়তো বললাম, সেটা তোমার হয়তো পছন্দ হল না। তোমাকে বড় ভয় খাই বীণাপাণি!
বীণাপাণি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সেটা জানি। আমার পয়সায় খাও বলে তোমার ভারী লজ্জা। সবসময়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকো, যেন পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে। তাই না?
আজ তুমি বড় সুন্দর করে বলছো। এরকম করে বললে বুকের একটা জোর হয়! বলো, আরও খানিক বলো।
বীণা লোকটার দিকে তাকাল। মাথাটা কি ঠাণ্ডা হয়েছে। ওর ঐ অনুতাপ হচ্ছে? সে বলল, তাহলে কথাগুলো সত্যি?
খুব। তুমি যেন সবসময়ে আমার নাগালের বাইরে। যখন বিয়ে করে আনলাম তখন একরকম ছিলো। এখন যেন গুটি কেটে প্রজাপতি বেরিয়ে পড়েছে। সেইজন্যেই কেমন যেন পর-পর লাগে, ভয়-ভয় লাগে।
দোষটা কি আমার, বলো!
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, তোমার দোষ কেন হবে? আমিই কি একটা মানুষ? রোগে ভুগে আমার খানিকটা গেছে, ভয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি বলে আমার বারো আনাই বরবাদ। তার ওপর কাজ নেই, কর্ম নেই, আমি ষোল আনাই তো নষ্ট! তুমি ছিলে বলে টিক টিক করে বেঁচে আছি। কিন্তু পুরুষমানুষের এরকম বেঁচে থাকতে নেই, সে আমি খুব বুঝতে পারি।
আমার মাঝে মাঝে ভীষণ মাথা গরম হয়ে যায়। নিজেকে সামলাতে পারি না। জানো তো?
জানব না? এতকাল একসঙ্গে আছি।
জানোই যদি, তবে একটা কথার জন্য চলে যাচ্ছে কেন?
নিমাই এবার হাসল। তার রোগা মুখখানায় কোনও তেমন সৌন্দৰ্য নেই। তবে হাসলে ভারী ভাল দেখায়। লাজুক গলায় বলল, থাকতে বললে তবে তো থাকব। আমার তো কখনও তোমার ওপর রাগ-টাগ হয় না, অভিমান হয় না। শুধু ভাবি আমি থাকায় বীণার বড় অসুবিধে হচ্ছে।
হাঁড়ি কলসিতেও ঠোকাঠুকি হয়, তা বলে যা নয়। তাই ভেবে নাও কেন? আর রাগ করে বাঁধন ছিড়লেই তো হবে না। তোমার মা-বাবাকে খাওয়াবে কি? সব দিক বিচার করে তবে তো কাজ করতে হয়!
মা-বাবার কথা উঠলেই বড় দুঃখিত হয়ে পড়ে নিমাই। তার মা-বাবা বড় লোভী মানুষ। অভাবে অভাবেই এমনটা হয়েছে। একটু খাওয়া পরার আশায় সব ভাসিয়ে দিতে পারে। এমন কি বীণাপাণি যখন যাত্রায় নাম লেখায় তখন নিমাইয়ের মা খুব আশকারা দিয়ে বলেছিল,মনিবকে খুশি রাখতে চেষ্টা কোরো। শরীর যদি ঐটোকাটা হয়ে পড়ে তাহলে গঙ্গায় ড়ুব দিয়ে নিলেই হবে। একথা বীণাপাণিই বলেছে নিমাইকে। শুনে কানে হাত চাপা দিয়েছিল নিমাই। কিন্তু মায়ের ওপর তা বলে রাগ নেই তার। মা বড় বোকা মানুষ, বাবাও বড় বোকা মানুষ। এ দুটি বোকা মানুষের জন্য তার বড় মায়া। এ দুজন যদি খেতে না পায়, যদি কষ্ট পায়, তবে আর নিমাইয়ের বেঁচে থাকার মানে হয় না।
