একটু ভেবে নিন। সামনের মাসে দশ তারিখের পর আমি আবার কলকাতায় আসব; যদি রাজি থাকেন তাহলে তখন দেখা করবেন। স্যালারিটা, ধরে নিন অ্যােরাউণ্ড টু থাউজ্যান্ড। বম্বের পক্ষে কিন্তু স্যালারিটা বেশ কমই। লোকাল পিপলদের হয়তো চলে যায়, কিন্তু—
আবার একটা কিন্তুতে হোঁচটি খেতে হল তাকে। কিন্তুই তার সবচেয়ে বড় বাধা। শব্দটা যদি লোপাট করে দেওয়া যেত।
একটা কুণ্ঠিত নমস্কার করে বেরিয়ে এল চয়ন।
টিউশনি সেরে বাড়ি ফিরতে রাত নটা বেজে গেল। ছাদে উঠে যখন ঘর খুলছিল তখন অন্ধকার ছাদের কোণে জলের ট্যাংকের পাশ থেকে মেয়েলী গলার স্বর জিজ্ঞেস করল, চাকরি হল?
চয়ন একটু হাসল, না।
অনিন্দিতা এগিয়ে এসে বলল, কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি তোমার জন্য। কেন হল না?
চয়ন মৃদু একটু হেসে বলল, হল না বললে ভুল হবে। ভদ্রলোক বম্বেতে চাকরি দিতে রাজি। মাইনে মাত্র দুহাজার।
ধুস। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রিফিউজ করল বোধ হয়।
তাই হবে।
আমার কিন্তু খুব আশা ছিল, চাকরিটা তোমার হবে।
চয়ন মৃদু হেসে বলে, আশা করতে নেই।
শত হলেও কৃষ্ণজীবনবাবু নিজে চিঠি দিয়েছিলেন তো, হওয়া উচিত ছিল।
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, কৃষ্ণজীবনবাবু খুব প্র্যাকটিক্যাল মানুষ নন। কাকে কী বলতে হবে, কোন অন্ধি-সন্ধি দিয়ে কাকে চাকরিতে ঢোকানো যাবে সেসব ভাববার সময় ওঁর কোথায়? হয়তো এরোপ্লেনে বা কোনও মিটিঙে ছাত্রটির সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাই বলেছিলেন। আমার মনে হয়, আমার কোয়ালিফিকেশন কী তাও কৃষ্ণজীবনবাবু ভাল করে জানেন না।
অনিন্দিতা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের বাতির আভায় তার মুখের ম্লান ভাবটা লক্ষ করল চয়ন। অনিন্দিতা একটু ধরা গলায় বলে, মনটা বড্ড খারাপ লাগছে।
আমার লাগছে না। ঢাকরি জিনিসটা করা তো আমার অভ্যাস নেই। চাকরি হয়তো আমার ভাল লাগবে না।
অনিন্দিতা একটু অবাক হয়ে বলে, শুধুই টিউশনি করে জীবন কাটাতে চাও নাকি?
অকপটে চয়ন বলে, কাটবে না? আমার তো মনে হয় বেশ কেটে যাবে।
তোমার অ্যাম্বিশন বলে কিছু নেই কেন বলো তো! তোমার ওই একটাই ভীষণ দোষ।
চয়ন চিন্তিতভাবে বলে, অ্যাম্বিশন থাকাই কি ভাল? অলস চিন্তা আর অ্যাম্বিশন তো এক জিনিস নয়। অ্যাম্বিশন কথাটার মধ্যে হয়তো অ্যাচিভমেন্টও কিছুটা থাকে। আমার পক্ষে কিছু অ্যাচিভ করা কি সম্ভব?
তাই অলস চিন্তা করতে বুঝি ভাল লাগে?
না। অনিন্দিতা, আমি অলস চিন্তাও করি না। আমার মাথায় সেটাও আসতে চায় না।
কী হবে তাহলে তোমার?
আমার কিছুই হওয়ার নয়।
তুমি একটা কাজ করবে? কৃষ্ণজীবনবাবুকে গিয়ে বলো, তাঁর চিঠিতে কাজ হয়নি। উনি নিশ্চয়ই আবার চেষ্টা করবেন।
না। অনিন্দিতা, উনি ব্যস্ত মানুষ। মাথায় অনেক চিন্তা। তার ওপর মনে হচ্ছে ওঁর একটা ফ্যামিলি ট্রাবল চলছে। এসব বলে ওঁকে ডিস্টার্ব করা ঠিক নয়।
তোমাকে উমেদারি করতে বলছি না। যা হয়েছে সেটা তো বলতে পারবো!
সুযোগ পেলে অবশ্যই বলব। আমার মনে হয়। উনি যে আমাকে চিঠি দিয়ে এক জায়গায় পাঠিয়েছিলেন সেটাই ওঁর মনে নেই।
তবু বলে। তোমার তো আর কোনও সোর্স নেই। আচ্ছা, সেই সুব্রতবাবুকে বলেছ?
উনি জানেন। কিন্তু উনিও আর একজন বিগ গাই। সারা পৃথিবীতে বাড়ির ডিজাইন আর কনস্ট্রাকশন করে বেড়ান। ওঁরাও কি কথা মনে রাখা সম্ভব?
তা বলে ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াবে নাকি? তুমি শুধু মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিয়েই দেখ না।
ওরা বিরক্ত হবেন।
তুমি চারুশীলাকেই ধরো না। শুনে তো মনে হয় মহিলা খুব ভাল।
খুবই ভাল অনিন্দিতা। কিন্তু বায়না করা শুরু করলে বেশি দিন ভাল থাকবেন না। বিগড়ে যাবেন। তা ছাড়া চারুশীলা বোধ হয়। কিছুদিনের জন্য বিদেশে যাবেন। খুব ব্যস্ত।
যাঃ। তোমার কপালটাই খারাপ।
যে বিষয়ে সন্দেহ নেই। অত ভেবো না। আমি তো ভালই আছি।
ছাই আছো। ভাল থাকা কাকে বলে তা তুমি জানোই না।
দুজনেই একটু চুপ করে রইল। এত কাণ্ডের পরও যে অনিন্দিতা ছাদে তার কাছে আসে সেটা একটা অদ্ভুত টানের জন্যই। তাদের মধ্যে প্রেম হয়তো নেই, কিন্তু একটা ভালবাসা আছেই। অনিন্দিতা তাকে জীবনে দাঁড় করানোর একটা শপথ নিয়েছে হয়তো। কিন্তু—
ওই কিন্তুই কুরে-কুরে খায় চয়নকে। সব সময়ে একটা কিন্তু এসে সব কাজ ভণ্ডুল করে দেয়।
অনিন্দিতা হঠাৎ বলে, আচ্ছা, তোমার কাছে হেমাঙ্গীবাবুর কথাও তো খুব শুনি। উনি কিছু পারেন না?
কী পারবেন? ওঁর একটা অডিট ফার্ম আছে। ইনকাম ট্যাক্স, আরও সব ট্যাক্স নিয়ে কারবার। সেখানে আমার হওয়ার নয়। ওঁর ক্লায়েন্টরা বেশির ভাগই ঝানু ব্যবসাদার। চাকরি দায়ে পড়ে দিলেও বেশিদিন রাখবে না। উনি নিজেই বলেছেন সেকথা। চাকরির বাজারটাই স্যাচুরেটেড।
আচ্ছা, তুমি কেন কম্পিউটার শেখো না?
কত কী শেখার আছে অনিন্দিতা! শেখা হল কই? আমার আর নতুন করে জীবন শুরু করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। টিউশনি বজায় থাকলেই হল। চলে যাবে।
একটা কথা জিজ্ঞেস করব? কিছু মনে করবে না?
না! বলো।
টিউশনি করে তুমি মাসে কত পাও?
দু হাজারের মতো।
সেটা কি খারাপ?
না তো! খারাপ কেন হবে?
বাসা ভাড়া তো পঞ্চাশ, তাই না?
হ্যাঁ।
তাহলে তোমার চলে যায়। যাश।
আমার কী ইচ্ছে করে জানো? তোমার টিউশনিগুলো সব কেড়ে নিই। এই টিউশনি করে চলে যায় বলেই তোমার আর কিছু করতে ইচ্ছে করে না। এসো, রেলিঙের পাশে একটু দাঁড়াই—
খুব সংকোচের সঙ্গে দাঁড়ায় চয়ন। তাদের নিয়ে এ বাড়িতে কথা হচ্ছে। মেলামেশোটা বন্ধ করতে পারেনি চয়ন। অনিন্দিতা বলে, যা হয় হোক, তোমার বন্ধুত্ব আমার দরকার।
