বন্ধুত্বটাই আছে। হয়তো তার বেশি কিছুই নেই। তবু দাদা আর বউদি কথা শোনাতে ছাড়ে না। আজকাল অবশ্য বলে বলে তারাও কিছু ক্লান্ত।
অনিন্দিতা খুব কাছ ঘেষে দাঁড়িয়ে বলল, আমার কিন্তু তোমার মতো নয়। আমার অনেক অ্যাম্বিশন।
জানি।
আমি বসে থাকি না। বি এ পাস করেই টাইপ আর শর্টহ্যান্ড শিখেছিলাম। কোনও কাজে এল না। বি এড করলাম। মাস্টারি জুটল না। এবার ভাবছি কম্পিউটার শিখব। কিন্তু এত টাকা লাগে যে বাবার ওপর প্ৰেশার পড়ে যাবে।
নার্সিং হোমে কেমন লাগছে?
ধুস। একদম বাজে। আমি তো আজকাল রিসেপশন আর অফিস ওয়ার্ক দেখি। কিন্তু কী জানো? ডাক্তার বাসু লোকটা ভাল নয়। নানারকম আভাস ইংগিত শুরু করেছে।
সেটা কি রকম?
সেটাও বুঝিয়ে বলতে হবে নাকি? মেয়েদের যেভাবে ক্ষমতাবান পুরুষেরা ব্যবহার করতে চায় ঠিক সেরকম। গত সপ্তাহেও উইক এন্ডে কোথায় যেন নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমি কাজ আছে বলে পার পেয়ে গেলাম। আমার বদলে শুক্লা নামে একজন নার্সকে নিয়ে গেল। শুক্লার অবশ্য প্রেজুডিস নেই। ডিভোর্সি, এক ছেলের মা। আমার তো তা সম্ভব নয়। এর পর যদি আবার ওরকম প্ৰস্তাব দেয় তাহলে বোধ হয় চাকরি ছাড়তে হবে।
চয়ন একটু চুপ করে রইল। মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। হঠাৎ। বলল, বুঝেছি।
নতুন কিছু নয়। দেশ জুড়ে এসব হয়। আমরা যারা সংস্কার আঁকড়ে থাকি, সতীত্ব, কৌমাৰ্য আঁকড়ে থাকি তাদেরই কিছু হয় না। পড়ে মারা খাই।
চয়ন মৃদু স্বরে বলল, এসব ভ্যালুজ একটু পারসোনাল অনিন্দিতা, যারা একবার হারিয়ে ফেলে তারা আর মূল্যাটা খুঁজেই পায় না। ভোতা হয়ে যায়।
তুমি কি মনে করো শারীরিক পবিত্রতার কোনও দাম আছে?
দাম নেই নাকি?
আছে? ওটা তো পুরনো আচল ধারণা। সংস্কার। আমরা কিছু বোকা মানুষ ওসব মেনে চলি।
লোভী লোকের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া কি সংস্কারমুক্তি?
অনিন্দিতা একটু ভেবে বলল, ঠিক তা বলছি না। কিন্তু প্রয়োজনে যদি শরীর দিতে হয়?
প্রয়োজনটাকে খুব বড় করে দেখতে গেলে অনেক গণ্ডগোল হয় অনিন্দিতা। বরং প্রয়োজনটা কাটছাট করা ভাল।
অনিন্দিতা হাসল, তোমার মতো?
তা বলিনি।
আচ্ছা, আমি পবিত্র থাকলে কি তুমি খুশি হও?
হই অনিন্দিতা।
কেন হও?
এমনি। আমি একটু প্ৰাচীন পন্থী বোধ হয়।
অনিন্দিতা সামান্য মন্থর গলায় বলল, ওটা আমার প্রশ্নের জবাব হল না। আমি পবিত্র থাকলে তোমার কি?
আমার কিছুই না।
কেন কিছুই না?
মুশকিলে ফেললে।
এবার অনিন্দিতা হাসল, আচ্ছা থাক, বলতে হবে না।
চয়ন বাচল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অনিন্দিতা বলল, জানো, আমার খুব ইচ্ছে ছিল নাটকে অভিনয় করি। দু চারটে করেছিও। কিন্তু গ্রুপ থিয়েটারে চান্স পাওয়ার কোনও স্থিরতা নেই। পয়সাও পাওয়া যায় না।
কটা নাটকে অভিনয় করেছ?
করেছি। কয়েকটা। কিন্তু ভাল রোল পাইনি। আমার চেহারাও তো ভাল নয়।
চয়ন চুপ করে থাকে। অনেকক্ষণ বাদে বলে, থিয়েটারে মেয়েদের এক্সপ্লায়েটেশন নেই?
ওমা! নেই আবার! খুব আছে। তবে কী হয় জানো, প্ৰেম-ট্রেম হয়ে যায়। বিয়েও হয়।
তোমার হল না?
না তো! তবে একটা প্রেম হবো হবো হয়েছিল। যে ছেলেটার সঙ্গে হয়েছিল, পরে জেনেছি। ওটা একটা হারামজাদা। বউ আছে, তবে তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না।
তোমার অভিজ্ঞতা অনেক, না?
অনেক।
দুজনে ফের চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
হঠাৎ তার হাতে একটা হাত রেখে অনিন্দিতা বলে, শোনো, তুমি হার মেনো না।
তার মানে কি অনিন্দিতা?
তুমি হার মানলে আমার খারাপ লাগবে।
চয়ন এই নাটকীয় ডায়ালগে একটু অবাক হয়ে বলে, হার মানবারও কিছু নেই। আমার অ্যাম্বিশনই নেই যে। আমার শুধু মনে হয়, এই বেশ আছি।
এটাকে থাকা বলে না। তোমার ব্ৰেন ভীষণ শার্প। তুমি অনেক জানো। তোমার কিছু হবেই।
আমার বয়স ত্ৰিশের কাছাকাছি হল অনিন্দিতা ।
তাতে কি? ওটা কি বয়স? আমারও তো পঁচিশ।
দুজনে ফের কিছুক্ষণ চুপচাপ।
আমি এলে তোমার খারাপ লাগে না তো!
না। ভাল লাগে।
০৯০. বুকের মধ্যে যেন একটা শাঁখ বেজে ওঠে
থেকে থেকে বুকের মধ্যে যেন একটা শাঁখ বেজে ওঠে, মা! মা! বুকটা বড় হা-হা করে, বড় ফাঁকা হয়ে যায়, ধু-ধু হয়ে যায়। কটা দিন বড় কেঁদোছে নিমাই। এত কেঁদোছে যে আজও তার মাথা ভার হয়ে আছে। পুরো এক মাস অশৌচ পালন করেছে সে, তারপর নিষ্ঠার সঙ্গে শ্ৰাদ্ধ। তার বোকা মা কোন অজানায় পাড়ি দিল, ভগবান তার সহায় হোক।
মরণের কাছে যে মানুষ কত অসহায় তা যত ভাবে ততই দুনিয়াটাকে তার তুচ্ছ বলে মনে হয়।
তার অবস্থা দেখে ভয় খেয়ে বাবা বলল, ওরে, তুই আত মনমরা হয়ে থাকলে মাথার দোষ হয়ে পড়বে। যা না, বন্ধুদের সঙ্গে একটু কথা-টথা কয়ে আয়, না হলে কাঁচরাপাড়ায় হোটেলে গিয়ে খানিকটা সময় বোস।
মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা আছাড়ি-পিছাড়ি হয়ে কেঁদোছে বটে, কিন্তু নিমাইয়ের অবস্থা দেখে বাবা ভয় খেয়ে চুপ মেরে গিয়েছিল। ছেলেটার না। আবার কিছু হয়ে যায়। মায়ের শোকে হয়তো মরেই যাবে।
ধড়া গায়ে, উসকো-খুসকো চুল, এক মুখ দাড়ি নিয়ে বাবার আদেশে অশৌচের মধ্যেও কাঁচরাপাড়ায় গিয়ে হোটেলের কাজকর্ম দেখেছে নিমাই। কর্মচারী দুজন মিলে চালিয়ে নিয়েছে বটে, কিন্তু কদিনেই বড় নোংরা করে ফেলেছে চারধার। প্লেট কাপও ঠিকমতো ধোয়া হয় না, ঝাট-পাট ঠিকমতো পড়ছে না, ঝুল-টুল জমেছে, তরকারির খোসা, মাছের আঁশ পচছে রান্নাঘরের কোণে। নিমাই থাকলে এসব হতে পারে না, তার দোকানের পরিচ্ছন্নতার নাম আছে। অশোচের মধ্যে নিমাই কিছু ছোবে না, তবু দাঁড়িয়ে থেকে সব পরিষ্কার করাল। দোকানের বাইরে একখানা টুলে চুপচাপ কুশাসন পেতে উদাস ভাবে বসে রইল। চেনা মানুষরা এসে কত সমবেদনা প্ৰকাশ করে গেল।
